–কী গো, উত্তর দিচ্ছ না কেন? আমার দিদির কথা বলছি!
পরমেশের মুখ দিয়ে কোনও কথাই বেরোচ্ছিল না। কী কথাই বা সে বলবে? সে সব দিনের মর্মান্তিক ঘটনা তো নবাবগঞ্জের লোকের কারো আর জানতে বাকি নেই! এমন সর্বনাশ যে হবে তা বুঝি কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। অথচ এই তো সেদিনের ঘটনা।
রাস্তায় তখন আর একজন কে যাচ্ছিল। সেও প্রকাশকে দেখতে পেয়েছে। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললে–কী শালাবাবু, কখন এলেন?
প্রকাশ দেখলে–বংশী ঢালী। তারপর আস্তে আস্তে আরো অনেকে জুটে গেল। সকলেরই এক প্রশ্ন। কখন এল শালাবাবু? এতদিন কোথায় ছিল? প্রকাশ বললে–আমার দিদিও কেন এই সময়ে ভাগলপুরে চলে গেল? কবে আসবে তারা?
ততক্ষণে সদর দিয়ে যারা যাচ্ছিল তারাও শালাবাবুকে দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে গেছে। এত ঘটনার পর যে চৌধুরীবাড়ির মালিকপক্ষের কেউ আবার এ বাড়িতে আসবে তা তারা ভাবতেও পারেনি। সে-সব কাণ্ড কি সহজ কাণ্ড! সারা গাঁ-ময় তখন ঢি ঢি পড়ে গেছে। চৌধুরী মশাই-এর নামে তখন ছিছিকার পড়ে গেছে সব জায়গায়। সবাই আড়ালে আলোচনা করে, কিন্তু গণ্যমান্য ভদ্রলোকের বাড়ির বউ ঝির ব্যাপার, সব কথা প্রকাশ্যেও বলতে চায় না কেউ, অথচ বলবার মত এমন বিষয়টা চেপে রাখতেও কেউ পারে না। কানাঘুষো থেকে প্রথমে শুরু হয়ে আস্তে আস্তে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গিয়ে সেটা পৌঁছোয়। তারপর গ্রাম ছাড়িয়ে একেবারে মহকুমা শহরে।
.
তারপর?
শালাবাবুর মাথায় তখন বজ্রাঘাত হয়েছে। আবার বললে–তারপর?
এ কি সহজ ব্যাপার যে এক কথায় সব কাণ্ডটা বলতে পারবো! এত সময় তোমারও নেই, আর আমার কলমেও এত জোর নেই যে সেদিনকার সব কেলেঙ্কারির কাহিনী তোমাকে বিশদ করে বলতে পারবো!
কোথাকার কোন্ নরনারায়ণ চৌধুরী একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, এখানে এই নবাবগঞ্জে তিনি একটা কালজয়ী বংশের প্রতিষ্ঠা করে যাবেন আর পুত্র-পৌত্রাদিক্রমে তাঁর অবিনশ্বর কীর্তিকলাপ যুগ যুগ ধরে এখানে সুচিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁর সেই স্বপ্নের কী গতি হলো তা তিনি দেখে যেতে পারলেন না বটে, কিন্তু দেখলে তাঁর পুত্র, তাঁর পৌত্র। আর নবাবগঞ্জের এপাড়া-সেপাড়ার অগণিত জনসাধারণ। আর যাদের দেখবার সৌভাগ্য হলো না তারা শুনলো। শুনে ছি ছি করতে লাগলো বটে কিন্তু যার উদ্দেশ্যে ছি ছি করলে তিনি তা শুনতে পেলেন না। নিজের অপঘাত-মৃত্যুর পাপে তাঁর আত্মা তখন কোথায় কোন্ লোকে ছটফট করছে কে জানে! এক গণ্ডুষ জলের জন্যে তিনি কোথাও অশরীরী আর্তনাদ করছেন কিনা তারও কোনও সংবাদ জানবার তখন উপায় নেই।
.
কিন্তু যারা হাতের কাছের মানুষ, তাদের খবর তখন জানা যাচ্ছে। চৌধুরী মশাই তখন আর বাড়ি থেকে বেরোন না। চণ্ডীমণ্ডপের কাছারিতেও আসেন না। যখন কারো দেখা করবার দরকার হয় তখন তার কাছেই সবাই যায়। দরকার হলে টাকা চায়, টাকা দেয়। খাজনার টাকা দিতে গেলে চৌধুরীবাড়ির বার বাড়ির উঠোন পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে একেবারে দোতলায় গিয়ে উঠে তাঁর কাছে যেতে হয়।
নয়নতারা চলে যাবার পর থেকেই যেন বাড়িটার লক্ষ্মীশ্রী চলে গিয়েছিল। হয়ত নয়নতারা ছিল লক্ষ্মী। লক্ষ্মীকে ধরে রাখতে পারেননি চৌধুরী মশাই। সদানন্দকে যেমন একদিন কেউ ধরে রাখতে পারেননি তেমনি নয়নতারাকেও কেউ ধরে রাখতে পারেনি চৌধুরীবাড়িতে। যাবার দিন বারোয়ারিতলায় আর লোক ধরে না। চৌধুরীবাড়ির সদরেও আর লোকের কমতি নেই।
আগে আগে পায়ে হেঁটে যাচ্ছে কৈলাস গোমস্তা। মাঝখানে রজব আলির ছই-ঢাকা গরুরগাড়ি। গরুরগাড়িতে সামনে-পেছনে পর্দা। ভেতরের কাউকে দেখা যায় না। তুমি যে কায়দা করে নয়নতারার চেহারাটা একবার দেখবে তারও উপায় নেই। পর্দা তুলে ভেতরে উঁকি দেবারও উপায় নেই কারোর। সেখানে আছে দীনু। দীনু গাড়ির পেছন-পেছন পাহারা দিতে দিতে চলেছে।
কেদার কাছাকিাছি গিয়ে দীনুকে জিজ্ঞেস করলে–ভেতরে তোমাদের বউ কি একলা যাচ্ছে নাকি গো? আর কেউ নেই?
দীনু বললে–না, বউমানুষ কি একলা বাপের বাড়ি যায়? সঙ্গে গৌরীপিসী আছে–
বেহারী পালের বউ বাগানের বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখছিল। নয়নতারা একলা ঘর থেকে বেরিয়ে গরুরগাড়িতে গিয়ে উঠলো। ওঠবার আগে একবার দিদিমার বাড়ির দিকেও চাইলে। কাউকে সেখানে দেখতে পাবার কথা নয়। তবু চেয়ে দেখলে। তারপর কাউকে দেখতে না পেয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসলো। আর তার পেছনে-পেছনে গৌরীও গিয়ে গাড়িতে উঠলো।
নয়নতারা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত গ্রামে একটা চাপা হাহাকার পড়ে গেল।
–তা হ্যাঁ গো, বউমার বাপকে খবর দেওয়া হয়েছ তো?
একজন বললে–এ কি আর দেবার মত খবর যে আগে থেকে দেবে। মেয়ে যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছবে তখনই বাপ জানতে পারবে।
আর একজন বললে–আহা, কী কপাল করেই বউটা এসেছিল! একদিনের তরেও সুখ পেল না গো। নিজের ভাতারই যাকে ছেড়ে চলে গেল তার আবার শ্বশুরবাড়ি! আর শ্বশুরের তো ওই কীর্তি! কী ঘেন্না মা, কী ঘেন্না!
অন্য একজন বললে–আর বউ-এর গয়না? গয়নাগাঁটি সঙ্গে নিয়ে গেল তো?
–সে তারক-জ্যাঠা আগেই বলে রেখে দিয়েছিল। যেমন সেজেগুজে বউ শ্বশুরবাড়িতে এসেছিল তেমনি সাজিয়ে-গুছিয়েই বউকে বাপের বাড়ি পাঠাতে হবে। এমনি তাড়িয়ে দিলে চলবে না।
