কিন্তু প্রকাশমামা জানতো না যে পৃথিবী তখন তলে-তলে অন্য এক ভূগোল সৃষ্টি করে চলেছে। ভূগোলের রং বদলাতে শুরু করেছে নিঃশব্দে। যা ছিল লাল তা সমস্তই তখন বুঝি সবুজ হতে শুরু করেছে। শুধু ভুগোলই বা কেন, ইতিহাসও তখন নতুন মানুষের কলমে নতুন করে লেখা হয়ে চলেছে আর এক নতুন কালিতে। একের সঙ্গে বিরোধ বেধেছে বহুর, বড়র সঙ্গে ছোটর আর ভেতরের সঙ্গে বাইরের। মতবাদের সঙ্গে মতবাদের বিরোধে সারা পৃথিবীটা তখন ভাগ-ভাগ হয়ে গেছে। নবাবগঞ্জের চৌধুরী বাড়িটার মত অতীতের কর্তাবাবুরা নিজেদের সমস্ত কৃতকার্যের মধ্যে নিজেদের ধ্বংসস্তূপ দেখে নিজেরাই হতবাক হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। আর কপিল পায়রাপোড়া মাণিক ঘোষ আর ফটিক প্রামাণিকের দল তখন কবরের তলা থেকে হা-হা করে প্রতিশোধের অট্টহাসি হেসে সমস্ত নবাবগঞ্জকে সচকিত করে তুলছে।
বেহারি পাল তার দোকানে বসে দেখলে রিকশাটা আসছে।
–কবে এলে হে শালাবাবু?
–আজ্ঞে, আজ পাল মশাই আজ–আপনাদের খবর সব ভাল তো?
বারোয়ারিতলায় নিতাই হালদারের দোকানের মাচার ওপরকার পৃথিবীটার মূলও বুঝি তখন সব কাণ্ডকারখানা দেখে ধসে গিয়েছিল। আগেকার সে জলুস আর নেই কারো। অন্যদিন হলে তারা শালাবাবুকে ডাকতো। তার সঙ্গে দু’একটা রসিকতার কথা বলতো। কিন্তু সবাই শালাবাবুকে দেখে নিঃশব্দে শিউরে উঠলো। একটা উদ্যত খড়গ যেন সকলের মাথার ওপর ঝুলছে।
রিকশার ওপর বসে শালাবাবু নিজ থেকেই বললে–কী গো, আমি এলুম! কেমন আছো গো সব তোমরা?
-ভালো।
শালাবাবু কথার রেশটা বাড়াবার জন্যে বলে উঠলো–কলকাতায় থেকে থেকে আর নবাবগঞ্জে আসতে ইচ্ছে করে না হে–তোমরা সব কেমন ঝিম্ মেরে গেছে মনে হচ্ছে। তোমাদের তাস খেলা কেমন চলছে?
এ-কথার আর কেউ কোনও সাড়-শব্দ দিলে না। রিকশাটা গিয়ে দাঁড়ালো একেবারে চৌধুরীবাড়ির সদরে।
–এই রাখ রাখ, এখানেই রাখ বাবা।
দাম মিটিয়ে দিয়ে চারদিকে চেয়ে কেমন অবাক হয়ে গেল প্রকাশ। কই, সব কোথায় গেল? চণ্ডীমণ্ডপে এমন সময় তালা ঝুলছে কেন? পরমেশ মৌলিক কোথায় গেল সেরেস্তা ছেড়ে? বাড়ির সদরের কাছে কাদের একটা গরু বেশ গুছিয়ে আয়েস করে বসে জাবর কাটছিল।
প্রকাশ বললে–এ কাদের গরু রে বাবা, আর জায়গা পেলে না, যাওয়া-আসার রাস্তার ওপর বসে পড়েছে, একেবারে আক্কেল বলে কিছু নেই
ভেতরে বার বাড়ির উঠোনে ঢুকে আরো অবাক–দীনু দীনু–
শালাবাবুর গলার আওয়াজ পেয়ে কোথা থেকে সেই বার-বাড়ির কুকুরটা ল্যাজ নাড়তে নাড়তে আদর দেখাতে এল। তাকে দেখে প্রকাশমামা কিছু বুঝতে পারলে না। কুকুরটা এমন একটা জীব নয় যে তাকে প্রশ্ন করলে কিছু হদিস পাওয়া যাবে। কিন্তু এরা সব গেল কোথায়? কৈলাসেরও তো থাকার কথা!
–কৈলাস, কৈলাস!
কৈলাস কি আজকাল এত সকাল-সকাল বাড়ি চলে যায় নাকি?
কিন্তু বারবাড়ির বৈঠকখানার দিকে নজর পড়তেই আরো অবাক হয়ে গেল। সে-ঘরের দরজাতেও তালা ঝুলছে। আশ্চর্য তো, তালা ঝুলছে কেন? ভেতরে কারো সাড়াশব্দই বা নেই কেন? গৌরী, বিষ্টুর মা–তারাও তো অন্তত ভেতরে থাকবে।
ভেতরে বাড়িতে যাবার পথেই আটকে যেতে হলো। সেখানেও তালা ঝুলছে। এ কী হলো! এমন তো হয় না! তাহলে সব গেল কোথায়? বউমা না হয় বাপের বাড়ি গেছে বুঝলাম। কিন্তু এরা? এরা সবাই কোথায় গেল? জামাইবাবু দিদি, বাড়ি ছেড়ে সবাই গেল কোথায়?
সেই বারবাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ করে দোতলার ঘরখানার দিকেও চেয়ে দেখলে। জানালাগুলো সব বন্ধ। তাহলে কি কেউ বাড়িতে নেই?
হঠাৎ পায়ে একটা কী ঠেকতেই চমকে উঠেছে প্রকাশ। পেছন ফিরেই দেখে সেই কুকুরটা। কুকুরটা একেবারে পায়ে-পায়ে তার সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরছে।
প্রকাশ একটা লাথি ছুঁড়লে তার দিকে–যা যা, পালা এখান থেকে, পালা যা–
-কেমন আছেন শালাবাবু? এখন এলেন?
পাশের বেড়ার ওধার থেকে কার যেন গলা ভেসে এল।
প্রকাশ চেয়ে দেখলে ফকির। বেহারি পালের মুহুরি ফকির। ফকিরের দিকে এগিয়ে গেল প্রকাশ। বললে–এরা সব গেল কোথায় বলো তো ফকির? আমি যাবার আগে দেখে গেলুম একরকম, আর এসে এ-সব কী দেখছি! দিদি কোথায়? জামাইবাবু? তোমরা কিছু জান?
ফকির বললে–-চৌধুরী মশাই তো নেই, উনি ভাগলপুরে চলে গেছেন–
–ভাগলপুরে? কেন? তাহলে এখানকার সব দেখাশোনা কে করছে? আরি দিদি? দিদিও কি জামাইবাবুর সঙ্গে ভাগলপুরে গেল নাকি?
রাস্তা থেকে হঠাৎ কে যেন বললে–কে? শালাবাবু নাকি? কখন এলেন?
প্রকাশ চেয়ে দেখলে পরমেশ মৌলিক। পরমেশ মৌলিক রাস্তা দিয়ে বারোয়ারি-তলার দিকে যাচ্ছিল। শালাবাবুকে দেখেই থমকে দাঁড়িয়েছে।
পরমেশ মৌলিককে দেখে প্রকাশ যেন অকূলে কূল পেলে। তাকে লক্ষ্য করে রাস্তার দিকেই চলতে লাগলো সে। বললে–কী হে, চণ্ডীমণ্ডপে তালা ঝুলছে কেন? তোমরা সব কাজকর্ম করো না?
পরমেশ বললে–আজ্ঞে চৌধুরী মশাই তো নেই, তিনি ভাগলপুরে চলে গেছেন–
প্রকাশ বললে–তা জামাইবাবু ভাগলপুরে চলে গেছেন বলে কি একেবারে চিরকালের মত চলে গেছেন? তিনি না থাকলে কি আর তোমরা কাজকর্ম কিছু করবে না? আর দিদি? দিদিও কি সঙ্গে গেছে নাকি? এসব এখন দেখছে কে? কৈলাস কোথায় গেল? আর দীনু? দীনু কোথায়?
পরমেশ তবু কিছু উত্তর দিলে না। তার মুখে যেন কথা ফুরিয়ে গিয়েছে।
