তা সেই রেলবাজারের ইস্টিশানে ট্রেন থেকে একদিন একজন ভদ্রলোক নামলো। বেশ ধোপ-দুরস্ত চেহারা। হাতে একটা ছোট সুটকেসের গায়ে সাদা রং দিয়ে ইংরিজি অক্ষরে লেখা রয়েছে–পি সি রায়। ট্রেনটা চলে যাবার পর ভদ্রলোক কোনও দিকে দৃকপাত না করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সোজা বাজারের রাস্তায় পড়লো। তারপর বাঁয়ে ঘুরে একটা মিষ্টির দোকানে। দোকানী এগিয়ে এল।
–কী দেব বলুন?
ভদ্রলোক বললে–সন্দেশ কত করে?
–সাড়ে সাত টাকা।
–ওরে বাবাঃ, একেবারে সাড়ে সাত টাকা! গলাকাটা দর করে দিলেন যে। আগে আপনাদের দোকানে কত সন্দেশ-রসগোল্লা-রাজভোগ খেয়েছি, তখন তো আড়াই টাকা করে সের ছিল।
দোকানদার সবিনয়ে বললে–সে-সব দিনের কথা এখন ভুলে যান। তখন সাত টাকা মণ দুধ পাওয়া যেত।
ভদ্রলোকের এ-সব কথা ভালো লাগলো না। বললে–না মশাই, এ একেবারে গলাকাটা দর করে দিয়েছেন। তা সিঙ্গাড়া কত করে?
–তিন আনা পিস্—
ভদ্রলোক বলে উঠলো–তা সিঙ্গাড়া তো আর দুধের খাবার নয় মশাই, সিঙ্গাড়ার এত দাম করেছেন কেন? আমি কি ভেবেছেন নতুন এসেছি এখেনে–আজ কুড়ি-তিরিশ বছর ধরে আসছি। এককালে আপনাদের দোকানে আমি এক টাকা সের সন্দেশ খেয়েছি, তাও আমার মনে আছে–
এতক্ষণে দোকানদারের যেন মন ভিজলো। জিজ্ঞেস করলে আপনার দেশ কি এখেনে?
ভদ্রলোক বললে–আমার নিজের দেশ নয়, আমার জামাইবাবু নবাবগঞ্জের জমিদার–
নবাবগঞ্জের জমিদার?
–আরে হ্যাঁ মশাই, ছোটবেলা থেকে দিদির বাড়ি আসতুম, আর এইখান থেকে কাঁচাগোল্লা কিনে নিয়ে যেতুম। এককালে এখানে রোজ আসতুম।
–আপনার দেশ?
–ভাগলপুর। এখানে নবাবগঞ্জে আমার ভগ্নীপতির বাড়ি। জমিদার হরনারায়ণ চৌধুরীর নাম শুনেছেন? তিনিই ছিলেন আমার ভগ্নীপতি।
–তা তিনি তো নবাবগঞ্জ থেকে জমিজমা বেচে চলে গিয়েছেন। ভাগলপুরে আছেন এখন–
ভদ্রলোক বললে–তাহলে তো সবই জানেন দেখছি। সেই ভগ্নীপতিই এখন মারা গেছেন।
–মারা গেছেন!
ভদ্রলোক বললে–হ্যাঁ, সে এক ভীষণ কাণ্ড! সেই ব্যাপারেই আমরা সব বিব্রত। এখন যাচ্ছি নবাবগঞ্জে আমার ভাগ্নের খবর নিতে–
–ভাগ্নে মানে? সেই সদা! সদানন্দ!
–হ্যাঁ, সদানন্দকে এদিকে দেখেছে নাকি? তাঁকে খুঁজতেই তো যাচ্ছি। যাহোক, তাহলে মশাই আপনার সন্দেশ আর খাওয়া হলো না। সাড়ে সাত টাকা সেরের সন্দেশ খাবার ক্ষমতা নেই আমার–
দোকানদার বললে–তাহলে সিঙ্গাড়া খান, তিন আনার চেয়ে সস্তা দেওয়া যায় না, আলুর যা দাম বাড়ছে–
–তা দু’আনা করে হোক না—
দোকানদারের কী মনে হলো। বললে–ঠিক আছে, আপনি চা খাবেন তো? দু’আনায় এক কাপ চা। চা খেলে একখানা সিঙ্গাড়া দু’আনায় দিতে পারি। আপনি আমাদের পুরোন লোক-দেশের লোক, এতদিন পরে এসেছেন। ওরে, বাবুকে এক কাপ চা আর একটা গরম সিঙ্গাড়া দে–
তা তাই-ই সই। বেশী দরাদরি করা ঠিক নয়। সন্দেশটা সস্তা করে দিলেই ভালো হতো অবশ্য শেষ পর্যন্ত একখানা সিঙ্গারা দিয়ে এক কাপ চা-ই নিলে ভদ্রলোক। বললে–তাহলে চা’য়ে একটু বেশি করে চিনি দেবেন মশাই, আমি আবার চিনি একটু বেশী খাই–
চা আর সিঙ্গাড়া খেয়ে দাম চুকিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক উঠলো। ভোরবেলা ট্রেন থেকে নেমেছে। এবার একটু রোদ উঠেছে। এখনও পাঁচ ক্রোশ রাস্তা ঠেঙ্গাতে হবে। রেলবাজারের রাস্তায় তখন মানুষের রীতিমত আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে–
তারপর রাস্তায় নামবার আগে দোকানদারকে লক্ষ্য করে বললে–ফেরবার সময় আবার আসছি, তখন কিন্তু একটু কন্শেসন করতে হবে, বুঝলেন–
তা এই হলো প্রকাশ রায়। সদানন্দ চৌধুরীর প্রকাশ মামা। আপন মামা ঠিক নয়। তা হোক, আপন মামার চাইতেও বড়। মার এক মামার ছেলে। ছোট বেলা থেকে নবাবগঞ্জে আনাগোনা করতো। বড়লোক ভগ্নীপতি। দূর সম্পর্কের ভগ্নীপতি হলেও ভগ্নীপতি তো! একটা সম্পর্ক তো আছে, তা সে যত ক্ষীণ সম্পর্কই হোক। সেই ক্ষীণ সম্পর্কটাকে ঘন ঘন দেখা-সাক্ষাৎ আসা-যাওয়া দিয়ে সে রীতিমত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে পরিণত করে তুলেছিল। বলা-নেই কওয়া-নেই হঠাৎ-হঠাৎ এসে উদয় হতো প্রকাশ। বড়লোক দিদি। থাকা-খাওয়ার এলাহি ব্যবস্থা। প্রকাশ এলেই নবাবগঞ্জের লোকেরা বলতো–ওই চৌধুরী মশাই-এর শালা এসেছে–
অনেকে আবার আদর করে শালাবাবুও বলতো।
শালাবাবু এলে নবাবগঞ্জের লোক ধরে বসতো–শালাবাবু, আমাদের বারোয়ারিতলায় যাত্রা হবে, চাঁদা দিন—
তা চাঁদা দিতে কখনও কার্পণ্য করে নি শালাবাবু। বলতো–বেশ তো, কত চাঁদা দিতে হবে আমাকে, বলো–
দশ টাকা চাই আপনার কাছে
তা দশ টাকা দিতেও আপত্তি করত না শালাবাবু। নবাবগঞ্জের জমিদারের শালা, সুতরাং সারা গ্রামের লোকেরই শালা। তার মতন লোকের কাছে দশ টাকা চাঁদা চাইবার হক আছে বইকি গ্রামের লোকের। শালাবাবুর ফিনফিনে পাঞ্জাবি, কোঁচানো ধুতি, আর ঢেউ খেলানো তেড়ি, এ-সব দেখে যে-কোনও লোকই বুঝতে পারতো শালাবাবু পয়সাওয়ালা লোক। আসলে কিন্তু এ পয়সা যোগান দিত দিদি। শালাবাবু এসেই বলতো দিদি, এবার আর তোমার ইজ্জৎ থাকবে না–
দিদি বুঝতে পারতো না। বলতো–কেন রে, কী হলো?
নবাবগঞ্জের ক্লাবের ছেলেরা আবার চাঁদা চাইছে। একেবারে দশ টাকা চাঁদা ধরেছে আমার নামে।
দিদি বলতো–কেন, আবার চাঁদা কীসের? এই তো সেদিন যাত্রার জন্যে তুই দশটা টাকা চেয়ে নিয়ে গেলি। এরই মধ্যে আবার চাঁদা কিসের?
