সদানন্দ বুঝতে পারেনি সমরজিৎবাবু কখন সিঁড়ির নিচেয় এসে দাঁড়িয়েছেন। সমরজিৎবাবুর মুখ-চোখের চেহারা যেন তখন অন্য রকম হয়ে গেছে।
সদানন্দ আর কথা না বলে নিজের ঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল। সমরজিৎবাবু তাকে ডাকলেন।
বললেন—শোন–
সদানন্দ কাছে যেতেই বললেন–তুমি তো চাকরি চাইছিলে আমার কাছে, চাইছিলে না? আমার খোকাকেও আমি চাকরি করতে দিতে চাইনি। নিজে থেকেই ওই চাকরি যোগাড় করে নিয়েছে। যোগাড় করে নিয়ে এখন এই কাণ্ড করছে। অথচ ওর চাকরি করার কোনও দরকার ছিল না। আমার যা সম্পত্তি আছে তা দেখাশোনা করলেই ওর চলে যেত। কিন্তু ক্ষমতা। ক্ষমতার লোভই ওর সর্বনাশ করে দিয়েছে। এর পরও তুমি চাও আমি এই ছেলেকে বলে তোমার চাকরি করে দিই? বলো? জবাব দাও?
সদানন্দ কোনও জবাব দিলে না। জবাব দেবার অবশ্য তার অনেক কিছুই ছিল। অবশ্য জবাব দিতে পারতো যে চাকরি করলেই কি আর আপনার ছেলের মত সবাই মাতাল হবে। লক্ষ-লক্ষ লোকই তো চাকরি করছে, কই, সকলেই কি আপনার ছেলের মত মদ খেয়ে মাতলামি করছে?
কিন্তু সব জিনিসেরই একটা সময় আছে। তখন সেই রাত দু’টোয় তো আর এ-কথা বলবার সময় নয়। তাই-কিছুই বললে না সদানন্দ। আস্তে আস্তে নিজের ঘরের ভেতরে চলে এল। তারপর আলো নিভিয়ে বিছানায় চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়লো। কিন্তু মন থেকে ঘটনাটা কিছুতেই দূর করতে পারলে না। সমরজিৎবাবুর কথাই ঘুরে-ফিরে কেবল মনে পড়তে লাগলো। ভগবান সমরজিৎবাবুকে দিয়েছেন যেমন অনেক, আবার অনেক কিছু তেমনি কেড়েও নিয়েছেন। এমন করে যদি কেড়েই নেবেন তাহলে এমন করে তাঁকে দেওয়াই বা কেন? আর, একটা কথাও মনে পড়তে লাগলো। যেদিন সদানন্দ প্রথম এখানে এসেছিল সেদিন তার মনে হয়েছিল এরা কত সুখী! মনে হয়েছিল অন্তত এদের সংসারে কোনও ফাঁকি নেই। কিন্তু এই-ই কি এদের সুখের নমুনা? তাহলে পৃথিবীতে কোনও সংসারেই কি সুখ নেই?
আর মনে পড়তে লাগল আর একজনের কথা। এতদিন এ বাড়িতে সে এসেছে, কিন্তু একদিনও তাকে দেখেনি সদানন্দ। শুধু মহেশের কাছে শুনেছে তার কথা। সমরজিৎবাবু হাজার-হাজার মেয়ের মধ্যে থেকে বেছে তাকে এ বাড়ির ছেলের বউ করেছে। তার রূপ দিয়ে ছেলেকে ভুলিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন এ-রকম হলো! তাকে দেখা দূরে থাক্ তার গলার আওয়াজটুকু পর্যন্ত শুনতে পায়নি সে। সে যে আছে এবাড়িতে তারও তো কোনও প্রমাণ পায়নি সদানন্দ।
তবে কি এও আর একজন নয়নতারা!
৩.৩ স্টেশনে চেনা মুখ
রেল বাজারের স্টেশনে চেনা মুখ দেখেই গৌর মোদক ডাকলে–ও শালাবাবু, আসুন– আসুন—
খদ্দের দেখলেই গৌরের ডাকা অভ্যেস। ট্রেন থেকে যারা নামে তারা গৌরের দোকানে এসে বসে, এটা-ওটা খায়। ট্রেন এসে থামলেই গৌর ভেতরের ক্যাশ বাক্সতে চাবি দিয়ে রাস্তার সামনে এসে খদ্দের ধরে।
প্রকাশ রায় খেতেও যেমন, পকেটের পয়সা খরচ করতেও তেমনি।
বললে–কী আছে আজ?
গৌর বললে–কচুরি, সিঙ্গারা, রাজভোগ, কাঁচাগোল্লা, পান্তুয়া–
প্রকাশমামা আর বলতে দিলে না। বললে–থা থাক, আর বলতে হবে না। অত টাকা নেই আমার কাছে। শুধু চা দাও—
–শুধু চা?
–হ্যাঁ হ্যাঁ, কলকাতায় গিয়ে সব টাকা ফুরিয়ে গিয়েছে। এখন একেবারে হাত খালি। এখন নবাবগঞ্জে গিয়ে টাকা নেব তবে আবার কলকাতায় যেতে পারবো।
যখন প্রকাশমামার খাওয়া প্রায় হয়ে গিয়েছে সেই সময় হঠাৎ গৌর মোদক কথাটা বললে। বললে–শালাবাবু, আপনাদের বউ সেদিন বাপের বাড়ি গেল দেখলুম।
বাপের বাড়ি! সদার বউ! কথাটা খট করে যেন প্রকাশমামার কানে বাজলো। বললে–কী বললে তুমি?
–আজ্ঞে সেদিন এখান দিয়ে আপনাদের বউ বাপের বাড়ি গেলেন কিনা, তাই বললুম।
প্রকাশমামা অবাক হয়ে গেল। বললে–তুমি ঠিক দেখেছ? কবে?
গৌর বললে–এই তো ক’মাস আগে। সঙ্গে আপনাদের কৈলাস গোমস্তা মশাই ছিল। তিনিই তো বললেন, বউমাকে বাপের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন–
প্রকাশমামা আর দাঁড়ালো না। চায়ের দামটা দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লো। ট্রেন থেকে নেমে আরো কিছু খদ্দের তখনও দোকানে ঢুকে পড়েছে। গৌর মোদক তাদের নিয়ে বস্ত হয়ে উঠলো।
একটা সাইকেল-রিকশা ধরে একেবারে সোজা নবাবগঞ্জে এসে হাজির। কতদিন পরে প্রকাশমামার নবাবগঞ্জে আসা। সেই যে সদানন্দরই খোঁজে গিয়েছিল, তারপর সেই ব্যাপারেই মানদা মাসিকে খোসামোদ করতে করতে প্রাণ বেরিয়ে গেছে। দু’হাতে টাকাও খরচ হয়েছে, অথচ কাজের কাজও কিছু এগোয়নি। দিদি তো তা বোঝে না। কলকাতা কি সোজা জায়গা! সেখানে একটা পয়সা ছাড়া কেউ কথা বলে না। চারদিকে মারামারি কাটাকাটি। তারপর যুদ্ধের পর ভিড় তেমনি বেড়েছে। কোথা থেকে সব পঙ্গপালের মত দলে দলে লোক এসে হাজির হয়েছে। শেয়ালদা স্টেশনের কাছে গেলেই ছোট-ছোট ছেলেরা হাত পাতে। বলে–পয়সা দাও, একটা পয়সা দাও না—
আসবার সময় মাসি বলেছিল–তুমি যেন আসতে বেশি দেরি কোর না ছেলে, টাকা নিয়েই চলে এসো–
বড়বাবুও কথা দিয়েছে সদানন্দকে খুঁজে বার করে দেবে। কিন্তু দেরি হচ্ছে শুধু সময়ের অভাবে। আর সময়টাও সত্যিই বড় খারাপ পড়েছে চারদিকে। সব কিছু যেন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। মানদা মাসিরও যেন টাকার টানাটানি পড়ে গেছে ঠিক এই সময়ে। কেবল টাকা চায়। রাধার কাছে গেলেও সে টাকা-টাকা করে। বাড়ি থেকে বউও লিখেছে টাকা পাঠাও। চারদিক থেকে যদি সবাই এমন টাকা-টাকা করে তো সে একলা মানুষ কোত্থেকে এত টাকা পাবে? টাকা দেবার মালিক তো ওই একজনই। দিদি! সেই দিদি যদি একদিন হাত গুটিয়ে বসে তো তা হলেই চিত্তির।
