সদানন্দ বললে–-পয়সা নেই আমার কাছে–
বলে আবার বাড়ির রাস্তা ধরলো। কিন্তু মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। বাড়িতে আসতেই মহেশের সঙ্গে দেখা। মহেশ বললে–বাবু আপনাকে ডাকছিলেন দাদাবাবু–
–আমাকে?
–হ্যাঁ, বলছিলেন নতুন লোক, কোথায় ঘুরে বেড়ায় একলা একলা! এখন দিনকাল খারাপ, সন্ধ্যের সময় তুই বেরোতে দিলি কেন একলা? আমার ওপরে বকুনি।
সদানন্দ সোজা ওপরে চলে গেল। সমরজিৎবাবু সেই রোজকার মত নিজের বিছানার ওপর বসে ছিলেন। বললেন,–সন্ধ্যেবেলা কোথায় গিয়েছিলে তুমি? আমি মহেশের কাছে শুনে ভাবনায় পড়েছিলুম। এ কলকাতা শহর, তুমি নতুন মানুষ এখানে, নতুন মানুষ দেখলেই এখানকার গুণ্ডাবদমায়েসরা চিনতে পারে। আর কখনও সন্ধ্যেবেলা বেরিও না, বুঝলে? যুদ্ধের পর এ-জায়গা আরো খারাপ হয়ে গেছে–
সদানন্দ উত্তরে কিছু বললে না।
–তোমার কাছে হাত খরচের টাকা আছে তো?
সদানন্দ বললে–হাত খরচের টাকা আমার আর চাই না–
–কেন? তোমাকে যে দশটা টাকা দিয়েছিলুম সেটা খরচ হয়ে গেছে?
–না খরচ হয়ে যায়নি, চুরি হয়ে গেছে।
সনরজিৎবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন–চুরি হয়ে গেছে মানে? কে চুরি করলে? আমার বাড়ির চাকর-বাকর কেউ?
–না, রাস্তার একটা লোক। আমার কাছে দেশলাই চাইবার নাম করে এসে কখন ব্যাগটা তুলে নিয়েছে টের পাইনি বলে সমস্ত ঘটনাটা বলে গেল।
সমরজিৎবাবু বললেন–ওই জন্যেই তো আমি তোমাকে বলি তুমি গ্রামের ছেলে, তোমাকে সবাই ঠকিয়ে নিতে পারে। তা যাকগে, এই নাও, এই টাকা কটা রাখো তোমার কাছে। এবার খুব সাবধানে রেখো। টাকাকে অত তাচ্ছিল্য কোরো না, বুঝলে? সংসারে টাকা খুব খারাপ জিনিস নয়। টাকা ব্যবহার করতে সবাই জানে না বলেই টাকার এত বদনাম–
টাকা ক’টা নিয়ে সদানন্দ আবার তার নিজের ঘরে চলে এল।
কিন্তু অনেক রাত্রে হঠাৎ একটা গোলমালের শব্দে সদানন্দের ঘুম ভেঙে গেছে। মনে হলো দোতলায় যেন তুমুল হট্টগোল চলছে। সমরজিৎবাবুর চড়া গলা শোনা যাচ্ছিল একদিকে আর অন্যদিকে একজন পুরুষের গলা।
সদানন্দ ঘরের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালো। গোলমালটা ঠিক মাথার ওপর হচ্ছিল।
বাইরে বারান্দায় আসতেই দেখলে মহেশও দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির নিচে।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–ওপরে কীসের গোলমাল মহেশ?
মহেশ বললে–বড়দাদাবাবু এসেছে–
সদানন্দ বললে–বড়দাদাবাবু এসেছে তো কাকাবাবু এত চেঁচাচ্ছেন কেন? মনে হচ্ছে যেন খুব রাগ করেছেন?
–বড়দাদাবাবু আজকে মদ খেয়েছে যে। এসে বউদিকে খুব মারধোর করেছে
–সে কী? কেন, মারধোর করেছে কেন?
মহেশ বললে–মদ খেলে কী মানুষের জ্ঞান-গম্যি কিছু থাকে! বড়দাদাবাবু যে এক-একদিন বেশি খেয়ে ফেলে!
ওদিকে সমরজিৎবাবু তখন চিৎকার করছেন–বেরিয়ে যাও বাড়ি থেকে, বেরিয়ে যাও–আর যদি কখনও মদ খেয়ে বাড়ি ঢোক তো তোমাকে আমি বাড়ি ঢুকতে দেব না–
ওদিক থেকে ছেলেও চিৎকার করছে–হ্যাঁ ঢুকবো, আলবাৎ ঢুকবো—
সমরজিৎবাবু এবার ডাকলেন-মহেশ, মহেশ, এদিকে আয় তো–
মহেশ সব শুনছিল সদানন্দের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। সে বোধহয় জানতো এবার তার ডাক পড়বে।
সদানন্দ বললে–ওই তোমার ডাক পড়েছে মহেশ, যাও–
মহেশ বললে–দেখেছেন, আমার কপালের গেরো! এখন বড়দাদাবাবুকে বাড়ি থেকে ধরাধরি করে বার করে দিতে হবে।
–বাড়ি থেকে বার করে দেবে মানে?
এ-কথার উত্তর না দিয়ে মহেশ সোজা ওপরে উঠে গেল। তাকে দেখে সমরজিৎবাবু বললেন–যা, খোকাকে বাড়ির বাইরে বার করে দিয়ে আয়। আর যেন কখখনো ভেতরে না ঢোকে। যত সব নচ্ছার কুলাঙ্গার হয়েছে, এমন ছেলের আমি মুখদর্শন করতে চাই নে– যা —
কিন্তু মাতালকে জব্দ করা কি অত সহজ! মহেশ কাছে যেতেই বড়দাদাবাবু তার দিকে তেড়ে এসেছে। বললে–আয়, আমার দিকে এগিয়ে আয়, দেখি তোরই একদিন কি আমার একদিন!
বলে হঠাৎ নিজের দরজায় দুম-দুম্ করে লাথি মারতে লাগলো। দরজা খোল, দরজা খোল।
সমরজিৎবাবু বলে উঠলেন–দরজা খুলো না বউমা, খবরদার দরজা খুলো না, দেখি ও কী করতে পারে?
বউমা বোধহয় ভয় পেয়ে তার আগেই ঘরের ভেতর থেকে দরজায় খিল দিয়ে দিয়েছিল। তখন সে আরো ভয় পেয়ে গিয়েছে। শ্বশুর বললেও হয়ত দরজা খুলতো না।
সমরজিৎবাবুর ছেলে তখন রাগে একবার দরজায় লাথি মারে আর একবার মহেশকে মারতে আসে!
এসব ঘটনা নতুন নয় মহেশের কাছে। মহেশের যেমন নতুন নয়, এ বাড়ির অন্য কারো কাছেও আবার তেমনি নতুন নয়। মাঝে-মাঝে এরকম ঘটনা যে ঘটে তা মহেশের কথাতেই বোঝা গিয়েছিল। শুধু সদানন্দ নতুন এ বাড়িতে এসেছে বলে তার কাছে সবটাই নতুন লাগছিল।
কিন্তু বড়দাদাবাবুর গায়ে যত জোরই থাক, মদ খেয়ে নেশা হবার পর মানুষ বোধ হয় দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন সেই দুর্বল মানুষকে নিয়ে বিশেষ সমস্যা থাকে না। মহেশ তার বড়দাদাবাবুকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নিয়ে এল। তারপর সেই মাঝরাত্রে বাড়ির বাইরে রেখে দিয়ে সদর দরজা বন্ধ করে দিলে।
সদানন্দ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দৃশ্যটা দেখেছিল। সদর দরজা বন্ধ করতেই সদানন্দ বললে–মহেশ, তোমার বড়দাদাবাবু কি বাইরেই সারা রাত পড়ে থাকবে নাকি?
পেছন থেকে সমরজিৎবাবুর গলা শোনা গেল। তিনি বললেন–হ্যাঁ, ও বাইরেই পড়ে থাকুক আর জাহান্নমেই যাক তোমার তা দেখবার দরকার নেই। তুমি ও নিয়ে মাথা ঘামিও না—
