সদানন্দ বললে–আমার কথা ছেড়ে দাও মহেশ, তোমাদের বড়বাবু মনের মতো ছেলে কেন হলো না তাই বলো তো? বাবু তো ভালো করে দেখে শুনেই তবে তাকে নিয়েছিলেন, তবে? বড়দাদাবাবু দোষটা কী করেছে?
মহেশ বললে, ওই যে বললুম, বড়দাদাবাবু রাত্তিরে বাড়িতে থাকে না–
–তা বাড়ি থাকে না সে তো চাকরির জন্যে। পুলিসের চাকরিতে যখন যেখানে ডিউটি পড়ে সেখানে তো যেতেই হবে। বড়দাদাবাবুকে তো চাকরির জন্যই বাইরে বাইরে রাত কাটাতে হয়–
মহেশ গলা নিচু করে এবার বললে–না দাদাবাবু নয়। ও আপনি ভুল শুনেছেন, আসলে বৌদিদিকে পছন্দই হয় না বড়দাদাবাবুর।
সদানন্দ বললে–পছন্দ হয় না কেন? দেখতে খারাপ?
–আজ্ঞে না, বাবু নিজে হাজার-হাজার মেয়ে দেখে তার মধ্যে থেকে বেছে তবে এই বৌদিকে ঘরে এনেছে। খারাপ দেখতে হলে কি বাবু এঁকে ঘরের বউ করতেন? সেজন্যে নয়। বড়দাদাবাবুর যে বাইরে-বাইরে মন। বড়দাদাবাবুর যে বাইরেও একটা সংসার আছে– সেই দিকেই যে বড়দাদাবাবুর মন পড়ে থাকে–
সদানন্দ বললে–সে কে?
–আজ্ঞে তাকে বড়দাদাবাবু বাড়ি ভাড়া করে রেখে দিয়েছে। মাইনে-টাইনে বড়দাদাবাবু যা পায় সব সেখানেই ঢালে, বাবুকে একটা পয়সাও দেয় না। অথচ বড়-দাদাবাবু আগে এমন ছিল না–
সদানন্দ বললে–তা তোমার বাবু কি ছেলের মাইনের টাকা চায়?
মহেশ বললে–আজ্ঞে তা চাইবে কেন? বাবুর কি টাকার অভাব যে বাবু ছেলের মাইনের টাকা নিয়ে সংসার চালাবে? রাণাঘাটে বাবুর অত জমি-জমা পুকুর বাগান, সেই টাকাই কে খায় তার ঠিক নেই। শুধু আম কাঁঠালের বাগানই তো তিনশো বিঘের, তারপরে একটা বিল সেটাও চারশো বিঘের ওপর, সে সব টাকাও খাবার লোক নেই, সে-সব দেখাশোনা করবারও লোক নেই, বড়দাদাবাবুর চাকরি করবার তো দরকারই ছিল না। বাবুর সঙ্গে তো এই নিয়েই বড়দাদাবাবুর মনকষাকষি। বাবুর কথা না শুনে বড়দাদাবাবু ওই চাকরি নিলে, আর তখন থেকেই বড়দাদাবাবুর স্বভাব-চরিত্তির খারাপ হয়ে গেল। তা পুলিসের চাকরিতে মানুষের স্বভাব-চরিত্তির কি ঠিক থাকে? আপনিই বলুন দাদাবাবু? আমার বাবুও তো তাই বলেন। ওই চাকরিতে ঢোকবার আগে তো বড়দাদাবাবুর কোনও গণ্ডগোল ছিল না। লেখাপড়া করতো, তারপর একদিন বিয়ে হলো–তারপর কার পাল্লায় পড়ে যে চাকরি নিয়ে বসলো, সেই তখন থেকেই এই কাণ্ড–। এখন চাকরি করে যা কামায় সব সেই রাক্ষুসীর গভ্যে ঢালে–
মহেশ হয়তো আরো অনেক কিছু বলতো, কিন্তু হঠাৎ দোতলা থেকে সমরজিৎবাবু ডাকতেই সে চলে গেল।
সদানন্দ সেখানে বসে বসে মহেশের কথাগুলোই ভাবতে লাগলো। এক জায়গার অশান্তি থেকে দূরে থাকবার জন্যেই সে পালিয়ে এসেছে, কিন্তু এখানে এই কলকাতায় এসেও সে আর এক অশান্তির মধ্যে জড়িয়ে পড়বে নাকি? এক বন্ধন থেকে আর এক বন্ধনে? রাণাঘাটের জমি-জমা বাগান-পুকুর থেকে টাকা আনবার সময়েই তাহলে তার সঙ্গে সমরজিৎবাবুর দেখা! আর সেই জন্যেই এ বাড়িতে তার এত খাতির! সমরজিৎবাবু কি চান সে এবাড়ির পালিত পুত্র হয়ে জীবন কাটাবে আর তাঁর জমি-জমা বাগান-পুকুর দেখাশোনা করে পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে খাবে! তা যদি হতো সে তো নবাবগঞ্জেই থাকতে পারতো। নবাবগঞ্জের জমি-জমা বাগান-পুকুর নিয়ে সে তো দিব্যি দিন কাটাতে পারতো আর আরাম করে চৌধুরী-পরিবারেরও বংশবৃদ্ধি করে যেত।
সদানন্দ ঠিক করলে–না, এখানে থাকা তার আর চলবে না এখানকার এই নির্ঝঞ্ঝাট স্বাধীনতাও তার কাছে দাসত্বেরই সমান। কিন্তু এখান থেকে চলে গিয়েই বা সে কী করবে? কোথায়ই বা যাবে? যেখানে যার কাছেই যাবে সেখানেই তো তারা তার কাছ থেকে মূল্য চাইবে। মুল্য না দিলে সংসারে কেউই কিছু দেয় না! পৃথিবীতে বাঁচতে গেলেই কি তবে ট্যাক্স দিতে হবে? আত্মসম্মানের ট্যাক্স, নয়তো পরাধীনতার ট্যাক্স, আর নয়তো স্বার্থত্যাগের ট্যাক্স!
মহেশের কাছে কথাগুলো শুনে আর বাড়ির ভেতরে থাকতে পারলে না সে। রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু রাস্তাতেই কি শান্তি আছে! মানুষগুলোকে দেখে দেখে মনে হলো সবাই যেন ছুটছে। কোথায় ছুটছে সবাই? বউবাজারের মোড়ের কাছে আসতেই একজন লোক এসে তাকে জিজ্ঞেস করলে–দাদা, আপনার কাছে দেশলাই আছে?
দেশলাই!
লোকটা যেন কল্পনা করে নিয়েছে সদানন্দ সিগারেট খায়।
বললে–আপনি সিগ্রেট খান না? ঠিক আছে–
বলে দেশলাই-এর খোঁজে বোধহয় অন্য একজনের সন্ধানে চলে গেল। নেশার খোরাকে টান পড়েছে লোকটার। অথচ দেশলাই কিনবে না। কত পান-বিড়ি-দেশলাই-এর দোকান রয়েছে। সেখানে পয়সা খরচ করে দেশলাই কিনলেই পারো। আর দেশলাই কিনতেই যদি এত পয়সার টানাটানি তাহলে নেশা করা কেন!
বাড়ির কাছে আসতেই একটা ভিখিরি এসে দাঁড়ালো–একটা পয়সা দাও বাবু–
সদানন্দ তার দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলে। লোকটার হাত-পা খসে গেছে। হাতের পায়ের আঙুলগুলো নেই। সদানন্দ পকেট থেকে পয়সা বার করে দিতে গেল। কিন্তু পকেটে হাত দিয়েই চমকে উঠলো। টাকা-পয়সাগুলো কোথায় গেল? একটা ব্যাগের মধ্যে রেখেছিল টাকা-পয়সা। সমরজিৎবাবু তার হাত-খরচের জন্যে দিয়েছিলেন। জামার কোনও পকেটেই নেই। অথচ বেরোবার সময় মনে আছে বুকপকেটে ব্যাগটা নিয়েই বেরিয়েছিল সে।
লোকটা তখনও হাতটা বাড়িয়ে আছে।
