সমরজিৎবাবু বেশ অদ্ভুত লোক। কোনও কিছুতেই বিকার নেই তাঁর। এত বড় একটা যুদ্ধ চলে গেছে, কলকাতার বুকের মধ্যে জাপানীদের বোমা পড়েছে, দলে দলে কলকাতার লোক শহর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু তিনি নির্ভয়ে কলকাতায় ছিলেন।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করতো–আপনার তখন ভয় করেনি?
সমজিৎবাবু হাসতেন। বলতেন–কীসের ভয়? তা সে তো যেখানে যাবে সেখানেই প্রাণের ভয় আছে। ধরো ট্রেনে চড়ে যাচ্ছে, সে-ট্রেনও তো কলিশন্ হয়ে গুঁড়ো হয়ে যেতে পারে, তখন? তুমি পালাবে কোথায় সদানন্দ? বইতে পড়োনি–পলাইবার পথ নাই যম আছে পিছে–
সমরজিৎবাবুর কাজের মধ্যে কাজ ভোর চারটের সময় উঠে ট্রামে করে গঙ্গায় যাওয়া, সেখানে গিয়ে অবগাহন স্নান করে বাড়িতে এসে পূজো করা। সেই পূজোই চলতো এক ঘণ্টা ধরে। তারপরে খবরের কাগজ নিয়ে বসতেন।
সদানন্দ মাঝে মাঝে কাছে যেত। বলতো–আমার কথাটা একটু ভেবেছেন কাকাবাবু? আপনি আমাকে বলেছিলেন একটা কাজ যোগাড় করে দেবেন–
সমরজিৎবাবু বলতেন–কেন, তোমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে নাকি?
সদানন্দ শেষকালে একদিন বলছিল–হ্যাঁ, অসুবিধে হচ্ছে, আমি আর কতদিন আপনার ঘাড়ে বসে বসে খাবো? আমার লজ্জা করে। কারো দয়ার দান নিতে আমার ভালো লাগে না। একদিন-দুদিন হয়, তাতে কিছু আসে যায় না, কিন্তু মাসের পর মাস এরকম ভালো লাগে? এবার আমাকে আপনি ছেড়ে দিন।
বলে আর কোনও দিকে না চেয়ে সোজা তার নিজের ঘরে চলে এসেছিল। সমরজিৎ বাবু যে-ঘরটায় তাকে থাকতে দিয়েছিলেন সেটা বেশ বড়। বৌবাজারের মত জায়গার তুলনায় বলতে গেলে সে-ঘরে আলো-হাওয়া ভালোই ছিল। সদানন্দ প্রথম দিন থেকেই ঘরটার মধ্যে শুয়ে পড়ে থাকতো। কোনও কাজ নেই, আবার কোন অকাজও নেই তার। বাড়িটার ভেতরে চাকর বাকরের অনেক খুচরো কথাবার্তা কানে আসতো। তার মধ্যে অনেক কথাই তাদের নিজেদের সম্পর্কে। সংসারের ছোটোখাটো খুঁটি-নাটি নিয়ে বচসা, আর নয়তো হাসি-হাট্টা এক-এক সময় সদানন্দকে নিয়েও আলোচনা হতো। লোকটা কে? বাবুর কে হয়, কেন এখানে আছে, কত দিন এখানে থাকবে, এখানে কী সূত্রে এল, ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক প্রসঙ্গ।
সেদিন নিজের ঘরে চলে আসবার সঙ্গে সঙ্গে মহেশ তার ঘরে এল। বললে, আপনি বাবুর সঙ্গে ঝগড়া করেছেন নাকি দাদাবাবু? বাবু বলছিলেন।
সদানন্দ বললে–আমার আর এখানে থাকতে ভালো লাগছে না মহেশ। তুমি তো জানো আমি এখানে আসতে চাইনি, তোমার বাবুই এখানে জোর করে নিয়ে এসেছেন–
মহেশ বললে–কিন্তু এখানে না থাকলে আপনি যাবেন কোথায়? আপনি তো রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছেন–
সদানন্দ চমকে উঠলো–আমি রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি কে বললে?
মহেশ হাসতে লাগলো। বললে–আমি জানি–
সদানন্দ উঠে বসলো। বললে–তুমি কী করে জানলে? বলতেই হবে তুমি কী করে জানলে?
মহেশ বললে–বাবু যে মা’কে বলছিল। মা আপনার কথা বাবুকে বলছিল কিনা। মা’র কথায় বাবু বললে–ওকে কিছু বোল না তুমি, ও বড়ঘরের ছেলে, রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে
তারপর একটু থেমেই বললে– আপনি বাবুর ওপর রাগ করবেন না দাদাবাবু, বাবুর কষ্টটা আপনি তো দেখতে পান না। বাইরে তো বাবু বেশ হাসি-খুশী, কিন্তু বাবুর মনের ভেতরে কোনও সুখ নেই–
সদানন্দ অবাক হয়ে গেল। বললে–মনে সুখ নেই? কেন?
মহেশ বললে–সে দাদাবাবু অনেক কথা। টাকা থাকলেই কি মানুষের সুখ হয়? আমাদের টাকাকড়ি কিছু নেই, তবু আমরা বাবুর চেয়ে শতগুণে সুখী। আমরা পড়ি আর ঘুমোই। কিন্তু বাবুর দু’চোখে ঘুম নেই—
প্রথম প্রথম অবাক লেগেছিল সদানন্দর। যে-মানুষ সদানন্দর মত অসুখী লোককে বাড়িতে ডেকে এনে নিজের মত আদর-যত্ন করছে তার সুখ-দুঃখের দিকটা তো কখনও সদানন্দ ভাবেনি। নিজের দুঃখটাকেই বড় করে দেখে পৃথিবীর আর সকলকে সুখী মনে করার মধ্যে কেমন আত্মরতির আনন্দ থাকে। সেই আনন্দেই সে এতদিন বিভোর হয়ে ছিল। এবার যেন তার মনের তৃতীয় নয়ন খুলে গেল।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–কাকাবাবুর কিসের দুঃখ সত্যি করে বলো তো?
মহেশ বললে–আপনি তো জানেন না, ওই যে সেদিন দাদাবাবুকে দেখলেন!
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ দেখেছি, কখনও বাড়ি আসে আবার কখনও বাড়ি আসে না–
মহেশ বললে–-হ্যাঁ, তা আপনি যেন কাউকে বলবেন না, সেই দাদাবাবু তো বাবুর নিজের ছেলে নয়–
–সে কী? নিজের ছেলে নয়?
–না। বাবু ওকে পুষ্যি নিয়েছেন—
সদানন্দ অবাক হয়ে গেল কথাটা শুনে। এতদিন এ বাড়িতে এসেছে, অথচ এ-কথাটা তো কখনও কানে আসেনি তার। এতদিনের সমস্ত ঘটনাটা পর্যালোচনা করে করে অনেক ঘটনার অনেক ব্যাখ্যা খুঁজতে চেষ্টা করলে সে। কিন্তু পালিত-পুত্ৰই যদি হয় তো তাতে দুঃখটা কিসের! ছোটবেলা থেকে যদি এমন বাবার কাছেই মানুষ হয়ে থাকে তো তাকে নিয়ে তো সুখী হবারই কথা। আর, তা ছাড়া ছেলেও তো জানে একদিন এই সমস্ত সম্পত্তির মালিক হবে সে নিজেই।
–না, আপনি আমার বাবুর ওপর রাগ করবেন না দাদাবাবু। বড়দাদাবাবু যদি মানুষ হতো তো বাবুর কোনও দুঃখু থাকতো না। কিন্তু বড়দাদাবাবু যে মানুষ নয়। দেখেন না অনেক দিন রাতে বাড়িতেই আসে না বড়দাদাবাবু!
–তা তোমার বাবুর কোনও ছেলেমেয়ে কিছুই হয়নি?
মহেশ বললে– না, ছেলে-মেয়ে কিছু হয়নি বলেই তো বাবুর দুঃখু। আবার যাকে পুষ্যি নিলেন সেও তো কেমন মনের মতো হলো না। তাই আপনার ওপর এত টান পড়ে গেছে। আপনাকে বাবুর খুব পছন্দ হয়েছে দাদাবাবু। আমাকে আড়ালে জিজ্ঞাসা করেন আপনাকে ভালো খেতে দিচ্ছি কিনা। আপনি যা খেতে ভালোবাসেন তা-ই বাজার থেকে আনতে বলেন। সত্যি দাদাবাবু, আপনাকে বাবু কী চোখে যে দেখেছেন তা বলতে পারি নে–
