নয়নতারা বললে–বংশ আপনাদের রক্ষে হবে না মা। আপনি হাজার চেষ্টা করলেও হবে না, আমিও হাজার চেষ্টা করলেও হবে না। কালীগঞ্জের বউ-এর যে-সর্বনাশ আপনারা করেছেন, তারপরে তার অভিশাপ ফলবে না বলতে চান?
চৌধুরী মশাই-এর মুখ দিয়ে এতক্ষণ কোনও কথাই বেরোয়নি। তারক চক্রবর্তীমশাই তার দিকে চেয়ে বললেন–বউমাকে যদি বাপের বাড়ি পাঠাতেই হয় চৌধুরী মশাই তো এমনি পাঠালে চলবে না, রীতিমত যেমন নিয়ম আছে তেমনি নিয়মে পাঠাতে হবে–
সা’মশাই বললো এমনি পাঠিয়ে দেবেন না, আপনার বউমাও তো চলে যেতে চাইছেন। আপনার সরকার আর একজন দাসীকে সঙ্গে দিয়ে ওঁর বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিন। সেই ভালো–
বেহারি পালও একটা কী বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই বাধা পড়লো। চৌধুরীবাড়ির সদরে নজর পড়তেই সবাই দেখলে জনতিনেক লোক হাঁড়ি, থালা, বারকোষ নিয়ে ভেতরে ঢুকছে। একজনের মাথায় আবার আম কাঁঠালের ঝুড়ি।
বিপিনও বাড়ির ভেতরে এত ভিড় দেখে অবাক হয়ে গেছে।
কে একজন এগিয়ে গিয়ে বুঝি জিজ্ঞেস করলে কোত্থেকে আসছে গো তোমরা? এ সব কী?
বিপিন বললে–আসছি কেষ্টনগর থেকে, জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব নিয়ে–
সঙ্গে সঙ্গে খবরটা এক মুখ থেকে আর এক মুখে রটে যেতে যেতে একেবারে আসরের ভেতরে গিয়ে কথাটা পৌঁছুলো। বেহারি পালের বউ দাঁড়িয়ে সব শুনছিল এতক্ষণ। তার পাশেই নিতাই হালদারের মা। তার পাশে পাড়ার আরো ক’জন মেয়েমানুষ ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর দরজার একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল চৌধুরী-গিন্নী। ঘরের ভেতরে চৌধুরী মশাই, তারক চক্রবর্তী, বেহারি পাল, সা’ মশাই, সকলের কানেই কথাটা গিয়ে পৌঁছলো। কে? কোথা থেকে এসেছে? কেষ্টনগর থেকে? জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব?
সমস্ত আবহাওয়াটা যেন সঙ্গে সঙ্গে অন্যরকম হয়ে গেল। এতক্ষণ ছন্দ তাল লয় সব ঠিক মত বজায় ছিল, কিন্তু এবার যেন সব বেতাল হয়ে গেল।
চৌধুরী-গিন্নী তত্ত্বওয়ালাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। বিপিনের সামনে এসে বললে–এসো এসো বাবা তোমরা, এসো–
কিন্তু নয়নতারার কানে কথাটা যেতেই নয়নতারা ভিড় ঠেলে নিজেই বৈঠকখানার বাইরে চলে এসেছে। দিদিমণিকে সেই অবস্থায় দেখে বিপিনও যেন হাসতে ভুলে গিয়েছিল।
নয়নতারা বিপিনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলে–বিপিন, তুমি?
–মাস্টার মশাই জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব পাঠিয়েছেন দিদিমণি। তুমি ভালো আছো?
নয়নতারা সেকথার উত্তর না দিয়ে বলে উঠলো– জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব আর নামাতে হবে এখানে, তোমরা সব ফিরিয়ে নিয়ে যাও–
বিপিন চমকে উঠেছে। বললে–কেন দিদিমণি, দাদাবাবু এত কষ্ট করে সব যোগাড় যন্তর করলেন, ফিরিয়ে নিয়ে যাবো?
–হ্যাঁ, এখুনি ফিরিয়ে নিয়ে যাও
তখনও বিপিন কিছু বুঝতে পারছে না– সে স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল নয়নতারার দিকে। বাড়ির ভেতরে যত লোক জমেছিল সবাই তখন একদৃষ্টে নয়নতারার কাণ্ড দেখছে।
চৌধুরী-গিন্নী বললে–ওরা তত্ত্ব নিয়ে এসেছে, তুমি ফেরত পাঠাচ্ছো কেন বউমা?
–হ্যাঁ ফেরত যাবে ওরা। যে বাড়িতে জামাই নেই, সেখানে আবার বাবা জামাইষষ্ঠী পাঠিয়েছে! ফিরে যাও, ফিরে যাও বলছি!
বিপিনদের তখনও হতভম্ব ভাবটা কাটেনি। বললে–ফিরে যাবো?
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ, আমি বলছি ফিরে যাবে। যদি ফিরিয়ে নিয়ে না যাও তো আমি এই মাটিতে সব ফেলে দেব। যাও ফিরে, এখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছো? আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? তোমাদের জামাইবাবু এ বাড়িতে নেই। এ বাড়িতে আর কখনও তিনি আসবেনও না। আমিও আর এ বাড়ির কেউ নই, তোমরা যাও, যাও-চলে যাও–
বিপিনরা কী করবে বুঝতে পারছিল না। চৌধুরী মশাই হঠাৎ এসে মাঝখানে দাঁড়ালেন। বললেন– কী করছো বউমা, ওদের তাড়িয়ে দিচ্ছ কেন? ওরা তত্ত্ব নিয়ে এসেছে, ওদের কী অন্যায় হয়েছে? ওরা থাক্, এসো, তোমরা এসো-–
কিন্তু নয়নতারা হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসলো। বললে–না, ওরা আর এখানে দাঁড়াবে না–বলে বিপিনের হাতের বারকোষটা ঠেলে দিতেই তার ওপরের দুই রাবড়ির মাটির হাঁড়িগুলো মাটিতে পড়ে ভেঙে একেবারে চুরমার হয়ে সমস্ত উঠোনময় ছড়িয়ে গেল।
.
এসব কতদিনের কথা। সেসব দিনের কথা এমন করে যে আবার একদিন পর্যালোচনা করতে হবে এ-কথা কি সেদিনকার সদানন্দ ভেবেছিল! তখন কি একবারও মনে হয়েছিল যে এই সমস্ত ঘটনা-পরম্পরার জন্যে তাকে আবার একদিন জবাবদিহি করতে হবে!
আজ তো তার সর্বস্ব নিঃশেষ হয়ে গেছে। একদিন নবাবগঞ্জের সমস্ত সম্পত্তির যে একমাত্র ওয়ারিশন হতে পারতো, তার মাতামহের ভাগলপুরের সমস্ত সম্পত্তিরও যে একমাত্র উত্তরাধিকারী হতে পারতো সে-ই কিনা আজ নিঃস্ব। চৌবেড়িয়ায় রসিক পালের অতিথিশালার এক কোণে তাকে যে আজ দিনাতিপাত করতে হয় এও নাকি তার অপরাধ! আশ্চর্য!
তবে কি সদানন্দ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে শুধু অপরাধই করেছে?
তার চেয়ে যদি সে নবাবগঞ্জের সংসার-জীবনকেই স্বীকার করে নিত, পিতৃপুরুষের পাপের আর অন্যায়ের আর অত্যাচারের ওয়ারিশন হয়ে সব সহ্য করে যেত তাহলে আর আজ এমন করে তাকে রসিক পালের আশ্রয়েও থাকতে হতো না, আর আসামী হতেও হতো না।
মনে আছে সেদিন কলকাতার সেই অন্ধকার দিনগুলোতে এক-একবার তার বাড়ির কথা মনে পড়তো। মনে পড়তো কালীগঞ্জের বউ-এর কথা। মনে পড়তো নয়নতারার কথা। নয়নতারার কথা মনে পড়লেই মনটাকে সে অন্য খাতে বইয়ে দেবার চেষ্টা করতো। অন্যমনস্ক হবার চেষ্টা করতো। তার অতীতকে সে মন থেকে মুছে ফেলবার চেষ্টা করতো। তারপর যখন আর কিছু ভালো লাগতো না তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তো। বেরিয়ে যত দূর ইচ্ছে হেঁটে-হেঁটে চলে যেত। তারপর আবার এক সময়ে বাড়িতে এসে ঢুকে পড়তো। দেয়ালে-দেয়ালে কত রকম পোস্টার লাগানো থাকতো। কোনওটাতে লেখা থাকতে সাবধান, শত্রুর চর নিকটেই আছে।
