বেহারি পালের বউ-এর তখন আসল কথাটা জানবার ইচ্ছে। বললে–তুমি থামো না বউ, বউমা যা বলতে চায় তা বলতে দাও না—
কিন্তু শাশুড়ির কথার উত্তর দিলে নয়নতারা। বললে– দোহাই মা আপনার, এমন প্রার্থনা করবেন না আপনি, আমি তো দিনরাত ভগবানকে তাই বলছি যেন এর মধ্যে বাবা আর না এসে পড়েন! আমি যা কষ্ট পাচ্ছি তা পাচ্ছি, বাবা আমার এ-কষ্ট দেখলে আর বাঁচবেন না–তাকে আর বাঁচাতে পারবো না। আর শুধু বাবা কেন, আমার কষ্টের কথা জানলে আজ এখানে যাঁরা হাজির, তারাও কানে আঙুল দেবেন–
তারক চক্রবর্তী মশাই বললেন–আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছিনে মা, কী এমন ব্যাপার যে শুনলে কানে আঙুল দিতে হবে?
চৌধুরী মশাই বললেন–আপনারা উঠুন সা’মশাই, আপনারা আর কেন বসে আছেন, আমার বউমা পাগল, পাগল না হলে এমন প্রলাপ কেউ বকে?
নয়নতারা সঙ্গে সঙ্গে যেন ক্ষেপে উঠলো। বললে–পাগল? আমি পাগল? আমি প্রলাপ বকছি? কিন্তু রোজ রাত্রে তাহলে আপনি পাগলের ঘরে ঢোকেন কেন? কীসের জন্যে, কোন্ আকর্ষণে পাগলের কাছে তবে যান? আমি পাগল। অন্ধকারে রাত্রে আমার ঘরে ঢোকবার সময় তো মনে থাকে না আমি পাগল? তখন তো আমি পাছে টের পাই, তাই টিপি-টিপি পায়ে আমার ঘরে ঢোকেন! বলুন, আমার কথার জবাব দিন? বলুন, কেন আমার ঘরে ঢোকেন বলুন?
চৌধুরী মশাই-এর মুখ-চোখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পাথরের মত তিনি তখন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন।
–বলুন? চুপ করে থাকবেন না। আমার কথার জবাব দিন? নিজের হাতের আঙুল দিয়ে নিজের বাবার গলা টিপে মারতে পেরেছেন বলে ভেবেছেন আমাকেও গলা টিপে মারবেন? বলুন, জবাব দিন? একটু আগে আমাকে নরকের ভয় দেখালেন! ভয় দেখাতে আপনার লজ্জা করে না? এর চেয়ে বীভৎস নরককুণ্ডু আর কী হতে পারে? নরককুণ্ডু না হলে শ্বশুর হয়ে ছেলের বউ-এর ঘরে কেউ ঢুকতে পারে? হায় রে, আজ আমিই হলুম পাগল, আশ্চর্য! আপনি ভেবেছেন আমাকে পাগল বলে আপনি পার পাবেন? পাগল হলে কি এবাড়িতে আমি কাউকে আস্ত রাখতুম? বলুন, জবাব দিন আমার কথার?
চারিদিকে থমথমে আবহাওয়া। সবাই যেন বোবা হয়ে গেছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের গুমোট গরম যেন হঠাৎ এক মুহূর্তে উত্তাপের বরফ হয়ে জমাট বেঁধে গেছে।
প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙলো বেহারি পাল। বললে–ছি ছি চৌধুরী মশাই, এটা সত্যি একটা বড় অন্যায় কাজ হয়েছে আপনার–
তারক চক্রবর্তী বললেন–কই চৌধুরী মশাই, আমরা তো বিশ্বাস করতে পারছি না আপনি এ কাজ করতে পারেন–আপনি আমাদের নবাবগঞ্জের বিশিষ্ট একজন ভদ্রলোক হয়ে…।
চৌধুরী মশাই-এর নিচু মাথা তখন আরো নিচু হয়ে গেছে। সকলের ধিক্কার-গঞ্জনার মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে তখন।
কিন্তু পেছন থেকে চৌধুরী-গিন্নীর গলার আওয়াজ হঠাৎ সব গুঞ্জন স্তব্ধ করে দিলে। পেছন থেকে চৌধুরী গিন্নী বলে উঠল– চৌধুরী মশাইকে আপনারা সবাই মিলে দোষ দিচ্ছেন কেন? চৌধুরী মশাই-এর কী দোষটা দেখলেন আপনারা? দোষ দিতে হয় আমাকে দোষ দিন। আমি যেমন বলেছি চৌধুরী মশাই তেমনি করেছেন। এছাড়া আমাদের উপায় কী ছিল বলুন? আমার ছেলে নেই, ছেলে অনেকদিন হলো নিরুদ্দেশ, তাহলে আমার এই এত সম্পত্তি এ-সব কে খাবে? কে দেখবে? কার জন্যে তাহলে এই সংসার করা? তাহলে সব কিছু ছেড়ে বনে চলে গেলেই হয়! কোন্ সুখের জন্যে লোকে ছেলের বিয়ে দেয়? কীসের আশায়? বংশই যদি না রইল তো এ ছাই সংসার দিয়ে হবেই বা কী? আমার শ্বশুর অনেক সাধ করে নাতির জন্যে সোনার হার গড়িয়ে রেখে দিয়ে গেছেন, সে হার তাহলে কার গলায় পরাবো? এছাড়া আমাদের আর কী গতি ছিল বলুন? বউমা আমাদের নামে দোষ দিচ্ছে এখন, কিন্তু বউমারও তো মা হতে ইচ্ছে করে? সেই বউমাই বা কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? আমরা যখন থাকবো না, তখন তো বউমাই এ-সংসারের মালিক হবে, তখন? তখন বউমার কার জন্যে কীসের আশায় সংসার করবে? আপনারা অন্যায়টা আমাদেরই দেখলেন, কিন্তু আমাদের দুঃখটা তো বুঝলেন না–
তারক চক্রবর্তী উপস্থিতদের মধ্যে সব চেয়ে প্রবীণ লোক। বললেন কিন্তু বউমা, হাজার দুঃখ থাক তোমার, তা বলে চৌধুরী মশাই-এর এই আচরণ তো সহ্য করা যায় না–
চৌধুরী-গিন্নী ভেতর থেকে বললে–যদি সহ্য করা না যায় তো আমরাও আর বউমাকে সহ্য করবো না। ছেলের বিয়ে দিয়ে বউ এনেছিলুম, সেই ছেলেকেই যখন বউমা বশ করতে পারলে না, তখন অমন বউমাকেও আমার দরকার নেই। যাদের বাড়ির মেয়ে তাদের বাড়িতেই আবার চলে যাক–দুষ্ট গরুর চেয়ে আমার শূন্য গোয়াল ভালো–
তা বললে তো চলবে না বউমা–আমরা পাঁচজন গ্রামের ভদ্রলোক থাকতে তোমার বউমাকে আমরা অপমান করে তাড়িয়ে দিতে দেব না–তোমরা তাকে তাড়িয়ে দিতে পারবে না। তাতে আমাদের গ্রামের অকল্যাণ হবে–
চৌধুরী-গিন্নী তেমনি গলা উঁচু করেই বললে–কিন্তু অমন বউও আমার দরকার নেই, আমি অমন বউকে খাইয়ে পরিয়ে বাহার করে ঘর সাজিয়ে রাখতে পারবো না। ও এখুনি বিদেয় হয়ে যাক–
কথাটা খুবই রূঢ়। সকলেরই খট করে কানে লাগলো।
নয়নতারা বললে–কিন্তু আমিও আর থাকতে চাই না মা এখানে, এই নরককুণ্ডুতে। আমাকে পায়ে ধরে সাধলেও আমি থাকছি না—
–তাহলে তোমার যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাও। তা সে বাপের বাড়িই যাও আর রেল বাজারে গিয়ে ঘর ভাড়া করে থাকো আমি সে-সব দেখতে যাচ্ছিনে–আমার বংশই যদি রক্ষে না হলে তোমার মত বউ নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাবো?
