তারক চক্রবর্তী মশাই আর থাকতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করলেন–কী কথা মানতে পারোনি মা?
–সেই কথা বলতেই তো আজকে আপনাদের সকলকে ডেকেছি। আমার মা যদি আজ বেঁচে থাকতো তো আজকে আমি মাকেই বলতুম যে, মা তোমার সব কথা আমি মাথা নিচু করে মানতে পারলুম না। আমাকে তুমি সেজন্যে ক্ষমা কোর। মা বেঁচে থাকলে মা আমার কথার উত্তরে কী বলতো জানি না। কিন্তু আমার মা নেই, তাই আপনাদের মত গুরুজনদেরই আমি জিজ্ঞেস করছি, আপনাদের কাছেই আমি প্রশ্ন রাখছি, আপনারাই বলুন, আমার কি অন্যায় হয়েছে? আমি কি অন্যায় করেছি?
এবার সা’মশাই জিজ্ঞেস করলেন–কোন কথাটা তুমি রাখতে পারোনি মা?
–আমার শাশুড়ি আমায় বলেছিলেন রাত্রে আমার ঘরের দরজা খুলে শুতে–
–কেন?
নয়নতারা বললে–আমিও আমার শাশুড়িকে সেই কথাই জিজ্ঞেস করেছিলুম, কেন? কেন আমি দরজা খুলে শোব? তা শাশুড়ি কোন কারণ বলেননি। যখন আরো একবার জিজ্ঞেস করেছিলুম, তখন তিনি বলেছিলেন–তর্ক কোর না বউমা, আমি যা বলছি তাই করো—
শাশুড়ি পেছন থেকে বলে উঠলো–মিছে কথা বোল না বউমা, তোমার ভালোর জন্যেই আমি তোমাকে দরজা খুলে শুতে বলেছিলুম। বলেছিলুম–তোমার একলা ঘরে শুতে ভয় করতে পারে, আমি সংসারের কাজকর্ম সেরে তোমার পাশে গিয়ে শোব।
নয়নতারা বললে–হয়ত আপনি তাই-ই বলেছিলেন মা, হয়ত আমিই শুনতে ভুল করেছিলুম, হয়ত আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করি, আপনি কি তারপর একদিনও আমার ঘরে আমার পাশে এসে শুয়েছিলেন? আমার নিজের মা হলে যা করত তা কি আপনি কোনও দিন করেছেন তারপর? না অন্য একজনকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন?
–বউমা!
চৌধুরী মশাই এবার চিৎকার করে উঠলেন। বললেন–মনে রেখো বউমা, তুমি তোমার শাশুড়ির নামে যা-তা দোষ দিচ্ছ! শাশুড়ি তোমার মায়ের মতন, তার নামে দোষ দিলে নরকেও কিন্তু তোমার স্থান হবে না।
নয়নতারা এবার শ্বশুরের দিকে মুখ তুলে চাইলে। বললে–নরকেই তো এখন আমার স্থান হয়েছে বাবা, নরকেই তো আমি এখন বাস করছি। এ-বাড়িকে নরক ছাড়া আর কী বলবো বলুন? নরক কি এর চেয়েও কষ্টের জায়গা মনে করেন? নরকের কি এর চেয়েও জঘন্য চেহারা? নরকের কথা কি শুধু মহাভারতেই লেখা আছে, এ পৃথিবীতেও কি নরক নেই? আর তাছাড়া এ-বাড়িই যদি নরক না হয়, তবে নরক আর কোথায়? কোথায় নরক খুঁজতে যাবো?
পেছন থেকে শাশুড়ি বলে উঠলো–তোমার বড় বাড় বেড়েছে বউমা। কিছু বলি না বলে তুমি একেবারে সাপের পাঁচ পা দেখেছ! হা-ঘরের বাড়ি থেকে মেয়ে এনেছিলুম বলেই আজ আমার এই দুর্দশা!
নয়নতারা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো–মা, দোহাই আপনার, আমাকে যা বলেন বলুন, আমার বাবাকে আপনি আর গালাগালি দেবেন না আমার সামনে। আমি যত অপরাধই করে থাকি, আমার বাবার কিন্তু কোনও দোষ নেই। তাকে আর দয়া করে এই নরককুণ্ডে টেনে আনবেন না, আপনার পায়ে পড়ছি–
তারক চক্রবর্তী মশাই অধৈর্য হয়ে উঠেছিলেন। বললেন–তারপর মা? তারপর তুমি ঘরে দরজা খুলে শুলে, না দরজা বন্ধ করে শুলে?
নয়নতারা বললে–আমি শাশুড়ির কথা অমান্য না করে দরজা খুলেই শুলুম, কিন্তু সেইদিনই রাত্তিরে আমার ভুল ভেঙে গেল।
কেদাররা তখন এসে গেছে। একেবারে উঠোনের মধ্যে ঢুকে পড়ে ভিড়ের ভেতর দিয়ে উঁকি মেরে দেখবার চেষ্টা করলে।
গোপালরাও ছিল পেছনে। তারাও একবার সদার বউকে চোখের দেখা দেখবে। সেই কতদিন আগে বিয়ের সময় সদার বউকে দেখে সবাই চক্ষু সার্থক করেছিল। এতদিন বাদে আবার তাকে দেখবার সুযোগ এসেছে। এমন রূপসী বউকে ছেড়ে সদা কেমন করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, এটা নিয়ে বহুদিন গবেষণা করেছে তারা। তাসের আড্ডায় বসে অনেক তর্ক-বিতর্কও হয়েছে। কিন্তু কোনও ফয়সালা হয়নি কোনদিন। সেই বউ কিনা আজ দ্রৌপদীর মত একেবারে কৌরবদের সভায় এসে হাজির হয়েছে! এটাও তো এক তাজ্জব কাণ্ড! তবে কি কোনও কেলেঙ্কারি কাজ করে ফেলেছে নাকি রে বউটা!
কেদার একেবারে সকলকে ঠেলে ঠুলে সামনে একটা জায়গা করে নিয়েছে। গোপালদেরও কাছে টেনে নিয়ে বললে–উই দ্যাখ–
কেদারও দেখলে। গোপালও দেখলে। সবাই-ই দেখলে। আহা, কী রূপ রে! দেখেছিস মাথার চুলগুলো কী রকম কোকড়ানো? চোখ দুটো খুব বিউটিফুল, না?
–চুপ কর না, কী বলছে শুনি ভালো করে?
সা’মশাই আবার জিজ্ঞেস করলেন–কী দেখলে মা? বললো, বলো, কী দেখলে বলো?
শাশুড়ি কিন্তু তখন তার আগের কথার জের ছাড়েনি। বলে উঠলো– তোমার বাবার নাম কেন তুলবো না? তিনি তো শুনেছি মাস্টার, তা মাস্টার হয়ে নিজের মেয়েকে এই শিক্ষা দেওয়া? এ কোন্ শিক্ষা শুনি? যে-মেয়ের লঘু-গুরু জ্ঞান নেই, যে-মেয়ে একঘর ভর্তি পুরুষমানুষের সামনে ঘোমটা খুলে খ্যামটা নাচতে পারে, তার বাবা কি আবার মাস্টার?
–মা! নয়নতারার বুকে যেন কথাগুলো শেলের মত বিঁধলো। বললে–আমি আপনার পায়ে ধরে বলছি মা আমাকে আপনি যা-তা বলুন, যত ইচ্ছে শাস্তি দিন সে আমার সহ্য হবে, কিন্তু আমার বাবার বিরুদ্ধে কিছু বলবেন না–আপনাদের পায়ে পড়ছি—
শাশুড়ি বললে–তা এতই যদি বাপের ওপরে তোমার টান তো কই, বাপ তো তোমার একটা খবরও নিলে না এতদিনে, একবার তো দেখতেও এল না যে, যাই মেয়েকে একবার দেখে আসি গিয়ে! আর মেয়ের খোঁজ না-হয় না নিলে কিন্তু জামাইকেও তো একবার দেখতে ইচ্ছে করে–মেয়ে-জামাই কেমন আছে, একটা চিঠি লিখেও তো সে-খবরটা মানুষ নেয়–
