কেদার বললে–উঃ, কী ফর্সা তোদের কী বলবো, যেন রূপ ঠিকরে বেরোচ্ছে—
গোপালেরই যেন বেশি আগ্রহ, বললে–কী বলছিল?
–আমি কি সব শুনেছি। ভিড়ের জ্বালায় কি ভেতরে ঢোকা যায় যে সব শুনবো?
গোপাল ষাট সকলের দিকে চেয়ে বললে–চল ভাই দেখে আসি–
তাস-টাস সব পড়ে রইলো। নিতাই হালদার তার দোকানের ভার তার চাকরটার হাতে ছেড়ে দিয়ে ছুটলো চৌধুরী বাড়ির দিকে। যেন দেরি হয়ে গেলে সব মজা খতম হয়ে যাবে।
ওদিকে বৈঠকখানার ভেতরে তখন নাটকের পঞ্চম অঙ্ক চলছে।
তারক চক্রবর্তী বলছেন–আপনি আপনার বউমাকে বলতে দিন চৌধুরী মশাই, উনি যা বলছেন তা আগে বলতে দিন, তারপরে আপনার যা বলবার তা বলবেন।
চৌধুরী মশাই বললেন–তা আপনারা কি ভাবেন বউমা মিছে কথাগুলো বলে যাবে আর আমি চুপ করে সব শুনে যাবো?
নয়নতারা বলে উঠলো–না, আমি একটাও মিছে কথা বলিনি। আমি নিজের চোখে যা দেখেছি তাই বললুম। আমি নিজের চোখে দেখেছি উনি কর্তাবাবুর গলা চেপে ধরেছেন…
–মিথ্যে কথা! সব আগাগোড়া মিথ্যে কথা!–চৌধুরী মশাই জোরে প্রতিবাদ করে উঠলেন।
ভেতর থেকে প্রীতি বলে উঠলো–বউমা, এত বড় আস্পর্ধা তোমার, শ্বশুরের নামে তুমি এত বড় মিছে কথা বলো! তোমার জিভ খসে যাবে বলছি, মাথার ওপর ভগবান আছে সে কথা ভুলে যেও না–
বেহারি পালের বউ বললে–তুমি চুপ করো না বউ, বউমা কী বলছে আগে বলতে দাও না–
–তুমি থামো মাসীমা, পরের বাড়ির কেচ্ছা শুনতে খুব ভালো লাগছে তোমাদের, না? কিন্তু আমিও জানি এ বউকে কেমন করে শায়েস্তা করতে হয়।
ভেতর থেকে নয়নতারাই এ কথা উত্তর দিলে–শায়েস্তা আমাকে যথেষ্ট করেছেন মা। আপনারা, শায়েস্তা করে করেই তো আপনারা আজকে আমাকে এতগুলো ভদ্রলোকের সামনে আমার মুখ খুলতে বাধ্য করলেন। আপনারা শায়েস্তা না করলে কি আমারই আজকে এত সাহস হতো? আজ যখন আমাকে শায়েস্তা করে করে আমাকে একেবারে মরীয়া করে তুলেছেন, তখন আর আপনাদের বারণ শুনবো কেন? আজকের কথা তো তখনই আপনাদের ভাবা উচিত ছিল। তখন কত কেঁদেছি কত আপনার পায়ে ধরেছি, তখন তো আমার একটা কথাও শোনেননি আপনারা?
তারপর একটু থেমে নয়নতারা আবার বলতে লাগলো–না, আমার একটা কথাও তখন কেউ শোনেনি। আমার চোখের সামনে একজন মানুষ খুন হয়ে গেলেও আমি মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারলুম না যে এ বাড়িতে আর একটা খুন হয়েছে! খুন এ বাড়িতে আগে আরও অনেক হয়েছে। সে-সব আমার শোনা কথা। আমার স্বামীই আমাকে তখন বলেছিলেন, আমি বিশ্বাস করিনি। কিন্তু টাকার জন্যে কি মানুষ এতই অন্ধ হয় যে নিজের বাবাকেও খুন করতে বাধে না? তাহলে এ টাকা কীসের জন্যে? সুখের জন্যে, না খুনের জন্যে? আর টাকাই যখন সমস্ত তাহলে আমাকে কেন এ বাড়ির বউ করে আনা হয়েছিল? আমার বাবা গরীব, আমার বিয়ের সময় বাবা তো একটা পয়সাও নগদ দিতে পারেননি। তাহলে কি রূপ? আমার রূপের জন্যে?
নয়নতারা নিজেই প্রশ্নটা করে নিজেই উত্তরের প্রতীক্ষায় সকলের দিকে চাইলে। বললে–আপনারা বলুন রূপ ছাড়া আর কী হতে পারে? রূপ ছাড়া আর কীসের জন্যে আমাকে এই নরক-পুরীতে বউ করে আনা হলো?
কেউ এ প্রশ্নের উত্তর দিলে না। উত্তর বোধহয় চায়ওনি নয়নতারা। এবার সে নিজেই তার নিজের প্রশ্নের উত্তর দিলে।
বললে–হ্যাঁ, রূপই আমার কাল হলো। এই রূপের জন্যেই আমি এ বাড়ির বউ হয়ে এলুম। আমার কাজ হলো আমার স্বামীকে আমার রূপ দেখিয়ে ভুলিয়ে বশ করা। ছলা কলা করে বশ করে তাকে দিয়ে এই চৌধুরী বাড়ির বংশরক্ষা করা। আর কিছু নয়, শুধুই বংশরক্ষা আর তারই প্রতিবাদে তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। আর আমি?
নয়নতারার সমস্ত শরীরে তখন দরদর করে ঘাম ঝরছে। বলতে বলতে তার যেন নেশা লেগে গিয়েছিল! জ্যৈষ্ঠ মাসের গুমোট গরম। শুধু নয়নতারাই নয়, যারা যারা ঘরের মধ্যে বসে ছিল, দাঁড়িয়ে ছিল, আশে-পাশে থেকে সব কিছু শুনছিল তাদেরও সকলেরই যেন তখন নেশা লেগে গিয়েছিল।
–আর আমি?
নয়নতারা চারদিকে চেয়ে দেখতে লাগলো। প্রশ্নটা সকলের মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে সে যেন সুবিচারের আশায় তাদের করুণার কাছে আত্মসমর্পণ করলো।
বললে–আর আমি? আমার তখন কী কর্তব্য আপনারাই বলুন? আপনারা সবাই গ্রামের বিচক্ষণ গণ্যমান্য ভদ্রলোক, আমি আপনাদের কাছেই প্রশ্ন করছি এমন অবস্থায় আমার কী কর্তব্য থাকতে পারে? আমার এই রূপ এই বয়স তখন কার কোন্ কাজে লাগবে? আমাকে দিয়ে তখন আমার শ্বশুর-শাশুড়ির কোন উদ্দেশ্য সার্থক হবে? বলুন? আমি সেই অবস্থায় তাদের সেই আশা কেমন করে মেটাবো, আপনারাই বলুন?
এবারেও কেউ এ প্রশ্নের কোনও উত্তর দিলে না।
–বলুন, আমি মেয়েমানুষ হয়ে তাঁদের এ আশা কেমন করে মেটাবো? হাজার সদিচ্ছে থাকলেও কি আমি তাদের সে ইচ্ছে মেটাতে পারি? মেয়েমানুষের দ্বারা কি তা সম্ভব?
তারপর আবার একটু থেমে বলতে লাগলো–না, পারি না। কেউই পারে না। আমার বিয়ের আগে আমার মা আমাকে অনেক করে শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছিল। আমি মার সব কথা বর্ণে বর্ণে মেনেছি। মা বলে দিয়েছিল শ্বশুরকে দেবতার মত ভক্তি করবে, তা করেছি। শাশুড়ির সেবা করতে বলেছিল মা, তা-ও করেছি। মা যা-যা বলেছিল, আমি তা সমস্তই মেনেছি। কিন্তু মা’র একটা কথা শুধু আমি রাখতে পানিনি, কিছুতেই মানতে পারিনি
