প্রাণকৃষ্ণ সা’মশাই একেবারে সামনের দিকে বসে ছিল।
বললেন–না না বউমা, তা করা উচিত নয়, তারা তোমার পিতৃ-মাতৃ তুল্য! তাদের নিন্দে তোমার মুখে শোভা পায় না–
নয়নতারা বলতে লাগলো–-হ্যাঁ, আপনারা ঠিকই বলছেন, তাঁদের নিন্দে মহাপাপ, আমি যদি আজ আপনাদের কাছে তাদের নামে কোনও অপবাদ দিই তাহলে পরলোকে গিয়ে নরকেও আমার স্থান হবে না। আমি সেজন্যে আপনাদের আজ ডেকে পাঠাইনি।
এতক্ষণে চৌধুরী মশাই-এর যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়লো।
পেছন দিকে ঘরের বাইরে চৌধুরী মশাই-এর গৃহিণী এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল। এবার চৌধুরী মশাই-এর দিকে চেয়ে বললে–ওগো, তুমি এখনো শুনছো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে? বউমাকে ভেতরে ডেকে নিয়ে আসতে পারছো না? বউমাকে ধরে টেনে নিয়ে এসো–
চৌধুরী মশাই কাছে এলেন। কথাটা ভালো করে শুনতে পাননি। জিজ্ঞেস করলেন–কী বলছো?
–বলছি, আমার বাড়ির বউকে নিয়ে সবাই যে মজা দেখতে এসেছে, এটা বুঝতে পারছো না?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা তুমি কি বলতে চাও আমি সবাইকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দোব?
-–হ্যাঁ, তাড়িয়ে দেবে। আমার বাড়ির ভেতরের ব্যাপারে ওঁরা কেন নাক গলাতে আসবেন? ওঁরা কে? ওরা আমাদের খাওয়ায় না আমাদের পরায়?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা ভদ্দরলোকদের কি সোজাসুজি তাড়িয়ে দেওয়া যায় নাকি?
গৃহিণী বললে–তা তুমি তাড়িয়ে দিতে না পারো, আমি ভেতরে গিয়ে ওদের চলে যেতে বলি।
–তুমি ওদের সামনে যাবে? কী বলছো তুমি?
–তা সামনে গেলে দোষ কী? আমাদের ইজ্জৎ যদি ওরা রাখতে না পারে তো ওদের ইজ্জৎ রাখতে আমাদের বয়ে গেছে
চৌধুরী মশাই বললেন–না না, এখন অমন করো না, শেষকালে গায়ে ঢি-ঢি পড়ে যাবে–
বলে চৌধুরী মশাই আবার ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন।
নয়নতারা তখনও ঘরের ভেতরে তেমনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তখনও এক মনে বলে চলেছে–আপনারা জানেন আমার স্বামী আমার সঙ্গে ঘর করেন নি। কিন্তু কেন করেন নি তা কি জানেন আপনারা? জানেন? যদি না জেনে থাকেন তো আমি আপনাদেরকে বলে দিচ্ছি। ঘর করেন নি কারণ তিনি ছিলেন সত্যিকারের পুরুষমানুষ! হ্যাঁ, সত্যিকারের পুরুষমানুষ!
সমাগত ভদ্রলোকদের মধ্যে তখন বেশ একটা অস্পষ্ট গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
–বিশ্বাস করুন, তার ওপর আমার কোনও অভিযোগ নেই। তিনি এ বাড়িতে জন্মে যা কিছু দেখেছেন তাতে তার এবংশের ওপরেই অশ্রদ্ধা হয়ে গিয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন এর থেকে মুক্তি পেতে গেলে তাকে এ বাড়ি ছাড়তে হবে। সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও ছাড়তে হবে–
বলতে বলতে নয়নতারার যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। একবার খানিকক্ষণের জন্যে দম নিয়ে সে আবার বলতে লাগল–তারপর আমার স্বামী একদিন এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন–আমাকে ত্যাগ করে গেলেন।
ততক্ষণে ওদিকে বারোয়ারীতলায় খবর চলে গেছে। কেদার দৌড়তে দৌড়তে নিতাই হালদারের দোকানে এসে হাজির।
সবাই তখন একমনে তাস নিয়ে মেতে ছিল।
কেদার তখনও হাঁফাচ্ছে! বললে, ওরে, মজার কাণ্ড হয়েছে, চৌধুরীবাড়ীতে মজার কাণ্ড শুরু হয়েছে–
–কী কাণ্ড?
–চৌধুরী বাড়ির বৈঠকখানায় সদার বউ নাকি সওয়াল-জবাব করছে–
–কীসের সওয়াল-জবাব?
ব্যাপারটা অনেকের কানেই তখনও যায়নি। জিনিসটা বুঝতে অনেকেরই তখনও সময় লাগলো। নিতাই বললে–তারক জ্যাঠা থেকে বেহারি পাল মশাই পর্যন্ত সবাই হাজির।
নিতাই হালদার শুনে বললে–-হ্যাঁ, তাই বোধ হয় আমার মা-ও গেছে সেখানে। বলছিল বটে চৌধুরী বাড়িতে যাবে–তা কী জন্যে গেছে রে?
–সদার বউ যে সবাইকে ডেকেছিল। তার নিজের কথা নাকি শোনাবে সকলকে!
সদার বউ! সদার বউকে বিয়ের সময় সবাই-ই দেখেছে। বউ দেখে সেদিন সদার ওপর সকলের হিংসেও হয়েছিল। কী ফর্সা সুন্দরী বউ সদার! তারপর সে বউকে আর কখনও দেখেনি তারা। তারপর শুধু শুনেছিল সদা বউ ছেড়ে বাড়ি ছেড়ে কোথায় পালিয়ে গিয়েছে।
–তুই জানলি কী করে?
কেদার বললে–আরে, আমি যে ওখান দিয়ে আসছিলুম, আসতে গিয়ে দেখি ওখানে ওদের সদরে খুব ভিড়। তা ভিড় দেখে আমিও ভেতরে ঢুকলুম। গিয়ে দেখি সবাই হাজির। সামনে বারবাড়ির উঠোনে লোকের ভিড়ে ভেতরে কিছু দেখতে পাইনে। শেষকালে উঁকি দিয়ে দেখি ভেতরে সবাই বসে। সব চেনা মুখ। তারক জ্যাঠা আর সা’মশাই একেবারে সামনের সারিতে। আর ঘরের মধ্যে সকলের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে সদার বউ–
সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো–সদার বউ?
কেদার বললে–হ্যাঁ রে, সদার বউ!
তবু যেন কারো বিশ্বাস হলো না। জিজ্ঞেস করলে–কী বলছিস তুই? সদার বউ? বৈঠকখানা ঘরে? একঘর বেটাছেলের সামনে? গুল মারবার আর জায়গা পাসনি? সদার বউ বৈঠকখানা ঘরে সকলের সামনে দাঁড়িয়ে?
কেদার বললে–মাইরি বলছি, মা-মঙ্গলচণ্ডীর দিব্যি, আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না– তোরা যদি বিশ্বাস না করিস তো এই আমি মা-মঙ্গলচণ্ডীর মাথা ছুঁয়ে দিব্যি করে আসছি, এই দেখ–
বলে বটগাছটার দিকে দৌড়ে চলে গেল। বটগাছের তলায় সিমেন্ট বাঁধানো বেদীর ওপর মঙ্গলচণ্ডীর একটা পাথরের মূর্তি ছিল। সেখানে গিয়ে মূর্তির মাথাটা ছুঁয়ে বললে–এই দেখ, মার মাথা ছুঁয়ে দিব্যি করছি, মাইরি বলছি সদার বউ বৈঠকখানায় দাঁড়িয়ে আছে দেখে এলুম–
এতক্ষণে যেন সকলের বিশ্বাস হলো। জিজ্ঞেস করলে–কী রকম দেখলি?
