হঠাৎ ভেতর থেকে একটা মেয়েলি গলায় চিৎকার উঠলো–বউমা, বউমা, তুমি ওদিকে কোথায় যাচ্ছো? কোথায় যাচ্ছো–বউমা–
কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটবার ঘটে গেছে। সবাই দেখলে চৌধুরী বাড়ির কুলবধূ হঠাৎ হাঁফাতে হাঁফাতে সশরীরে একেবারে বৈঠকখানার ভেতরে এসে হাজির।
সবাই-ই কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেল। চৌধুরী মশাই এতক্ষণ বেশ গম্ভীরভাবেই কথা বলছিলেন। কিন্তু এবার তিনিও তার বউমার কাণ্ড দেখে যেন হতবাক হয়ে গেলেন।
ভেতর থেকে শাশুড়ি তখনও ডাকছে–বউমা বউমা, চলে এসো, ভেতরে চলে এসো–
নয়নতারা তখনও ঘোমটায় মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে ছিল। সে শাশুড়ির কথায় কোনও কান না দিয়ে সকলকে উদ্দেশ করে বলে উঠলো–আপনারা কেউ যাবেন না, আমি এবাড়ির কুলবধূ, হ্যাঁ কুলবধূ, আমার অধিকার আছে আপনাদের ডাকবার। সেই অধিকারেই আমি আপনাদের ডেকে পাঠিয়েছি–
পেছন থেকে শাশুড়ি আবার ডাকলে—বউমা–
–আপনারা সবাই শুনুন, আমার পিতৃতুল্য শ্বশুরমশাই এখানেই আছেন, আপনারাও রয়েছে, আমি যা বলবো সকলের সামনে প্রকাশ্যেই বলবো। আমার শ্বশুরমশাই একটু আগেই আমাকে এ বাড়ির কুলবধূ বলেছেন আপনাদের কাছে। আমি সেই চৌধুরীবংশের কুলবধূ হিসেবেই আমার সব কথা আপনাদের কাছে পেশ করবো–
চৌধুরী মশাই বললেন–বউমা, তুমি ভেতর বাড়ি ছেড়ে বার-বাড়িতে এলে যে? যা বলবার ভেতরবাড়িতে গিয়ে তোমার শাশুড়িকে বললেই পারতে। এখানে এলে কেন তুমি?
নয়নতারা বললে–না, আমি এখানে সকলের সামনে বলবো–এতদিন আমার লজ্জার মর্যাদা যখন কেউ দেয়নি তখন আর কারোর কাছ থেকে লজ্জা-সম্ভ্রম-শালীনতার কথা আজ আর আমি শুনবো না।
–কিন্তু বউমা তুমি চৌধুরী বাড়ির বউ হয়ে বৈঠকখানা ঘরে আসবে তা বলে?
নয়নতারা শ্বশুরের মুখের ওপরেই বলে উঠলো–হ্যাঁ আসবো। এখানে না এলে আমার সব লজ্জার কথা সকলকে বলবো কী করে? আপনারা কি আমার লজ্জার মুখ রেখেছেন যে বৈঠকখানা ঘরে আসতে আমি লজ্জা পাবো?
চৌধুরী মশাই এবার উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন– তোমার তো বড় বাড় হয়েছে বউমা, তুমি আমার মুখের ওপর কথা বলো?
নয়নতারা বললে–আপনি গুরুজন, আমার সঙ্গে আপনি যদি গুরুজনের মতন ব্যবহার করতেন তা হলে নিশ্চয়ই আমিও আপনার মুখের ওপর কথা বলতে সাহস পেতুম না। কিন্তু আজকে আমি যা করেছি তা বাধ্য হয়েই করেছি। আপনারাই আমাকে সকলের সামনে দাঁড়িয়ে এমনি করে নিজের কথা কবুল করতে বাধ্য করেছেন—
শাশুড়ি পেছন থেকে আবার ডাকলে–বউমা, ভেতরে এসো বলছি–ভেতরে এসো–
বেহারি পালের বউ এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। বললে–বউমা কী বলছে বলতে দাও না বউ, তুমি কেন বাগড়া দিচ্ছ মাঝখান থেকে?
শাশুড়ি বললে–বাগড়া দেব না? বাড়ির বউ হয়ে সকলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? আর তোমরা সবাই মজা দেখবে বলতে চাও?
নিতাই হালদারের মা’র অনেক বয়স হয়েছে। গণ্ডগোলের মধ্যে তার বুকটা কেমন কাঁপছিল। সবাই মিলে তাকে এখানে ডেকে এনেছিল। বুড়ি আসতে চায়নি প্রথমে। সবাই যা বলছিল তা তার কানে যাচ্ছিল। এবার তার মুখ ফুটলো। বললে–বউমার কী হয়েছে গা? একঘর লোকের সামনে বৈঠকখানায় গেল কেন?
একদিকে বৈঠকখানার ভেতরে পুরুষের ভিড় আর এধারে ঘরের বাইরে বার বাড়ির বারান্দায় মেয়েরা দাঁড়িয়ে।
পরমেশ মৌলিক চণ্ডীমণ্ডপ থেকে বেরিয়ে চৌধুরী মশাইকে ডেকে দিয়েছিল। তারপর বাড়ির বউমার আবির্ভাবে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। এতদিন খোকাবাবুর বিয়ে হয়েছে, তবু একদিনের জন্যেও বউমার মুখ দেখেনি। সেই বউমাকে বৈঠকখানা ঘরে আসতে দেখে সে আরো ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
কৈলাস গোমস্তার তখন কাজ কমে গিয়েছিল। কর্তাবাবুর মারা যাওয়ার পর থেকেই বলতে গেলে তেমন আর কোনও কাজ ছিল না। সকাল বেলা আসতো, কিছুক্ষণ চণ্ডীমণ্ডপে বসে পরমেশ মৌলিকের খাতাগুলো দেখতো। তারপর দুপুরবেলা নিজের বাড়িতে খেতে চলে যেত। আবার খাওয়াদাওয়ার পর ফিরে এসে চৌধুরী মশাইয়ের কাছে বসে হিসেবের বাকি কাজগুলো করে দিত।
সেদিনও এসেছিল কৈলাস। কিন্তু হঠাৎ হৈ-চৈ গোলমাল শুনে একেবারে নিচেয় চলে এসেছে। পাশেই দীনু দাঁড়িয়েছিল। তার কাছে এসে কৈলাস জিজ্ঞেস করলে–এখেনে কী হচ্ছে রে দীনু–
নয়নতারা বৈঠকখানা ঘরের ভেতরে তখনও বলে চলেছে–আপনারা অনেকেই আমার বিয়ের সময় আমাকে দেখেছেন, সেদিনও আমাকে আপনারা দেখেছেন, আজ আবার এতদিন পরেও দেখছেন। বলতে পারেন আমার এ-চেহারা হয়েছে কেন? কেন আমি এত শুকিয়ে গিয়েছি?
প্রশ্নটা করে নয়নতারা খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আবার নিজেই বলতে লাগলো–মানুষ শুকিয়ে যায় মনের কষ্টে। আমার পাশের বাড়ির দিদিমা আমাকে অনেক দিন বলেছেন–বউমা, তোমার শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে কেন? তুমি একটু ভালো করে খাওয়া দাওয়া করতে পারো না? না খেলে তোমার শরীর যে টিকবে না। আমি এর উত্তরে কিছুই বলতে পারিনি দিদিমাকে। বলবো কী করে? আমার মনে যে কষ্ট তা বাইরের লোককে আমি বলবো কী করে? বাড়ির বউ হয়ে বাইরের লোকের কাছে তা কি বলা যায়? কারণ এ তো আমার শ্বশুরবাড়ি, এ তো আমার স্বামীর বাড়ি–। শ্বশুরবাড়ি, স্বামীর বাড়ি, সে তো মেয়েমানুষের কাছে তীর্থস্থান। সেখানকার নিন্দে করতে নেই, সেখানকার নিন্দে শুনতেও নেই। আমার মা এখানে আসবার আগে বার বার করে আমাকে বলে দিয়েছিল–শ্বশুর-শাশুড়িকে দেবতার মত ভক্তি করবে। তাদের মুখের ওপর কথা বোল না। আমার মা আর আজকে বেঁচে নেই। মা যদি আজ বেঁচে থাকতো তো মাকে বলতুম–মা তোমার কথা আমি রাখতে পারলুম না, আমাকে তুমি ক্ষমা কোর। আর তা ছাড়া বিয়ের পর তো নিজের বাবা-মাও পর হয়ে যায়, তখন শ্বশুর-শাশুড়িই বাবা-মা’র জায়গা নিয়ে নেন। তাদের মেয়ে হয়ে তাদের বাড়ির পুত্রবধূ হয়ে আমি কি তাদের নামে নিন্দে করতে পারি? নিন্দে করলেও তা কি কোনও শিক্ষিত মেয়ের পক্ষে করা উচিত? বলুন, আপনারা সকলেই বিচক্ষণ ব্যক্তি, আপনারাই বলুন, তা কি করা উচিত?
