হাজারি বললে–বাদী কে আবার, পুলিস।
–আর আমার অপরাধ?
হাজারি বললে–অপরাধ? অপরাধের কথা বলছেন? হরনারায়ণ চৌধুরীর নাম শুনেছেন?
–হ্যাঁ, তিনি তো আমার বাবা!
–আপনি তাকে খুন করেন নি?
–খুন? আমি? আমি আমার বাবাকে খুন করেছি?
–হ্যাঁ মশাই, হ্যাঁ, আর শুধু কি তাই? আপনি আট লাখ টাকা তহবিল তছরূপ করেছেন, তারও প্রমাণ আছে কোর্টের কাছে–
–আট লাখ টাকার তহবিল তছরূপ? বলছেন কী আপনি?
–আর নয়নতারা? নয়নতারাকে চেনেন?
–হ্যাঁ।
হাজারি বেলিফ বললে–তার সব্বোনাশ কে করেছে?
–তার সব্বোনাশ হয়েছে! কে সব্বোনাশ করেছে তার? কী সব্বোনাশ হয়েছে?
হাজারি বললে–আপনি ভালো মানুষ সেজে থাকলে কী হবে, এক গেলাস জল পর্যন্ত নিজে গড়িয়ে খেতে পারেন না, কিন্তু আপনার শয়তানি জানতে কোর্টের বাকি নেই মশাই। আজ পনেরো বছর ধরে আপনার নামে হুলিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আপনি এখানে সাধু সেজে লুকিয়ে বসে আছেন। কী কাণ্ড বলুন দিকিনি!
সদানন্দবাবু হতবাক হয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তার মুখ দিয়ে যেন আর কোনও কথা বেরোতে নেই।
বললেন–তাহলে আমি আসামী?
হাজারি বললে, আসামী না হলে আপনার নামে হুলিয়া বেরোল কেন? কই, আর কারো নামে তো হুলিয়া বেরোচ্ছে না! আপনি ভেবেছেন লুকিয়ে লুকিয়ে জল খাবেন আর কেউ তা জানতে পারবে না? তাহলে মশাই আর কোর্ট-কাছারির সৃষ্টি হয়েছে কেন? আর তা ছাড়া এখন হয়েছে কী! এখন তো সবে ‘মহড়া’–
–‘মহড়া’ মানে?
হাজারি বললে–কবির গান শোনেন নি? প্রথমে ‘মহড়া’ দিয়ে শুরু হবে, তারপরেই ‘চিতেন’। ওই ‘চিতেনে’ই তো যত মজা। তারপর ‘পর-চিতেন’, তাতে আরো মজা। তারপরে সকলের শেষে আছে ‘অন্তরা’। এখন নিচের ছোট কোর্টে শুরু হবে মামলা, তারপরে যখন সেই মামলা বড়-আদালতে যাবে তখনই তো মজা।
সদানন্দবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন–একটা কথা রাখবেন আমার?
–কী কথা!
–আমাকে দু-চারদিন সময় দেবেন?
–দু’চারদিন?
–হ্যাঁ, আমি দেখে আসবো একবার সুলতানপুরে গিয়ে যে সত্যিই আমি হরনারায়ণ চৌধুরীকে খুন করেছি কি না। দেখে আসবো আমি আট লাখ টাকা তছরূপ করেছি কি না। তারপর একবার যাবো নবাবগঞ্জে। আর নয়নতারার কথা বললেন? কিন্তু আমি তো তার কোনও সর্বনাশ করিনি। আমি তো বরাবর তার ভালো করবারই চেষ্টা করেছি। তাকেও আমি একবার দেখতে যাবো নৈহাটিতে।
–আর আমি? আমি কি এখানে বসে ভ্যারেণ্ডা ভাজবো নাকি? আপনি যদি মশাই পালিয়ে যান? আপনাকে আর আমার বিশ্বাস নেই–
সদানন্দবাবু বললেন–পালালে তো আগেই পালাতে পারতুম হাজারিবাবু। আর এই তো আমি সংসার ছেড়ে চৌবেড়িয়াতে পালিয়ে এসেছি, কিন্তু জীবনের যন্ত্রণা থেকে কি রেহাই পেয়েছি? এও তো এক জেলখানা। এই জীবনই তো আমার কাছে জেলখানা। এই জেলখানা থেকে না-হয় আর একটা জেলখানাতে গিয়ে ঢুকবো। জেলখানাকে আমি ভয় করি না। কিন্তু আমি জানতে চাই আমি কী অন্যায় করেছি। বুঝতে চাই আমি কী পাপ করেছি। দেখতে চাই আমি কার কী ক্ষতি করেছি, কার কী সর্বনাশ করেছি! নিজের চোখে ভালো করে পরীক্ষা করতে চাই আমার এত চেষ্টা, এত অধ্যবসায়, এত ত্যাগ কেন এমন করে মিথ্যে হয়ে গেল, কে আমার সব ইচ্ছেকে এমন করে পণ্ড করে দিলে? এর কারণটা কী?
–আর আমি?
–আপনিও চলুন আমার সঙ্গে। আজ পনেরো বছর আমার পেছনে নষ্ট করেছেন, এবার আর দুটো দিন নষ্ট করতে পারবেন না?
সঙ্গে নেবার মত কিছুই ছিল না। তবু টুকিটাকি কিছু নিতে হলো। সদানন্দবাবু বেরোলেন। পেছনে ভদ্রলোকও সঙ্গে চলতে লাগলো। বললে–দুগ্যা, দুগ্যা, এ কী এক ঝামেলায় ফেললেন মশাই আমাকে, চলুন চলুন, পা চালিয়ে চলুন–
গণেশ দেখতে পেয়ে দৌড়ে এল।
বললে–কোথায় যাচ্ছেন মাস্টার মশাই? যাচ্ছেন কোথায়?
সদানন্দবাবু বললেন–হরি মুহুরি মশাইকে বলে দিও গণেশ যে দু’দিনের জন্যে আমি একটু বাইরে যাচ্ছি–
–দু’দিন পরে আবার আসছেন তো?
সদানন্দবাবু বললেন–তা কি বলা যায় কিছু! সারা জীবন এত হিসেব করে চলেও যখন একদিন সব হিসেব বেহিসেব হয়ে গেল তখন ঠিক করে কিছুই আর বলতে ভরসা হয় না। তবে এলে তো তোমরা দেখতেই পাবে–
বলে গঙ্গার ঘাটের দিকে পা বাড়িয়ে দিলেন। চলতে চলতে তার মনে হতে লাগলো যেন আকাশ বাতাস অন্তরীক্ষ সব একসঙ্গে ঝড়ের মত প্রশ্ন করে চলেছে–এ কীসের রক্ত! দোতলা থেকে নরনারায়ণ চৌধুরী প্রশ্ন করছেন, প্রশ্ন করছেন হরনারায়ণ চৌধুরী। প্রশ্ন করছে দীনু, কৈলাস গোমস্তা, গৌরী পিসী, রজব আলী, সবাই। সদানন্দবাবুর অতীত বর্তমান ভবিষ্যও যেন একই প্রশ্ন করে চলেছে। একই প্রশ্ন করে চলেছে সদানন্দবাবুর শিক্ষা-দীক্ষা অস্তিত্ব। প্রশ্ন করে চলেছে সদানন্দবাবুর ইতিহাস-ভূগোল-সমাজ। প্রশ্ন করে চলেছে। সদানন্দবাবুর ঊধ্বর্তন পূর্বপুরুষ, প্রশ্ন করে চলেছে সদানন্দবাবুর অধস্তন উত্তরপুরুষ। একযোগে সকলের প্রশ্ন সদানন্দবাবুর মনে ঝড় বইয়ে দিচ্ছে–এ কীসের রক্ত!
আর তাদের সকলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে যেন নয়নতারাও সদানন্দবাবুকে জিজ্ঞেস করে চলেছে–এ কীসের রক্ত!
২.১ চিতেন
রেল-বাজার থেকে নবাবগঞ্জ পাঁচ ক্রোশ রাস্তা। পাঁচ ক্রোশ রাস্তা হলে কী হবে ওটুকু পথ লোকে হেঁটেই মেরে দেয়। এখন অবশ্য বাস হয়েছে। কুড়িটা নয়া দিলে একেবারে নবাবগঞ্জের আগের গ্রামে পৌঁছে যাবে। সেখান থেকে ওই দেড় মাইলটাক রাস্তা হেঁটে চলে যাও একেবারে সোজা নবাবগঞ্জে পৌঁছে যাবে।
