ক’দিন থেকেই বলেছিলেন–জামাইষষ্ঠীর তত্ত্বর ব্যবস্থাটা করতে হবে নিখিলেশ, ওটা যেন ভুলো না–
তা নিখিলেশ সে-সব ব্যবস্থা আগেই করে দিয়েছিল। তবু মাঝে-মাঝে বলতো–নয়নতারাকে একবার খবর দেব মাস্টার মশাই?
মাস্টার মশাই বলতেন–না না, সে সেখানে আরামে রয়েছে, তাকে আবার কেন বিব্রত করবে, এ অসুখ আমার দু’দিনেই ভালো হয়ে যাবে–তুমি বরং তত্ত্ব পাঠাবার ব্যবস্থাটা করে দাও। ওর মা নেই যখন তখন ও-দায়িত্বটাও আমার, বুঝলে না–
সেই ব্যবস্থাই হচ্ছিল। ইতিমধ্যে হঠাৎ একদিন কলকাতা থেকে নিখিলেশ শেষ ট্রেনে ফিরছে, হঠাৎ মাস্টার মশাই-এর বাড়ি থেকে লোক এসে ডাকাডাকি–
নিখিলেশ বিছানা থেকে উঠে বাইরে এসে অবাক।
–কে?
–আমি বিপিন দাদাবাবু, আপনাকে একবার ডাকতে এলুম।
–তোমার তো কালকে তত্ত্ব নিয়ে নবাবগঞ্জের যাবার কথা। ও-সব কেনাকাটা তো তৈরি।
বিপিন বললে–তা তো তৈরি কিন্তু মাস্টার মশাই-এর শরীরটা আবার খারাপ হয়েছে। তাই আপনাকে একবার খবর দিতে এলুম–
–এখন কেমন আছে?
–ভালো নয় দাদাবাবু। আমি খবর পেয়েই দৌড়ে গেলুম। গিয়ে দেখি ওই কাণ্ড। আপনাকে ছাড়া আর কাকে খবর দেব বলুন।
নিখিলেশ তাড়াতাড়ি জামাটা গায়ে গলিয়ে নিয়ে বাইরে এসে বললে–চলো চলো–
কিন্তু যার কাছে জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব পাঠাবার জন্যে কালীকান্ত ভট্টাচার্যের এত আগ্রহ, তার শ্বশুরবাড়িতে সেদিন তখন আর এক কাণ্ড শুরু হয়েছে। সকলের সঙ্গে প্রাণকৃষ্ণ সা’মশাই, বেহারি পাল, বেহারি পালের বউ, নিতাই হালদারের মা সবাই এসে হাজির।
পরমেশ মৌলিক ভেতরে খবর দিতে গেল। চৌধুরী মশাই খবর শুনে বললেন–কেন? ওরা এসেছে কেন? কী দরকার ওদের?
পরমেশ মৌলিক বললে–আজ্ঞে তা জানি নে, বলছেন একবার আপনার সঙ্গে দেখা করবেন
–সবাই মিলে দেখা করবে?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
গিন্নীর কানেও কথাটা গেল। বললে–তাই নাকি? বেহারি পালের বউও এসেছে? নিতাই হালদারের মা?
চৌধুরী মশাই বললেন–তাই তো শুনলুম। শুনলুম সা’মশাইও নাকি ওদের সঙ্গে আছে।
–কী বলতে চায় ওরা?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা তো কিছু বলেনি। সবাইকে বৈঠকখানা ঘরে নাকি বসিয়েছে–
চৌধুরী মশাই আর দাঁড়ালেন না। সোজা যেমন অবস্থায় ছিলেন তেমনি ভাবেই বেরিয়ে গেলেন। তখনও তিনি কল্পনা করতে পারেননি কতখানি বিস্ময় তার জন্যে অপেক্ষা করে আছে।
বেহারি পালের বউ হঠাৎ ভেতরবাড়িতে ঢুকে পড়েছে। পেছনে গ্রামের আরো কয়েকজন মহিলা।
–আমরা এলাম বউ।
প্রীতি বললে–কী ব্যাপার মাসিমা? হঠাৎ?
মাসিমা বললে–বউমা ডেকেছে আমাদের–
–আমার বউমা তোমাদের ডেকেছে?
–হ্যাঁ বউ, বলেছে গ্রামের সকলকে ডেকে নিয়ে আসতে–
প্রীতি যেন চমকে উঠলো। বললে–কই কোথায় গেল বউমা, দেখি জিজ্ঞেস করে কী জন্যে ডেকেছে
ওদিকে বার বাড়িতে চৌধুরী মশাই যখন গেলেন তখন দেখলেন নবাবগঞ্জের তাবৎ গণ্যমান্য লোক সবাই এসে সেখানে বসে পড়েছে। পরমেশ মৌলিক না-জেনে সবাইকে বৈঠকখানা ঘরের দরজা খুলে বসতে দিয়েছে।
–কী ব্যাপার, আপনারা হঠাৎ আমার বাড়িতে এ-সময়ে?
প্রাণকৃষ্ণ সা’মশাই অগ্রণী হয়ে বলে উঠলেন–আপনার বউমা সকলকে আসতে বলেছেন।
চৌধুরী মশাই তো হতবাক। খানিকক্ষণ পরে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন–আমার বউমা? আমার বউমা আপনাদের ডেকে পাঠালেন আর আমরা জানতে পারলুম না! আমি তো এর রহস্য কিছুই বুঝতে পারছি না—
প্রাণকৃষ্ণ সা’মশাই বললেন–হয়ত আপনি জানেন না চৌধুরী মশাই। সব কথা তো পুরুষ-মানুষেরা জানতে পারেন না, জানা সম্ভবও নয়। মেয়েদের ব্যাপার, মেয়েরাই জানে–
চৌধুরী মশাই-এর রাগ হয়ে গেল। বললেন–তা আপনারা তো হলেন পুরুষ, আপনাদের কাছে গিয়ে কি আমার বউমা আসতে বলেছেন? এ বাড়ির বউদের তো সে নিয়ম নেই? কী করে তিনি আপনাদের ডাকলেন? আপনাদের বাড়িতে গিয়ে? না চিঠি দিয়ে?
বেহারি পাল মশাই বললে–না চৌধুরী মশাই, আপনার বউমা আমার পরিবারকে ডেকে বলেছেন
চৌধুরী মশাই এতক্ষণে যেন বুঝলেন। বললেন–ও, এতক্ষণে বুঝলাম। তা তিনি আপনার পরিবারকে কী বলেছেন?
–বলেছেন সবাইকে নিয়ে আজ আপনার বাড়িতে আসতে—
চৌধুরী মশাই বললেন–কী উপলক্ষে?
–তা তিনি বলেননি। শুধু বলেছেন আসতে
চৌধুরী মশাই বললেন–আমার বউমা ছেলেমানুষ, তিনি কাকে কী বললেন আর আপনারও তাই শুনে নাচলেন? আপনাদের তো উচিত ছিল আমাকে জিজ্ঞেস করা। আমাকে জিজ্ঞেস করলেই আমি বলে দিতুম আপনাদের আসতে হবে কি আসতে হবে না–
এ কথায় সকলেই চুপ করে রইলেন।
–বলুন সা’মশাই, আপনিও বলুন পাল মশাই, হালদার মশাই, সরকার মশাই, আপনারাই বলুন। চুপ করে রইলেন কেন? আমি অন্যায় কিছু বলিনি, আপনারাই বুঝে দেখুন। আমার বাড়ির কুলবধূ হয়ে তিনি আমাকে খবর না দিয়ে আপনাদের খবর দিলেন, এটা কী রকম কথা? আপনারা কি বলতে চান তিনি আপনাদের সামনে এসে হাজির হবেন? এও কি আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?
সা’মশাই এ-কথার কোনও উত্তর খুঁজে না পেয়ে পাল মশাই-এর মুখের দিকে চাইলেন।
পাল মশাই বললে–আপনার বউমার হয়ত এমন কোনও কথা আছে যা সকলকে না শোনালে তার চলবে না! তাই হয়ত ডেকেছেন আমাদের
–খবরদার! একটু ভেবে-চিন্তে কথা বলবেন। আমার বংশের কুলবধূ, তার সম্বন্ধে অমন যা-তা কথা বলবেন না–
পাল মশাই বললে–তাহলে আপনার বউমাকে জিজ্ঞেস করে আসুন, তিনিই বলবেন তিনি কী জন্যে আমাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি যদি আমাদের চলে যেতে বলেন তো আমরা চলে যাবো–
