ট্রেন তখন ছেড়ে দিয়েছে। সদানন্দ বললে–তাহলে আমি আসি–
বলে চলন্ত ট্রেন থেকে নামতে যাচ্ছিল। সমরজিৎবাবু বললেন–আরে, করছো কী, করছো কী? কাটা পড়ে যাবে যে–
বলে সদানন্দর হাতটা চেপে ধরলেন। তারপর নিজের কাছে বসিয়ে বললেন–বোস এখানে, পরের স্টেশনে নেমে যেও–
ট্রেন তখন সত্যিই জোরে চলতে আরম্ভ করেছে। সদানন্দ আর নামতে পারলে না।
সমরজিৎবাবু বললেন–তোমার তো টিকিট নেই, স্টেশনে যদি টিকিট চায় তো টিকিট দেখাবে কী করে? সঙ্গে টাকা আছে?
সদানন্দ বললে—না–
–টাকা নেই? আমার কাছে টাকা আছে, আমি তোমাকে টাকা দিচ্ছি, এই নাও বলে একটা দশ টাকার নোট পকেট থেকে বার করে সদানন্দর দিকে এগিয়ে দিলেন।
সদানন্দ বললে–দশ টাকা নিয়ে কী করবো? এক টাকার বেশি তো লাগবে না। আর আপনার ঠিকানাটা আমায় দিন, যদি কম লাগে তো বাকি পয়সা আপনাকে ফেরত দিয়ে দেব–
সমরজিৎবাবু অবাক হয়ে গেলেন কথাটা শুনে। এমন কথা তো কেউ বলে না আজকাল! এ কী ধরনের ছেলে!
বললেন–তোমার নাম কী? থাকো কোথায়?
একে একে অনেক প্রশ্ন করলেন সমরজিৎবাবু। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলেন। সদানন্দও কিছু কিছু উত্তর দিলে। কিন্তু সমরজিৎবাবুর কেমন যেন সন্দেহ হলো। তিনি বুঝতে পারলেন ছেলেটা আসল খবরটা বলতে চাইছে না। এইটুকু শুধু বুঝলেন যে সৎবংশের ছেলে, কিন্তু কোনও কারণে বাড়িতে আর ফিরে যেতে চায় না।
শেষকালে দশ টাকার একটা নোট সদানন্দের হাতে গুঁজে দিতে চাইলেন। বললেন—টাকাটা তুমি রাখোই না, পরে না-হয় আমার ঠিকানায় বাকিটা মনিঅর্ডার করে পাঠিয়ে দিও, আর তুমি আমার যা উপকার করেছ তার জন্যেও তো কিছু তোমার বখশিশ পাওয়া উচিত। ওগুলো তো আমার খোওয়া যেতোই–তুমি না থাকলে কি আমি ও-সব ফেরত পেতুম মনে করেছ?
তারপর যখন পরের স্টেশন এল, সদানন্দের নামবার কথা। তখন হঠাৎ সমরজিৎবাবু বললেন–তুমি আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে যাবে?
–আপনার বাড়িতে?
–হ্যাঁ, আমার বাড়িতেও যেতে পারো–কলকাতায় বউবাজারে আমার নিজের মস্ত বাড়ি আছে। আমার বাড়িতে অনেক ঘর, তোমার কোনও কষ্ট হবে না।
সদানন্দ বললে–আমাকে সেখানে একটা কাজ যোগাড় করে দিতে পারবেন?
–কাজ করবার তোমার দরকার কী?
সদানন্দ বললে–কিন্তু আপনার বাড়িতে আমি কী করবো? আমি আপনার ঘাড়ে বসে থাকবো কেন? আপনি যদি কোনও কাজ যোগাড় করে দিতে পারেন তো আমি যেতে পারি–
তা সেই কথাই রইল। সমরজিৎবাবুর সঙ্গে সেই কলকাতাতেই সেদিন চলে এসেছিল সদানন্দ। তারপর থেকেই সে রয়ে গেছে এখানে। মাঝে-মাঝে সমরজিৎবাবুর কাছে গিয়ে বলে–কই, আমাকে কিছু কাজ দিলেন না তো আপনি?
সমরজিৎবাবু বলেন–দেব, দেব, হুট করে অমনি বললেই কি আর কাজ দেওয়া যায়? আমার ছেলেকে বলে তোমাকে একটা কাজ করে দেব। তুমি অত ব্যস্ত হচ্ছে কেন? কাজ দিলেই তো হলো?
–কবে আপনার ছেলেকে বলবেন?
সমরজিৎবাবু বললেন– ছেলে আসুক আগে, তবে তো বলবো–সে তো সব সময় কলকাতায় থাকে না, বাইরে বাইরে ডিউটি পড়ে তার। যখন হেডকোয়ার্টারে আসবে–তখনই বলবো–
সেই ছেলে এতদিন পরে হেড-কোয়ার্টারে এসেছে। এইবার বোধহয় সমরজিৎবাবু তাকে সদানন্দের কথা বলবেন। সদানন্দ নিজের ঘরের মধ্যে চলে গেল। কিন্তু মন থেকে ভাবনাটা গেল না। সমরজিৎবাবু কী করে বুঝবেন যে কারো বাড়িতে অন্নদাস হওয়ার অগৌরব কত! তার জন্যে সমরজিৎবাবুর অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সবই হচ্ছে, তবু প্রতিদানে সে কোনও কাজ করছে না। এর যন্ত্রণা সদানন্দ কী করে ব্যাখ্যা করবে!
খানিক পরে হঠাৎ আবার একটা গাড়ির শব্দ হলো রাস্তায়। বাড়ির ভেতরে চাকর ঠাকুরের আবার সেই ব্যস্ততা। অনেক পায়ের শব্দের আনাগোনা। তারপর মনে হলো যেন গাড়িটা ছেড়ে দেওয়ার শব্দ হলো।
সদানন্দ বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো।
মহেশের যেন তখন আর তত ব্যস্ততা নেই। বললে–দাদাবাবু চলে গেল–
–চলে গেল মানে?
মহেশ বললে–দাদাবাবু খেয়ে-দেয়ে অফিসে চলে গেল–
–আবার কখন আসবে?
মহেশ বললে–তার কি কিছু ঠিক আছে? হয়ত অনেক দিন আর আসবেই না। পুলিসের চাকরির তো এই নিয়ম। দাদাবাবুর আসা যাওয়ার কোনও ঠিকঠাক নেই। দাদাবাবুর বিয়ে হবার আগে থেকেই এই রকম চলছে, ওই জন্যেই তো বউদির মনেও সুখ নেই
কথাগুলো বলে মহেশ মুখটা ভারি করে নিজের কাজে চলে গেল।
.
বউবাজারে সমরজিৎবাবুর বাড়িতে নিজের ঘরখানায় সদানন্দ যখন একলা শুয়ে থাকতো তখন নানা চিন্তা এসে মাথায় ভিড় করতো। কোথায় সেই নবাবগঞ্জ, সেই নবাবগঞ্জের বারোয়ারিতলা, কালীগঞ্জ, প্রকাশমামা, সেই কর্তাবাবু, সেই চৌধুরীমশাই, সেই নয়নতারা। নয়নতারার শেষ কথাটা তখনও তার কানে বাজতো–আমি তোমার স্ত্রী হয়েছি বলে কি তোমার প্রায়শ্চিত্তের ভাগ আমাকেও নিতে হবে?
কথাগুলো মনে পড়লেই সদানন্দ অন্যমনস্ক হয়ে যাবার চেষ্টা করতো। সব কিছু ভুলে যাবার চেষ্টা করতো। নবাবগঞ্জের জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আনবার চেষ্টা করতো। মনে করতে চেষ্টা করতো যে সে-সদানন্দ মারা গেছে, সে-সদানন্দ আত্মহত্যা করেছে, সে সদানন্দ খুন হয়ে গেছে। তারপর আস্তে আস্তে কখন সে আবার এক সময়ে ঘুমিয়েও পড়তো তাও খেয়াল থাকতো না।
কালীকান্ত ভট্টাচার্য সেই নয়নতারার মা’র মৃত্যুর পর থেকেই ভেঙে পড়েছিলেন। একদিন কাজ করেন তো পরের দিন শুয়ে থাকেন।
