সদানন্দ বললে––কেন অশান্তি করছেন কাকীমা, আমি তো বলছি আমি উটকো লোক, আমি চলে যাচ্ছি
কাকীমা এবার সদানন্দের দিকে চেয়ে বললে–তুমি থামো তো, তোমার যাওয়া হবে না। তোমাকে যেতে দিলে তবে তো তুমি যাবে!
সমরজিৎবাবু বললেন–বাঃ, তুমি তো বেশ, এদিকে ওকে বিশ্বাসও করবে না, আবার ওকে চলে যেতেও দেবে না, এতো বেশ মজা
কাকীমা হয়তো কাকাবাবুর কথায় রেগে গিয়ে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই সদানন্দ বললে–-ঠিক আছে, কাকীমা, আপনি থামুন, আমি যাব না, আমি থাকবো
এমন সময় বাইরে থেকে কে যেন দৌড়তে দৌড়তে এসে বললে–মা, দাদাবাবু এসেছে–
–খোকা এসেছে? খোকা এসেছে?
সমরজিৎবাবুও যেন একটু উৎসুক হয়ে উঠলেন। বললেন–কে? খোকা? এতদিন পরে খোকা এলো?
কাকীমা আর দাঁড়ালো না। সোজা ভেতরে চলে গেল।
কে-ই বা খোকা আর সেই খোকা এলে এত হৈ-চৈই বা কেন তা সদানন্দ সেদিন জানতো না। খোকা আসার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন সমরজিৎবাবু আর কাকীমার মুখের চেহারা আমূল বদলে গেল।
সদানন্দ ঘর ছেড়ে চলে আসতে যাচ্ছিল। বললে–আমি আসি কাকাবাবু–
সমরজিৎবাবু বললেন–আসি মানে? তুমি চলে যাচ্ছো? এই যে এখখুনি তুমি বললে তুমি যাবে না! আবার চলে যাচ্ছো যে? যদি যেতে হয় তো তোমার কাকীমাকে বলে যাবে। আমি কিছু জানি না–
সদানন্দ আর কথা না বলে একতলায় চলে এল। এসে নিজের ঘরখানার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলে সারা বাড়িময় যেন হঠাৎ সোরগোল পড়ে গেছে। চাকর-ঠাকুর-ঝি সবাই যেন সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে দাদাবাবুর আসবার খবর পেয়ে! কে দাদাবাবু? এতদিনের মধ্যে একদিনও তো সে-দাদাবাবুর নাম শোনেনি!
মহেশ শশব্যস্ত হয়ে ওপরের দিকে যাচ্ছিল। সদানন্দ তাকেই ডাকলে। বললে–কে এসেছে গো!
মহেশের তখন কথা বলবার সময় নেই। বললে–দাদাবাবু—
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–দাদাবাবু কে?
কিন্তু সে-কথার জবাব দেবার মত সময় মহেশের ছিল না। তার আগেই সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল।
সদানন্দ সেখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে মনে হলো যেন একটা গাড়ির আওয়াজ হলো। গাড়িটা বোধহয় দাদাবাবুকে নামিয়ে দিয়েই আবার চলে গেল। তারপর সেখানে দাঁড়িয়েই সদানন্দ দেখলে একটা সাদা কোট-প্যান্ট পরা লোক ভারি জুতো পরে দুম-দুম্ শব্দ করতে করতে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। তারপর ভেতরে ঢুকে সোজা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেল। পেছন থেকে মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল না। কিন্তু মনে হলো দাদাবাবুর বয়েস খুব কম নয়। পেছন থেকে দেখে যতটুকু বোঝা যায় তাতে মনে হলো– ত্রিশ কি বত্রিশ বছর। কিন্তু বেশ ভালো স্বাস্থ্য।
মহেশ আবার তরতর করে নিচেয় নেমে এসে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল।
সদানন্দ তখনও দাঁড়িয়ে ছিল।
মহেশ এসে বললে–আপনি তখন কী বলছিলেন আমাকে?
সদানন্দ বললে–বলছিলুম কে এলেন?
–দাদাবাবু।
–দাদাবাবু? দাদাবাবু কে?
মহেশ বললে–আজ্ঞে বাবুর ছেলে। এই একই ছেলে বাবুর! এই এখনি বাড়িতে এলেন কিনা, তাই বউদিদিকে খবর দিতে গিয়েছিলুম।
তবু কথাটা কেমন দুর্বোধ্য লাগল সদানন্দের কাছে। এবাড়ির ছেলেই যদি হয় তো তাহলে এত হৈ-চৈ কেন? বাড়ীর ছেলে বাড়িতে আসবে তার জন্যে সবাই এত সন্ত্রস্তই বা কেন?
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–দাদাবাবু কোত্থেকে এল?
লোকটা গলা নিচু করে বললে–দাদাবাবু তো রোজ বাড়িতে থাকে না, অনেক দিন পর পর বাড়িতে আসে, তাই–
এরপর আর কিছু কথা জিজ্ঞেস করা ভালো হবে কি না বুঝতে পারলে না সদানন্দ। এবাড়িতে সে নতুন এসেছে। বলতে গেলে সমরজিৎবাবু তাকে জোর করেই ধরে নিয়ে এসেছেন। তার পক্ষে এত কৌতূহল থাকা ভালো না।
কিন্তু মহেশ নিজে থেকেই আবার বলে ফেলল–দাদাবাবু পুলিসে চাকরি করে কি না, তাই বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতে হয় দাদাবাবুকে। এই তো দাদাবাবু এখন এল, এখুনি খাওয়া-দাওয়া করে আবার আপিসে চলে যাবেন–
এতক্ষণে বুঝতে পারলে সদানন্দ। মহেশও চলে গেল। সদানন্দ তার নিজের ঘরখানার মধ্যে এসে ঢুকলো। কোথায় কী করতে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, আর কোথায় বৌবাজারের কোন্ এক সংসারের ভেতরে একেবারে অন্দরমহলে এসে ঢুকে পড়ল। অচেনা অনাত্মীয় লোক। কোনও দিন কোনও সূত্রে এদের সঙ্গে তার পরিচয়ও ছিল না। অথচ এই কদিনের মধ্যেই একেবারে একাকার হয়ে গেল সে কেমন করে?
আসলে এর পেছনে যা কিছু কৃতিত্ব সবই সমরজিৎবাবুর। সেই রাণাঘাটের অন্ধকার প্লাটফরমের ওপর সেদিন যদি সদানন্দ না থাকতো তো সমরজিৎবাবুর অনেক টাকার লোকসান হয়ে যেত। ট্রেন তখন প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। সদানন্দ ব্যাগটা নিয়ে এক লাফে ট্রেনে উঠেই বললে–এই ব্যাগটা কি আপনার? আপনি ফেলে যাচ্ছিলেন–
সমরজিৎবাবু তখন গাড়িতে উঠে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে ছিলেন। অত রাত্রে অন্ধকারে তিনি যে ট্রেনে উঠতে পেরেছিলেন তাই-ই যথেষ্ট। হঠাৎ অচেনা একটা গলার শব্দে ছেলেটার দিকে চাইতেই দেখলেন সে তার ব্যাগটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই অবাক হয়ে গেছেন। এই ব্যাগটার মধ্যেই তো তার টাকা কড়ি যা-কিছু সর্বস্ব।
তাড়াতাড়ি বললেন–হ্যাঁ, এটা তো আমারই ব্যাগ কোথায় পেলে তুমি?
–প্লাটফরমের ওপর পড়ে ছিল, অন্ধকারে বোধহয় আপনার সঙ্গের লোক দেখতে পায়নি
সমরজিৎবাবু বললেন–এই দেখ মহেশের কাণ্ড–মহেশ তো থার্ড ক্লাসের কামরায় রয়েছে-ভাগ্যিস তুমি ছিলে তাই বাবা, নইলে তো আমার সব্বোনাশ হয়ে যেত–
