কিন্তু পৃথিবী তার দাবী কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিয়ে তবে তো মানুষকে মুক্তি দেয়। তাই বোধহয় সমরজিৎবাবুরও টাকার প্রয়োজন তখনও ফুরিয়ে যায়নি।
গৃহিণী জিজ্ঞেস করলেন–তা কোথায় পেলে তুমি ওকে?
সমরজিৎবাবু বললেন–রানাঘাট স্টেশনে–
গৃহিণী বললেন–ইস্টিশানে একজন অচেনা লোককে দেখলে আর তাকে বাড়িতে এনে তুললে? ওকে দিয়ে কী কাজ হবে তোমার?
সমরজিৎবাবু বললেন–এই দেখ তোমার বুদ্ধি, আমি কি ওকে কাজ করাবার জন্যে বাড়িতে এনে তুলেছি? আমার যারা আছে তারা সবাই-ই কি কাজের লোক? তুমি যে টবে গণ্ডা গণ্ডা ফুলগাছ পুঁতেছ, ফুলগাছ দিয়ে কি তোমার কিছু কাজ হয়?
গৃহিণী বললে–ওমা, ফুলগাছ পুঁতেছি তো ফুলের জন্যে–
–তা সদানন্দকেও একটা ফুল বলে মনে করো। ফুলগাছে যেমন জল দিতে হয়, ওকেও না হয় তেমনি ভাত খেতে দিলে। সংসারে মানুষের জঙ্গলের মধ্যে ওই সদানন্দর মত এক-একজন মানুষ ফুল হয়েই জন্মায়–এইটে ভুলে যেও না–
গৃহিণী কর্তার কথায় খুশি হলো না। সমরজিৎবাবু বললেন–কথাটা তোমার পছন্দ হলো না তো? তা তো হবেই না!
গৃহিণী বললে–তা অচেনা-অজানা মানুষকে বাড়িতে এনে তুললে রাগ হবে না? সেবার তো তুমি পুরী থেকে ওমনি একটা ছেলেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিলে, শেষকালে সে তোমার ঘড়ি চুরি করে পালালো না? শেষকালে এও যদি সেই রকম হয়?
সমরজিৎবাবু বললেন–হলে হবে! না হয় কিছু চুরি করেই পালাবে! ঘড়ি চুরি হওয়াতে কি আমি রাস্তার ভিখিরি হয়ে গেছি? কী জানো, অবিশ্বাস করে লাভ করার চেয়ে বিশ্বাস করে ঠকাও ভালো
–তাহলে তুমি ঠকো–বলে গৃহিণী রাগ করে চলেই যাচ্ছিল।
সমরজিৎবাবু বললেন–চলে যেও না, চলে যেও না, দাঁড়াও–
বলে এক কাজ করলেন। বলে নিজের চেয়ার থেকে উঠলেন। তারপর দেরাজ থেকে পাঁচশো টাকা বার করলেন। পাঁচটা একশো টাকার নোট।
গৃহিণী কিছুই বুঝতে পারলে না। বললে–টাকা বার করছে কীসের জন্যে?
-–দেখ না, কী করি!
বলে সদানন্দ ডেকে পাঠালেন। সদানন্দ আসতেই সমরজিৎবাবু বললেন–একটা কাজ করতে পারবে বাবা, এই পাঁচশো টাকা পোস্টাফিসে গিয়ে মনিঅর্ডার করে আসতে পারবে?
সদানন্দ বললে–দিন, কিন্তু কোন ঠিকানায়, কার নামে মনি-অর্ডার করবো?
সমরজিৎবাবু একটা কাগজে নাম-ঠিকানা লিখে দিলেন। বললেন–এই নাও, রাঁচি রামকৃষ্ণ মিশনের নামে–
বলে কাগজটা এগিয়ে দিলেন সদানন্দর দিকে। সদানন্দ কাগজটা আর নোটগুলো নিয়ে বেরিয়ে চলে গেল।
গৃহিণী বললে–এতগুলো টাকা তুমি দিলে বিশ্বাস করে? যদি পালিয়ে যায়?
সমরজিৎবাবু বললেন–চাঁদা তো আমায় দিতেই হয়। দান-খয়রাতের টাকা যদি খোওয়া যায় তো যাবে। বিশ্বাস করে না হয় ঠকলুমই–
কিন্তু না, আধঘন্টার মধ্যেই আবার সদানন্দ ফিরে এল। হাতে মনি-অর্ডারের রসিদ।
–করেছ?
সদানন্দ বললে–করেছি, কিন্তু আমি আর এখানে থাকবো না কাকাবাবু, আমার থাকতে আর ভালো লাগছে না।
–কেন?
–আমার মনে হচ্ছে আপনি মনিঅর্ডার করবার জন্যে আমাকে পাঠাননি, আপনি আমাকে পরীক্ষা করবার জন্যে পাঠিয়েছিলেন। আমাকে আপনি অবিশ্বাস করেছেন–বলুন আপনি আমায় অবিশ্বাস করেছে কি না?
সমরজিৎবাবু হাসলেন। হেসে গৃহিণীর দিকে চেয়ে বললেন–কী উত্তর দেবে দাও, সদানন্দর কথার জবাব দাও–
গৃহিণী বললে–আমি কী জবাব দেব?
সমরজিৎবাবু বললেন–অবিশ্বাস তোমায় আমি করিনি সদানন্দ। অবিশ্বাস করেছে তোমার কাকীমা। তোমার কাকীমার জন্যেই আমি তোমায় পরীক্ষা করলুম—
সদানন্দ বললে–কিন্তু আপনি তো জানেন আমি নিজে থেকে আপনার এখানে আসতে চাইনি-আপনিই আমাকে জোর করে আপনার বাড়িতে নিয়ে এলেন।
তা সত্যি! রাণাঘাট স্টেশনে তখন শেষ রাত। রাধার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সদানন্দ সোজা স্টেশনেই এসেছিল। ভেবেছিল আর যেখানেই সে যাক নিজের বাড়িতে সে আর যাবে না।
–না বাবা, এর পরে আর তোমাকে যেতে দিতে পারব না। অবিশ্বাস আমিই করি আর তোমার কাকীমাই করুক, ও একই কথা, অপরাধ আমাদের দুজনেরই–
কাকীমা বললে–তুমি কিছু মনে কোর না বাবা, এর আগে অনেকবার উনি ঠকেছেন তো, তাই আমার কেমন সন্দেহ হয়েছিল। তোমার কাকাবাবুর কিছু দোষ নেই, দোষ আমারই। সব মানুষ কি সমান হয় বাবা? তুমিই বলো না সমান হয়?
সমরজিৎবাবু বললেন–আমি তোমাকে বললুম সদানন্দ তেমন ছেলে নয়, তবু তুমি কেন সন্দেহ করলে? তোমার জন্যেই তো এই কাণ্ড হলো! এখন তুমি সামলাও।
গৃহিণী রেগে গেল। বললে–তুমি কেবল আমার দোষই দেখলে। তোমাকে তো সংসার করতে হয় না। সংসার যে করে সে বোঝে! এই এতগুলো লোক কী খাবে, কী পরবে, সে কি তুমি কোনও দিন ভেবেছ? সব তো সেই আমাকে ভাবতে হবে।
সমরজিৎবাবু বললেন–ওই দেখ তুমি আবার ঝগড়া আরম্ভ করলে? আমি ঝগড়ার কথাটা কী বলেছি তোমাকে? তুমিই তো কেবল বলতে জানা-নেই শোনা-নেই কাকে বাড়ির মধ্যে তুললে
সদানন্দ দেখলে তাকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীতে কথাকাটাকাটি হতে হতে প্রায় ঝগড়ার উপক্রম হতে চলেছে। সদানন্দ কথার মধ্যেখানেই বাধা দিলে।
বললে–কেন আপনারা আমার মত একটা সামান্য লোককে নিয়ে অশান্তির সৃষ্টি করছেন, তার চেয়ে আমি বরং চলে যাই–
সমরজিৎবাবু বললেন–হ্যাঁ, তুমি চলেই যাও বরং, তোমাকে আনা আমারই দোষ হয়েছিল–
কাকীমা বললে–না, তুমি যেতে পারবে না, তোমার কাকাবাবু বরাবর আমার নামে দোষ দিতে পারলে আর ছাড়বেন না। কেন, আমি কী অন্যায়টা করেছি শুনি? সেবার তোমার ঘড়ি চুরি যায়নি? সেবার কী আমি উটকো লোক ঘরে এনে তুলেছিলুম?
