বেহারি পালের বউ বললে–-দেখা করতে না-ই বা দিলে, আমরা যদি জোর করে ঢুকে পড়ি তো কে কী করবে? আমাদের তাড়িয়ে দেবে? তা বলে একটা দুধের মেয়েকে বাড়িতে পুরে কষ্ট দেবে, আর আমরা গাঁয়ের পাঁচজন থাকতে কিছু মুখ ফুটে বলতেও পারবো না? আমরা কি মরে গেছি, না ওদের ভয়ে মুখ বুঁজে বসে থাকবো?
সকলেরই ওই এক কথা। সকলেই বললে–ওদের বাড়ির মধ্যে যদি ওরা বউকে মারে ধরে তো আমরা পর হয়ে কী করতে পারি?
বেহারি পাল বললে–আমরা সব করতে পারি। দরকার হলে চৌধুরী মশাই-এর বেয়াইকে কেষ্টনগরে খবর দিতে পারি, চাই কি পুলিসেও ডাইরি করতে পারি–
কথাটা অনেকের মনঃপুত হলো, আবার অনেকের মনঃপুত হলোও না। চৌধুরী মশাই গ্রামের একজন গণ্যমান্য লোক। অনেকেই আবার নানাভাবে চৌধুরী মশাই-এর কাছে উপকৃত। অনেকের টিকিও আবার চৌধুরী মশাই-এর কাছে বাঁধা। পালে-পার্বণে চৌধুরী মশাই-এর বাড়িতে বলতে গেলে সবাই-ই পাত পেড়ে খেয়ে এসেছে। শুধু চৌধুরী মশাইই নয়, কর্তাবাবু যখন সক্ষম মানুষ ছিলেন তখন সবাই তাঁকে ভয়-ভক্তি-সমীহ করে এসেছে। এই তো সেদিন কর্তাবাবুর শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন খেয়ে এলুম, তার কয়েক মাস আগে ছেলের বিয়েতেও খুব ঘটা হয়েছিল। তখনও কত আদর-আপ্যায়ন পেয়েছি। এখন চৌধুরী মশাই এর অবস্থা একটু কমজোরী হয়েছে বলে কি একেবারে মুখের ওপর কথা বলবো? মাথার ওপর তো এখনও চন্দ্র-সূর্য উঠছে। এখনও তো কলি উল্টে যায়নি।
কিন্তু এত কাণ্ডের পেছনে যে কী হয়েছিল তা কেউ প্রত্যক্ষভাবে জানে না।
বেহারি পালের বউ বললে–তবে বলি শোন খুড়ীমা, আসলে কী হয়েছিল…
এ যেন যাত্রা-থিয়েটার কবিগানের মত ঘটনা। সেদিনও অনেক রাত। সন্ধ্যে থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। চৌধুরী বাড়িটা নিঝুম হয়ে আছে তখন। কর্তাবাবু মারা যাবার পর থেকেই কৈলাস সামন্তের কাজ কমে গেছে। সে সকাল-সকাল বাড়ি চলে যায় তখন। দীনুরও তেমন কোনও জরুরী কাজ থাকে না। এক চণ্ডীমণ্ডপের সেরেস্তার পরমেশ মৌলিক অনেকক্ষণ খেরো খাতাখানা নিয়ে ধুনি জ্বালিয়ে বসে থাকে। যখন চৌধুরী মশাই উঠতে বলে তখন সে উঠে হারিকেনটা জ্বালিয়ে নিয়ে বাড়ি চলে যায়। তা তখন সে-ও বাড়ি চলে গেছে।
তা ইতিহাসের এও এক অমোঘ পরিহাস বই কি। একজন হর্ষনাথ নিচেয় নামে, তার জায়গায় আর একজন নরনারায়ণ চৌধুরী ওঠে। প্রাণলক্ষ্মী বোধহয় এমনিই রহস্যময়ী। তাই বোধহয় সে একজনের ঘরে সপ্রতিষ্ঠ থাকতে চায় না। একজনের ঐশ্বর্য যখন দম্ভের আকাশ ছুঁয়ে ঈশ্বরকে নাগালের মধ্যে পেতে চায় তখন সে বুঝি অন্য আর একজন লোকের উদার আশ্রয় খোঁজে। ঐশ্বর্য যখন অত্যাচারের প্রতীক হয়ে ওঠে তখনই বোধহয় প্রাণলক্ষ্মীর কণ্ঠরোধ হয়ে আসে। সে তখন নিঃশব্দে সকলের অগোচরে কণ্টক আশ্রয়ের অবরোধ ত্যাগ করে বাইরে এসে দাঁড়ায়। বলে–আমাকে বাঁচতে দাও দিদিমা, আমাকে বাঁচাও–
কিন্তু কে শোনে কার কথা! তার আর্তনাদ হয়ত কারোর কানেই পৌঁছোয় না কোনভাবে। নবাবগঞ্জের লোক তখন নেশার ঘোরে ঘুমোবে, না প্রাণলক্ষ্মীর যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ শুনবে! কার এত সময় আছে? এমনি করে হয়ত মাসের পর মাস প্রাণলক্ষ্মীর কান্না গুমরে গুমরে একদিন মুখর হয়ে ওঠে, তখন সে গ্রাম ছেড়ে, দেশ ছেড়ে, নগর জনপদ মহাদেশ ছেড়ে আর এক মহাদেশ, আর এক যুগের আশ্রয়ের জন্য প্রতিক্ষা করে। তখন সেই মহাদেশ সেই যুগ আবার কিছুদিনের জন্যে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে প্রাণলক্ষ্মীর আশীর্বাদে। আবার ধন-ধান্যে ঐশ্বর্যে শান্তিতে ভরে ওঠে সে যুগ। আবার ধন্য হয়ে ওঠে মানুষের সমাজ। ইতিহাসের এমনি নিয়ম। এই নিয়মের এতদিন পৃথিবী চলে আসছে, হয়ত কোটি-কোটি বছর এই নিয়মেই চলবে।
সেদিন কী সৌভাগ্য হয়েছিল কে জানে। শুধু একজন তার কান্না শুনতে পেলে।
দিদিমা সেদিন অঘোরে ঘুমিয়ে ছিল। ডাকাডাকিতে জেগে উঠলো। বললে–কে? কে?
বড় আতঙ্কে শিউরে উঠেছিল নয়নতারা। দরজা খুলতেও তার ভয় হচ্ছিল সেদিন। মনে হলো কে যেন তার দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। বউমা, বউমা–
বাইরে থেকে শাশুড়ির গলা। বউমা, খিল দিয়ে শুয়েছ কেন? তোমায় বলেছি না দরজা খুলে শোবে! তবু দরজা বন্ধ করেছ? খোল দরজা, দরজা খোল—
না, নয়নতারা তখন তার বুকখানাকে পাথর করে ফেলেছে। কিছুতেই সে দরজা খুলবে না। যে যতই বলুক তাকে কেউ অপবিত্র করতে পারবে না। দম্ভের লেহন সে প্রাণ দিয়ে প্রতিরোধ করবে।
তারপর আবার শাশুড়ির সেই চিৎকার কথা শুনছো না যে, খোল দরজা–
নয়নতারা ঘরের মধ্যে পাথরের মত নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দেখা যাক, কে কী করে। দরজা যদি ভেঙে ফেলতে চায় তো ভেঙে ফেলুক। দরজা ভেঙে যদি ভেতরে ওরা ঢুকতে চায় তো ঢুকুক। তোমাদের পীড়নে আমি নতজানু হবো না, আত্মসমর্পণ করবো না কারোর কোনও প্ররোচনায়।
–খুলবে না তো দরজা? ঠিক আছে, দেখি তুমি কত বড় শয়তান মেয়ে হয়েছো… বৃষ্টি তখন আরো জোরে জোরে পড়ছে। পাশের বাগানের গাছগুলোর পাতায় তখন আরো আলোড়ন চলেছে। পৃথিবী বোধহয় রসাতলে তলিয়ে যাবে তখন। নয়নতারা তখন স্থাণুর মত ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের পদধ্বনি শুনছে।
কে জানে কেন, তারপর আর দরজায় ধাক্কা পড়লো না। নয়নতারা জানলাটা খুলে বাইরে চেয়ে দেখলে। তার মনের ভেতরের সমস্ত আলোড়ন যেন বাইরের প্রকৃতিতে প্রতিরূপ গ্রহণ করেছে। বাইরে যা ঘটছে সে যেন আর শুধু বাইরেরই নয়, তার ভেতরেরও। ঝড়ে-বৃষ্টিতে ভেতর আর বাহির তার কাছে যেন একাকার হয়ে গেছে।
