নয়নতারা জানালা বন্ধ করে দিয়ে আবার তার বিছানায় এসে বসলো। কে তাকে বাঁচাবে! কে তাকে আশ্রয় দেবে! যে ছিল আশ্রয়দাতা সে নিজের আদর্শ নিয়েই নিরুদ্দেশ। সত্যিই তো, তোমার কাছে যদি আমার নিরাপত্তার চেয়ে তোমার নিজের আদর্শই বড় হয় তো হোক, আমি আর কোনও দিন তোমার কাছে আশ্রয়ের জন্যে ভিক্ষে চাইতে যাবো না। তোমার ভীরুতাই তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। একদিন আমিও যেদিন আমার আশ্রয় খুঁজে নিতে আরো দূরে সরে যাবো সেদিন তোমার ভীরুতাই আমাকে সাহস যোগাবে। আমাকে পথ দেখাবে।
অনেকক্ষণ পরে মনে হলো বৃষ্টিটা যেন একটু থেমেছে। জানালার বাইরে তখন আর বাতাসের দাপাদাপি নেই। নয়নতারা কান পেতে শুনতে চাইলে কারো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে কি না। কেউ কোথাও জেগে আছে কি না।
তারপর যখন নিশ্চিন্ত হলো তখন আবার দরজা খুললো সে। খুব আস্তেই দরজা খুলতে হলো যাতে কেউ না জেগে ওঠে। তারপরে সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলে না কী করবে সে। তবে কি এখান থেকে সে চলে যাবে? যেমন করে তার আশ্রয়দাতা একদিন তাকে ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল, তেমনি করে এবাড়ি ত্যাগ করবে।
দিদিমার মনে হলো যেন স্বপ্ন দেখছে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে।
ফকির আবার ডাকলে—মা–মা—
এবার দিদিমা উঠে পড়লো। বললে–কে রে? ফকির?
ফকির বেহারি পালের মুহুরি। বাড়ির পেছনের বাগানের দিকে গোলাঘরের পাশে থাকে।
ফকির বললে–মা, ও-বাড়ির বউমা তোমাকে ডাকছেন।
বেহারি পালের বউ বললে–ও বাড়ির বউমা? আমাকে ডাকছে?
ফকির বললে–হ্যাঁ, মা–
–তা তুই কী করে জানলি? তোকে কি ডাকলে?
–হ্যাঁ, কুয়োতলা থেকে আমাকে ডেকে বললেন তোমাকে ডেকে দিতে—
বেহারি পালের বউ আর দাঁড়ালো না। একেবারে সোজা বাগানের শেষ প্রান্তে চলে এল। একটু আগেই ঝড়-বৃষ্টি হয়ে জল-কাদা-পেছল হয়ে গেছে চারদিকে। শুকনো পাতা পড়ে জায়গাটা ভরে গেছে। তারই ওপর দিয়ে ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে একেবারে গোলাঘরের পেছনে বেড়ার কাছে এসে দাঁড়ালো। বেড়ার ঠিক ওপারেই চৌধুরীদের কুয়োতলা। সেই কুয়োতলার চারপাশে ভ্যারেণ্ডাগাছের ঝোপ্। রাত্তির বেলা সেখানে সাপ-খোপ থাকতে পারে। কিন্তু সে-সব ভয় করতে গেলে নয়নতারার চলবে না।
দিদিমা বেড়ার ওপারে এসেই নয়নতারাকে দেখে জিজ্ঞেস করলে কী বউমা। তুমি ডেকেছ আমাকে?
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ দিদিমা, আমাকে এরা মোটে বেরোতে দেয় না। পাছে আপনার কাছে চলে যাই। চারদিকে দরজায় চাবি দিয়ে রেখে দেয়–এক দণ্ডের জন্যে বেরোতে দেয় না–
–আমিও বউমা ক’দিন থেকে তোমার কথা খুব ভাবছি। তোমার শাশুড়ি তো আমাকেও ঢুকতে দেয় না তোমাদের বাড়িতে, পাছে তোমার সঙ্গে আমি কথা বলতে যাই। সেদিন তোমার চেঁচামেচি শুনে আমি তোমাদের ভেতর বাড়ির দরজা পর্যন্ত গিয়েছিলুম, কিন্তু তোমার শাশুড়ি আমাকে যাচ্ছেতাই করে অনেক কথা শুনিয়ে দিলে। তারপর থেকে আর চেষ্টা করিনি– তা আজ যে বড় তুমি আমাকে ডাকলে? তোমার শাশুড়ি জানতে পারবে না?
নয়নতারা বললে–আমি আর কাউকে ভয় করি না দিদিমা। আমি এতদিন অনেক সহ্য করেছি, আর সহ্য করবো না ঠিক করেছি
দিদিমা বললে–কিন্তু আমি তো বুঝতে পারি না তোমার দোষটা কী? তোমার ওপর কেন তোমার শাশুড়ির এত রাগ
নয়নতারা বললে–দোষ আমার অনেক দিদিমা, সত্যি আমার অনেক দোষ। আজও আমার ঘরে একজন ঢুকতে চেয়েছিল–আমি তাই একদিন রোজ রাত্তিরে দরজায় খিল দিয়ে শুচ্ছি। আজকে আমার শাশুড়ি শাসিয়ে গেছে, বলেছে এবার দেখে নেবে আমি কত বড় শয়তান মেয়ে–
–সে কী? এই কথা তোমাকে বলেছে? কেন, তুমি কী করেছিলে?
–ওই যে আমি ঘরের দরজায় খিল দিয়ে শুয়েছি!
–তা দরজায় খিল দিয়ে শুয়ে অপরাধটা কী করেছ তুমি? তুমি একলা ঘরে শুয়ে থাকো, দরজায় খিল তো দেবেই। খিল দেবে না?
নয়নতারা বললে–না, শাশুড়ি চায় আমি রোজ দরজার খিল খুলে রেখে দিয়ে শুই
–সে কী বউমা? কেন? এ তো ভালো কথা নয়!
নয়নতারা বললে–সেই কথা বলতেই তো আমি আজকে কুয়োতলায় এসেছি।
–কিন্তু তুমি দরজার খিল বন্ধ করে শুলে তোমার শাশুড়ির কীসের লোকসান?
নয়নতারা বললে–লোকসান আছে দিদিমা।
–কী লোকসান? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
নয়নতারা বললে–বলছি তো, সেই কথা বলতেই এত রাত্তিরে আপনাকে ডেকেছি দিদিমা। আপনি শুনুন মন দিয়ে। আমি যা বলব তা লুকিয়ে ছাপিয়ে বলব না, আমি আমার শ্বশুর-শাশুড়ির মুখের সামনেই বলবো, গ্রামের দশজনকে শুনিয়ে বলবো।
দিদিমা বললে–তার মানে কী বউমা? তুমি কী বলছো আমি তো তার কিছুই বুঝতে পারছি না–তোমার শ্বশুর-শাশুড়ির মুখের সামনে কী বলবে?
নয়নতারা বললে–কী বলবো তা তখনই আপনারা সবাই শুনতে পাবেন–কিন্তু আপনার আসা চাই দিদিমা, দাদামশাইকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন আপনি। আর গাঁয়ের যাঁরা যাঁরা মাতব্বর লোক তাঁদের সবাইকে নিয়ে আসবেন আমাদের বাড়িতে–
দিদিমা আরো অবাক হয়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্যে তার মুখে কোনও কথা বেরোল না।
নয়নতারা বললে–আসবেন তো দিদিমা ঠিক? যদি না আসেন তো আমার এ মুখ আর আপনারা দেখতে পাবেন না। জানবেন আমি নির্ঘাত আত্মঘাতী হবো, এই আপনাকে আজ আমি বলে রাখছি–
দিদিমা বললে–ছিঃ বউমা, ওকথা মুখে আনতে নেই। তুমি বুদ্ধিমতি মেয়ে, ওকথা কি বলতে আছে কখনও?
