তা সেই দিন থেকেই সামন্ত একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেল। দু’হাত ঘুষ নিতে লাগলো, দশ মুখে মিথ্যে কথা বলতে লাগলো। সামন্তর আসামীদের মধ্যে সৎ লোকের জেল হয়ে গেল, অসৎ লোকেরা ছাড়া পেয়ে যেতে লাগলো। লালবাজারের হেড় কোয়ার্টারে সামন্তর তখন দোর্দণ্ড প্রতাপ! যে মূলচাঁদকে ধরতে গিয়ে তার এত বদনাম, সেই মূলচাঁদের কাছ থেকেই সে তখন দু’হাতে মুঠো-মুঠো ঘুষ নিতে লাগলো। গভর্ণমেন্ট মরে মরুক, আগে তো নিজের পেট। আগে নিজের পেট ভরলে তখন গভর্নমেন্টের ভালোর কথা ভাবা যাবে। তখন কেউ কোনও আর্জি নিয়ে এলেই সামন্ত বলতো–মাল-টাল কিছু এনেছ?
মাল মানে টাকা! টাকা না ছাড়লে সামন্ত কথাই বলবে না। আগে কড়ি ফেল তখন তেল মেখো।
এই হলো বড়বাবু। সেই সামন্তই পুলিস লাইনে থেকে-থেকে শেষকালে একদিন রাঘব বোয়াল হয়ে উঠলো। মদের গন্ধ একবার নাকে গেলেই হলো, টাকার ছোঁয়াচ একবার পেলেই হলো, মেয়েমানুষের নাম একবার শুনলেই হলো। তখন আর সামন্তকে পায় কে।
সেই একদিন কোথায় কোন্ কেসের ভার নিয়ে কোথায় গিয়েছিল, সেখান থেকে যখন ফিরলো তখন সঙ্গে একটা মেয়ে মেয়েমানুষ।
সামন্ত জিজ্ঞেস করলে–তোমার নামটা যেন কী?
মেয়েটে বললে–বাতাসী।
–বাতাসী? শুধু বাতাসী? আর কিছু নেই?
মেয়েটা বললে–বাতাসীবালা দাসী।
ও দাসী-ফাসীর দরকার নেই। সেখান থেকে মেয়েটাকে সোজা একেবারে নিয়ে এসে তুললো মাসির বাড়িতে।
সামন্ত গিয়ে জিজ্ঞেস করলে–তোমার এখানে খালি ঘর আছে? এ থাকবে–
মাসি তো হাতে চাঁদ পেয়ে গেল–ওমা, কী বলছেন বড়বাবু! দরকার হলে আপনার জন্যে আমি ঘর খালি করে দেব
তারপর বাতাসীর দিকে চেয়ে বললে–কী নাম তোমার মেয়ে?
বাতাসী বললে–বাতাসী—
মাসি বললে–বাঃ, খাসা নাম। যেমন খাসা দেখতে, তেমনি খাসা নাম।
এ হলো সেই দিককার কথা। তখনই সদানন্দকে ভুল করে এই বাতাসীর ঘরেই বসিয়ে দিয়েছিল প্রকাশমামা। আসলে তখন প্রকাশমামাও জানতো না যে ঘরটার ভেতরে আবার একটা মেয়ে এসে জুড়ে বসেছে!
সেই থেকেই বড়বাবু একটা আলাদা বাড়ির সন্ধান করছিল। শেষকালে যখন এ বাড়িটা পেলে তখন এখানেই তুলে নিয়ে এল বাতাসীকে। কিন্তু বাতাসী বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও মাসি বাতাসীকে ছাড়লে না। বড়বাবুর মেয়েমানুষকে খাতির করা মানে বড়বাবুকেই খাতির করা।
সেদিনও মাসি এল। বললে–কীরে, বড়বাবুকে ছবিটা দিয়েছিস?
বাতাসী বললে–দিয়েছি মাসি, এখন বড়বাবুর তো মেজাজ, কাজের ভিড়ে যদি ছবিখানা হারিয়ে যায় তো গেল।
–তোকে তো বলেছি তুই টাকা পাবি। বড়লোকের এক মাত্তোর ছেলে, বাড়ি থেকে পালিয়েছে, খুঁজে দিতে পারলে তুইও টাকা পাবি, আমারও দুপয়সা হবে। তুই একটু বাছা মনে করিয়ে দিস আজ। তার মামা এসে আমার বাড়িতে বসে ধরনা দিচ্ছে। বুঝলি, আজকে বড়বাবু এলে খোঁচাবি।
.
কিন্তু যে-সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিন নয়নতারার কাহিনী গড়ে উঠেছিল তা নিয়ে যে একদিন এমন করে আগুন জ্বলে উঠবে তা সেদিন কেউ কল্পনা করে উঠতে পারেনি। নবাবগঞ্জের মানুষ কেউই এত কাণ্ডের জন্যে তৈরি ছিল না। গ্রামের লোক সবাই যার যার আপন-সংসার নিয়েই বিব্রত থাকে। তার মধ্যে সবটুকুই কাটে তাস-পাশায়। এরই মধ্যে কারও বউএর ছেলে হয়, কারো আবার ছেলে হয়ে মরেও যায়। ছেলে হলে শাঁখ বাজে, অন্নপ্রাশনে দু’চারজন নেমন্তন্নও পায়। আবার সেই ছেলেই মারা গেলে গলা ফাটিয়ে ছেলের মা দু’চারদিন কাঁদে, তারপর আবার নদীর ঘাটে গিয়ে পাড়ার বউ ঝিদের সঙ্গে ঝগড়াও করে।
তা এবার অন্য রকম।
প্রাণকৃষ্ণ সা’মশাই সেদিনও এসেছিল বেহারি পালের সঙ্গে কথা বলতে।
বেহারি পাল বললে–সা’মশাই, একটা কাজ আপনাকে করতে হবে, বড় জরুরী কাজ—
সা’মশাই বললে–কী কাজ?
বেহারি পাল বললে–পরশুদিন সকাল বেলার দিকে আপনাকে একবার নবাবগঞ্জে আসতে হবে–
–কেন?
–হ্যাঁ, আমরা দল বেঁধে সবাই সেদিন চৌধুরী মশাই-এর বাড়ি যাবো। আপনাকেও সঙ্গে থাকতে হবে–
প্রাণকৃষ্ণ সা’মশাই অবাক। বললে–কেন? দল বেঁধে চৌধুরি মশাই-এর বাড়ি যাবেন কেন আপনারা?
বেহারি পাল বললে–সে এক কাণ্ড হয়েছে–
–কী কাণ্ড বলুনই না?
প্রাণকৃষ্ণ সা’মশাই-এর কৌতূহল আরো বেড়ে গেল।
বেহারি পাল বললে–তবে একটা কথা আপনাকে চুপি চুপি বলি, কথাটা এখন কাউকেই বলবেন না। চৌধুরী মশাই-এর ছেলের বউ আমাদের সবাইকে যেতে বলেছে–
–চোধুরী মশাই-এর ছেলের বউ? এই তো সেদিন শাশুড়ি-বউতে খুব ঝগড়া হচ্ছিল শুনতে পাচ্ছিলুম।
বেহারি পাল বললে–হ্যাঁ, সেই ব্যাপারেই ওদের বউ আমার গিন্নীকে ডেকে যেতে বলেছে। বলেছে সবাইকে নিয়ে আসবেন–
তা শুধু প্রাণকৃষ্ণ সা’মশাই-ই নয়, আরো অনেককেই বলা হলো। সে এক সর্বনেশে কাণ্ড ঘটে গেল। বেহারি পালের গিন্নী নিজে গিয়ে সবাইকে বলে এল।
নিতাই হালদারের বিধবা মা বললে–কী, ব্যাপারটা কী বউ-মা, গিয়ে কী হবে?
বেহারি পালের বউ বললে–তুমি গিয়েই দেখো না কী হবে। আমি আগের থেকে কী করে বলবো কী হবে? ওদের বেটার-বউ আমাদের যেতে বলেছে তাই তোমাকে বলছি–
–কখন যাবো?
–কাল। কাল সকাল বেলাই তোমরা সবাই আমাদের বাড়ি যেও, তখন আমরা একসঙ্গে সব যাবো।
–তবে যে সেদিন বলেছিলে কাউকে ঢুকতে দেয় না ভেতরে? বউ-এর সঙ্গে নাকি কাউকে কথা বলতে দেয় না, দেখা করতেও দেয় না–
