এক-একদিন সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছোয় আর যখন রাত কাবার হয়ে যায় তখন উঠে পড়ে। কোথা থেকে একটা জিপগাড়ি এসে বাড়ির তলায় রাস্তায় দাঁড়ায় আর বড়বাবু তখন ঘুম থেকে উঠে গিয়ে সেই গাড়িতে গিয়ে বসে। আর গাড়িটা বড়বাবুকে নিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায়। বাতাসী আর দেখতে পায় না বড়বাবুকে।
তখনকার মত বাতাসীর ছুটি। তারপর যখন আবার বিকেল হবে তখন থেকে শরীরটাকে ঘষে মেজে তৈরি করে নিতে হবে। সেজে-গুজে অপেক্ষা করতে হবে বড়বাবুর পথ চেয়ে।
কিন্তু বড়বাবুর অফিসে সেই সময়ই যত কাজ। মোটা বুট-জুতোর ভারি শব্দে তখন লালবাজার থর থর করে কাঁপবে! লালবাজারটা বড়বাবুর অফিস, কিন্তু সারা কলকাতাটা জুড়ে বড়বাবুর দাপট। বড়বাবুর দাপটে রাইটার্স বিল্ডিং থেকে পুলিস কমিশনার পর্যন্ত সবাই নিশ্চিন্ত। যখনই কোথাও গোলমাল হবে তখন কে সামলাবে–? সামন্ত!
এক-একটা তেমন ঘোরালো কেস হলেই ভার পড়ে সামন্তর ওপর। একটা মস্ত ডাকাতির কেস থেকেই নাম-ডাক হলো সুশীল সামন্তর। ডাকাতিটা স্বদেশীদের করা। কিন্তু কিছুতেই তার কিনারা করা যায় না। হোম-মিনিস্ট্রি থেকে কড়া অর্ডার এলো। এক একজনকে ভার দিয়ে পাঠানো হলো। সবাই ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলো।
শেষকালে ফাইলটা এলো সামন্তর কাছে।
সামন্ত শুধু কালপ্রিটদের ধরে ফেললে তাই-ই নয়, সব ছেলেগুলোর লম্বা জেলও হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সামন্তর প্রমোশন। সামন্তর পার্সোন্যাল ফাইল গেল ডেপুটি কমিশনারের কাছে। ডেপুটি কমিশনার ডেকে পাঠালে সামন্তকে।
বললে–সামন্ত, তোমার জন্যে আমি প্রমোশনের রেকমেণ্ড করে দিলুম–
শেষকালে ফাইলটা গেল কমিশনারের কাছে। সেখানে এক কথায় চোখ বুজেই সই হয়ে গেল।
কিন্তু প্রমোশন হওয়াই কাল হলো সুশীল সামন্তর। প্রমোশন না হলে হয়ত এ-সব কিছুই হতো না।
একদিন হাতেনাতে একটা কেস ধরে ফেললে সুশীল সামন্ত। বড়বাজারের মস্ত বড় একজন মার্চেন্ট। ইলেকট্রিক কারেন্ট চুরি করে ফ্যাক্টরির জন্যে। লক্ষ লক্ষ টাকা গভর্নমেন্টকে ফাঁকি দিয়ে কারবার চালাচ্ছে বহু বছর ধরে। খবরটা পেয়েই লুকিয়ে লুকিয়ে ইনভেস্টিগেশন শুরু করে দিলে। তারপর একদিন সোজা গিয়ে হাজির হলো ফ্যাক্টরিতে। ফ্যাক্টরি তখন চলছে। সামন্ত গিয়েই সোজা হাজির পাওয়ার-হাউসে।
পাওয়ার-হাউসের চিফ-ইনজিনীয়ার খবর দিলে মূলচাঁদ আগরওয়ালাকে। মূলচাঁদ আগরওয়ালা হুঁশিয়ার ব্যবসায়ী মানুষ। সহজে দমে না। এ খবরেও দমলো না। সঙ্গে সঙ্গে চিফ-ইনজিনীয়ারকে বললে–তুমি গিয়ে দারোগা সাহেবকে খাতির করে বসাও, আমি আসছি–
মূলচাঁদ আগরওয়ালা বহুদিনের কারবারী। অনেক মিনিস্টার চরিয়েছে, অনেক লাটসাহেবকেও চরিয়েছে। সে জানে কী করে ক্ষমতাওয়ালাদের চরাতে হয়। গাড়িটা নিয়ে বেরোল। সোজা চলে গেল কমিশনারের অফিসে। মূলচাঁদ আগরওয়ালার মুখ চেনে সবাই। কমিশনারের ঘরে বসে অনেকক্ষণ কী সব কথা হলো কেউ জানে না।
যখন কমিশনারের ঘর থেকে মূলচাঁদ বেরোল তখন একটা ঘণ্টা কেটে গেছে। সবাই দেখলে মূলচাঁদ ঘরে ঢোকবার সময়েও যেমন হাসিমুখ, বেরোবার সময়েও তেমনি। সোজা বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো গাড়িতে উঠে নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি চলে গেল।
কিন্তু এ-ঘটনার তিন দিন পরে হঠাৎ ডেপুটি সামন্তকে ডেকে পাঠালো।
বললে–সামন্ত, তুমি কী করেছিলে হে?
সুশীল সামন্ত তো অবাক। বললে–কেন স্যার?
ডেপুটি বললে–তোমার ডিমোশন হয়ে গেল যে হঠাৎ–
সামন্ত বললে–কেন স্যার? কী করেছি আমি?
–কী জানি। হঠাৎ বড় সাহেব আমাকে ডেকে তোমার ফাইলটা চেয়ে পাঠালো, তারপর এই দেখ কী রিমার্ক লিখে দিয়েছে। আনফিট ফর কনফারমেশন। কনফার্ম হবার যোগ্য নয়।
সুশীল সামন্ত অবাক হয়ে গেল দেখে। এই সেদিন অত বড় একটা কেস ধরে ফেললে। গভর্নমেন্টের বছরে লাখ লাখ টাকার লোকসান বেঁচে গেল। কোথায় তার স্পেশ্যাল রিওয়ার্ড হবার কথা, তা নয় একেবারে ডিমোশান!
ডেপুটি বললে–তোমার হাতে কী কেস আছে এখন বল তো!
সামন্ত বললে–এখন তো স্যার মূলচাঁদের ফ্ৰড কেসটা হাতে রয়েছে। প্রায় এক কোটি টাকার ফ্ৰড কেস–
ডেপুটি মূলচাঁদের নাম শুনে একেবারে চমকে উঠেছে। বললে–করেছ কী তুমি, মুলচাঁদকে ধরেছ? মূলচাঁদ আগরওয়ালা? সর্বনাশ করেছ! একেবারে ভীমরুলের চাকে ঘা দিয়েছ?
সামন্ত বুঝতে পারলে না। বললে–কেন স্যার? মূলচাঁদ কত বড় জোচ্চোর তাকে ধরে কী খারাপটা করেছি? আমার তো রিওয়ার্ড পাওয়ার কথা
–আরে দূর, মূলচাঁদ কে জানো? ও যে বড় সাহেবের পেয়ারের পার্টি। মাসে যে পনেরো-কুড়ি হাজার টাকার ভেট দেয় বড় সাহেবকে। তারপর আছে মিনিস্টারেরা। তুমি আর ধরবার লোক পেলে না! ধরতে গেলে কিনা একেবারে মূলচাঁদকে?
এ সেই ব্রিটিশ আমলের শেষের দিকের কথা। পুলিসের লাইনে তখনও সাদা চামড়ার রাজত্ব। সুশীল সামন্তর জীবনেও তখন চাকরির গোড়ার দিক। তখন কলেজ থেকে বেরিয়ে সামনে বড় আদর্শ নিয়ে কাজ করতে ঢুকেছিল পুলিসের চাকরিতে।
কিন্তু চাকরিতে ঢুকে সুশীল সমস্ত পৃথিবীটা যত দেখতে লাগলো ততই সব আদর্শ ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে লাগলো। দেখলে এ পৃথিবীতে যে সৎ হবার চেষ্টা করবে তারই যত দুর্ভোগ। যে সত্যি কথা বলবে তাকেই তত শাস্তি পেতে হবে। অথচ তুমি চুরি করো, ঘুষ নাও, মিথ্যে কথা বলো, চড়চড় করে তোমার চাকরিতে উন্নতি হয়ে যাবে।
