বাড়িতে আসতেই বেহারি পাল জিজ্ঞেস করলে কীগো এত দেরি যে তোমার?
গিন্নী বললে–এদের শাশুড়ি বউ-এর কাণ্ড দেখছিলুম, তাই দেখতেই দেরি হয়ে গেছে। নইলে খাওয়া হয়ে গেছে অনেকক্ষণ।
–শাশুড়ি বউ-এর ঝগড়া? বেহারি পাল উৎসাহিত হয়ে উঠলো।
তা এসব সেই গোড়ার দিকের কথা। এর পর অনেক কাণ্ড ঘটে গেছে। অনেক ঝড় বয়ে গেছে চৌধুরীবাড়ির ওপর দিয়ে। সেদিনকার সেই ঘটনার পর বেহারি পালের বউ এরও ওবাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বলতে গেলে দুবাড়ির মধ্যে আর মুখ-দেখাদেখিও নেই।
তারপর সেদিন হঠাৎ বিকেল বেলাই চৌধুরী মশাই-এর বাড়ির ভেতর থেকে আবার সেইরকম গোলমাল উঠলো।
রেল বাজারের পাটের আড়তদার প্রাণকৃষ্ণ সা মশাই বেহারি পালের দোকানে বসে বৈষয়িক কথাবার্তা বলছিল।
হঠাৎ চৌধুরী মশাই-এর বাড়ির ভেতরের গোলমাল শুনে বললেও কীসের গোলমাল পালমশাই?
বেহারি পাল বললে–ওই, শাশুড়িবউতে শুরু হয়েছে–
–শাশুড়িবউ?
প্রাণকৃষ্ণ সা মশাই অবাক। বললে–গলা তো একজনেরই শুনতে পাচ্ছি। ও বোধহয় চৌধুরী মশাই-এর গিন্নীর গলা। কাকে বকছে এত?
–ওই ছেলের বউকে।
–কেন? ছেলে তো শুনি নিরুদ্দেশ। তা ছেলের বউ আবার কী দোষ করলো?
বেহারি পাল বললে–কে জানে কী দোষ করেছে। ছেলে পালিয়ে গেছে সেটাও বউ এর দোষ। বউকে শুনি শাশুড়ি নাকি পেট ভরে খেতেও দেয় না। আমার গিন্নী মাঝে মাঝে লুকিয়ে-গিয়ে খাইয়ে আসতো, এখন আবার তাও বন্ধ হয়ে গেছে–
–কেন?
বেহারি বললে–ওই যে আমার কারবার একটু বড় হয়েছে। আপনি আগে ওখেনে যেতেন এখন আমার কাছে আসেন এটাও ওদের ভালো লাগে না। সহ্য হয় না আর কি!
প্রাণকৃষ্ণ সা তবু খুশী হলো না কারণটা শুনে। বললো–তাই ছেলেই বা বিয়ে থা করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল কেন? আমরা তো কিছু বুঝতে পারিনে। আর তারপর থেকে চৌধুরী মশাইও দেখেছি ব্যবসা বাণিজ্যের দিকে আর মন দিচ্ছেন না আগের মত। ছেলে চলে যাওয়াতে বোধ হয় মনটা ভেঙে গেছে।
খানিকক্ষণ কথাবার্তার পর সা মশাই নিজের কাজে চলে গেল। বেহারি পাল বাড়ির ভেতরে যেতেই দেখলে গিন্নী চৌধুরীবাড়ির দিকে কান পেতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কর্তাকে দেখেই বললে–ওই শোন, শুনছো তো?
বেহারি পাল বললে–শুনেছি তো, কিন্তু শুনে তো কোনও লাভ নেই। কিছু তো করতে পারবো না আমরা। শুধু মনের কষ্ট–
গিন্নী বললে–ওসব আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে, জানো? যাতে আমার কানে আসে। অথচ আমি কী দোষ করলুম। তোমাদের শাশুড়ি-ছেলে-বউ-এর ব্যাপার, আমি তার মধ্যে কে? আমি তো কেউই নই। নেহাৎ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমার বাড়িতে ছুটে এসেছিল, এই আমার দোষের মধ্যে দোষ হয়েছিল! তা আমি এর কী করবো বল?
বেহারি পাল বললে–তুমি না-শুনলেই পারো? শুনছো কেন? আসলে তো রাগ তোমার ওপরে নয়, রাগ আমার ওপরে। আমার অপরাধ আমার কারবার কেন বড় হয়েছে, আমার কেন টাকা হয়েছে। প্রাণকৃষ্ণ সা মশাই এখন আমার এখানে কেন এত আসে….তা তুমি তোমার নিজের কাজ করো গিয়ে, ওদিকে কান দিয়ে লাভ নেই।
বলে ওদিককার পাল্লা দুটো বন্ধ করে দিলে বেহারি পাল।
.
বাতাসীর নতুন বাড়িটা ভালো। মাসির সস্তার বাড়ি ছেড়ে বড়বাবু বাতাসীকে একেবারে পাকা দোতলা বাড়িতে এনে তুলেছিল। মাসির বাড়িতে বড় আজেবাজে লোকের আনাগোনা। ওতে ইজ্জৎ চলে যেত বড়বাবুর।
বড়বাবুদের কাছে ইজ্জতের দামটাই সব চেয়ে বেশি। ঘরের দরজায় খিল দিয়ে আমি যা-ই করি, বাইরে তো ইজ্জৎ বাঁচিয়ে চলতে হবে। সেই ইজ্জতের জন্যেই বাতাসীর পাকাবাড়ির সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ে দামী-দামী গয়নাও উঠেছিল। সারাদিন ধরে বাতাসীর আর কোনও কাজ থাকে না। দুপুর বেলা বিছানায় শুধু গড়ানো আর বিকেল হতে-না-হতে গা ধুয়ে খোঁপা বেঁধে সেজেগুজে তৈরি হয়ে বসে থাকা। কখন বড়বাবু আসবে তারই জন্যে প্রতীক্ষা।
একটা তো মাত্র মেয়েমানুষ। কিন্তু তার জন্যে সাজ-সরঞ্জামের কিছু কমতি নেই। দারোয়ান, ঝি, রাঁধুনী। বড়বাবুর সেবায় যেন কোনও ত্রুটি না হয়। সন্ধ্যে হয় আর ঘড়ির দিকে তাকায় বাতাসী। হা-পিত্যেশ করে বসে থাকে।
তা সেদিন বেলাবেলিই এসে গেল বড়বাবু।
ঘরে ঢুকেই দেখে বাতাসী একমনে কী একটা দেখছে।
বড়বাবু জিজ্ঞেস করলে–কী দেখছিলে?
–এই ছবিটা!
–ছবি? ফটো? এ কার ফটো? বড়বাবু ফটোটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলো। উস্কোখুস্কো মাথার চুল, লম্বা নাক, গায়ের রংটাও ফরসা মনে হচ্ছে।
–এ কার ছবি?
–মাসি দিয়ে গেছে আমাকে। এই ছেলেটা বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। এর মামা এসেছে কলকাতায় খুঁজতে। কোথাও পাচ্ছে না একে। তুমিই তো ফোটো চেয়েছিলে এর। বলেছিলে ফোটো না পেলে খুঁজে বার করতে পারবে না। এর নাম নিচেয় লেখা রয়েছে। পড়ে দেখ না–
বড়বাবু পড়ে দেখলে ফোটোর তলায় লেখা রয়েছে–সদানন্দ চৌধুরী–
সদানন্দ চৌধুরী! বড়বাবু ছবিখানা নিয়ে দেখতে লাগলো। তারপর বললে–এ বাড়ি থেকে পালিয়েছে কেন?
বাতাসী বললে–সে আমি কী জানি–মাসি আমাকে দিয়েছে আমি তাই তোমাকে দিলুম–
বড়বাবু অফিসে উদয়াস্ত খাটে। অফিসের কাজে কখনও তাকে যেতে হয় কলকাতার বাইরে। আবার অনেকদিন কলকাতাতেই দিন কাটে। অফিসের লোক থেকে শুরু করে অফিসের বাইরের লোক বাই তটস্থ থাকে বড়বাবুর ভয়ে। অফিসে কনস্টেবলরা বড়বাবুকে দেখলে চোখের আড়ালে চলে যায়। বড় জাঁদরেল সাহেব বড়বাবু। এককালে স্বদেশী ছোকরাদের ধরে ধরে আগা-পাশ-তলা বেত মেরে ঠাণ্ডা করে দিয়েছে। সেকালে কত স্বদেশী ছেলে যে বড়বাবুর হাতে খুন হয়েছে তার ঠিক নেই। তারপরে যুদ্ধ হয়েছে, যুদ্ধ থেমেও গেছে। কিন্তু প্রতাপ তখনও কমেনি বড়বাবুর। বরং বেড়েছে।
