কালীগঞ্জের বৌ বলতো কিন্তু আমার যে পাওনা টাকা নারায়ণ!
–তা পাওনা টাকা বললেই কি হুট বলতে টাকা দিতে হবে?
–কিন্তু তুমি যে আমাকে আসতে বলেছিলে আজ?
–তখন আসতে বলেছিলুম, ভেবেছিলুম টাকা থাকবে আমার কাছে। কিন্তু এখন দেখছি টাকা নেই আমার।
হঠাৎ পাশ থেকে সদানন্দ বলে উঠলো–না দাদু, তোমার টাকা আছে, আমি দেখেছি তোমার সিন্দুকের ভেতর যে অনেক টাকা আছে–
কর্তাবাবু হঠাৎ পাশের দিকে নজর দিয়ে দেখেন নাতিটা কোন ফাঁকে সেখানে এসে বসে বসে এতক্ষণ তাদের কথা শুনছিল।
বললেন–ওরে, ও দীনু, কোথায় গেলি তুই, ও দীনু, একে এখানে আসতে দিলি কেন? ও দীনু,–
দীনু তাড়াতাড়ি ভেতরে এসে সদাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত। কিন্তু সদা যেতে চাইত না, দীনুর টানাটানিতে ঘর থেকে যেতে যেতেও চীৎকার করে বলতো তুমি মিথ্যে কথা বলছো দাদু, তুমি মিথ্যেবাদী–তুমি মিথ্যেবাদী–তোমার অনেক টাকা আছে–
তারপর একসময় কালীগঞ্জের বৌ আবার যেমন এসেছিল তেমনি চলে যেত।
সদানন্দ পালকীটার পেছন পেছন ছুটতো–ও কালীগঞ্জের বৌ, কালীগঞ্জের বৌ, আমার দাদু মিথ্যেবাদী, দাদু তোমায় মিথ্যে কথা বলেছে, দাদুর অনেক টাকা আছে, সিন্দুকের ভেতর দাদুর অনেক টাকা আছে–আমি দেখেছি।
কিন্তু ছুটতে ছুটতে বেশি দূর এগোতে পারতো না। দীনু এসে সদাকে ধরে নিয়ে অন্দরমহলে চলে যেত। আর পালকীটা রাস্তায় নেমে খেয়াঘাটের দিকে এগিয়ে চলতো। তারপর খেয়া পেরিয়ে পঁচিশ ক্রোশ দূরে একেবারে সোজা কালীগঞ্জ—
.
এসব অনেক দিন আগেকার কথা। তারপর মাইনর ইস্কুল থেকে পাশ করে সদানন্দ কেষ্টগঞ্জের রেলবাজারের ইস্কুলে পড়তে গেছে। সে ইস্কুল থেকে পাসও করেছে। তারপর কলেজ। কলেজ থেকে বিএ পাস করেছে। তারপরে তার বিয়ে। এ সেই বিয়ের পরের দিনেরই কাণ্ড।
গৌরী পিসী বললে–সবাই ওদিকে আনন্দ করছে, বাড়িতে নতুন বৌ এসেছে, আর তুই কি না এখানে অন্ধকারে ঘুরে বেড়াচ্ছিস–আয় আয় এদিকে আয়–
বলে সদানন্দকে টানতে টানতে ভেতর বাড়ির উঠোনের দিকে নিয়ে চললো। তখন সত্যিই সেখানে যজ্ঞি বাড়ির ধুম চলেছে। আলোয় আলো হয়ে গেছে জায়গাটা। পাকা ফলার খেতে বসেছে এ-গ্রাম সে-গ্রামের মুনিষরা। তাদেরই তো আসল আনন্দ। কর্তাবাবুর একমাত্র নাতির বিয়ে তো তাদেরই উৎসব। তারা ক’দিন ধরেই খাবে। তাদের নিজেদের বাড়িতে রান্না-খাওয়ার পাট আজ কদিন ধরে বন্ধ থাকবে। সকাল বেলা খাবে আবার রাত্তিরেও খাবে। প্রকাশমামা নিজে দই-এর হাঁড়ি নিয়ে সবাইকে দই দিচ্ছে। কাঁধে তোয়ালে কোমরে গামছা। মুখে খই ফুটছে। বলছে–খা খা খা, পেটভরে খা সবাই–
হঠাৎ সদানন্দর দিকে নজর পড়তেই বলে উঠলো–আরে, এ কী হয়েছে? রক্ত কীসের? রক্ত কেন তোর গেঞ্জিতে?
–রক্ত!
আরো সবাই চেয়ে দেখলে সেদিকে। বললে–সত্যিই তো, রক্ত এল কোত্থেকে? এত রক্ত?
সদানন্দও চেয়ে দেখলে তার গেঞ্জিতে সত্যিই রক্ত লেগে রয়েছে। এত রক্ত এল কোত্থেকে? তার হাতেও রক্ত।
গৌরী পিসীও এতক্ষণে নজর করে দেখলে–এ কী রে, কীসের রক্ত?
হঠাৎ যেন চারদিক থেকে প্রশ্ন উঠলো রক্ত! এ কীসের রক্ত! আকাশ-বাতাস-অন্তরীক্ষ সব জায়গা থেকে একসঙ্গে ঝড়ের মত প্রশ্ন আসতে লাগলো রক্ত, রক্ত! দোতলা থেকে নরনারায়ণ চৌধুরী প্রশ্ন করলেন–রক্ত! রক্ত! হরনারায়ণ চৌধুরীও পাশে এসে দাঁড়িয়ে দেখলেন। বললেন–আরে, এত রক্ত এল কোত্থেকে? দীনু দৌড়ে এল–এ কী খোকাবাবু, এ কীসের রক্ত? কৈলাস গোমস্তাও ভাল করে নজর করে দেখলে–তাই তো, রক্ত কীসের? রজব আলী পাকা-ফলার খাচ্ছিল একমনে। সেও বলে উঠলো–রক্ত! সদানন্দর অতীত জিজ্ঞেস করলে–রক্ত! সদানন্দর বর্তমান জিজ্ঞেস করলে–রক্ত! সদানন্দর ভবিষ্যৎ জিজ্ঞেস করলে রক্ত! সদানন্দর শিক্ষা-দীক্ষা-অস্তিত্বও প্রশ্ন করলে রক্ত! ইতিহাস ভূগোল সমাজ–সমস্ত ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ, অধস্তন উত্তরপুরুষ একযোগে সবাই প্রশ্নের ঝড় বইয়ে দিলে–রক্ত রক্ত রক্ত!!!
.
গণেশ হঠাৎ মাস্টার মশাইকে দেখতে পেয়েছে।
–আরে মাস্টার মশাই, আপনি এখেনে? আর ইনি আপনার জন্যে ভেবে ভেবে অস্থির! আপনি এঁকে ঘরে বসিয়ে রেখে এসেছেন–
সদানন্দ হাজারি বেলিফের দিকে চাইলেন। এতক্ষণে যেন সব মনে পড়লো আবার।
বললেন–আমি আপনার জন্যে জল আনতে এসেছিলুম, কিন্তু গেলাস খুঁজে পাচ্ছিলুম না–
গণেশ বললে–আপনি গেলাস খুঁজে পাবেন কী করে? আপনি কি কখনও নিজের হাতে জল গড়িয়ে খেয়েছেন? যান, আপনি ঘরে যান, আমি জল এনে দিচ্ছি–
যে-গেলাস খুঁজতে সদানন্দবাবুর রাত পুইয়ে গিয়েছিল, সেই গেলাস খুঁজে জল এনে দিতে গণেশের এক মিনিটও লাগলো না।
জল খেয়ে হাজারি যেন একটু ঠাণ্ডা হলো। বললে–যাক্ গে, এবার আর দেরি নয়। মশাই, চলুন। এখন পাঁচ ক্রোশ রাস্তা হাঁটতে হবে, বেলাবেলি বেরিয়ে পড়ুন–
সদানন্দবাবু বললেন–আজকেই যেতে হবে?
হাজারি বেলিফ বললে–তা যেতে হবে না? আপনার নামে হুলিয়া রয়েছে আমার কাছে আজ পনেরো বছর ধরে আর আপনি বলছেন আজকেই যেতে হবে কিনা? শেষকালে হাকিমকে খবর দিলে যে আপনার হাতে হাতকড়া লাগিয়ে নিয়ে যাবে তারা। তখন কি ভালো দেখাবে? তার চেয়ে ভালোয়-ভালোয় আমার সঙ্গে চলুন, বেশী ঝামেলা হবে না। আমি বাজে ঝামেলা পছন্দ করি না–
সদানন্দবাবু বললেন–কিন্তু আমি কী অপরাধ করেছি যে আমার নামে হুলিয়া বেরিয়েছে? বাদী কে?
