জিজ্ঞেস করলে–কী বউমা, তোমার মুখটা শুকনো শুকনো দেখাচ্ছে কেন? তুমি খাওনি?
নয়নতারা এতক্ষণে যেন একজন শুভাকাঙ্খীর দেখা পেয়েছে এমনি ভাবে জিজ্ঞেস করলে আপনি খেয়েছে দিদিমা?
দিদিমা বললে–আমার কথা ছেড়ে দাও, আমি তো খাবোই, কিন্তু তুমি এবাড়ির বউ, তোমাদের বাড়িতে এত লোকজনের আনাগোনা, তুমি কোথায় সকলকে দেখাশুনা করবে, আর তুমিই কিনা মুখ গম্ভীর করে আছো?
নয়নতারা মুখে একটু হাসি ফোঁটাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বললে–কই, গম্ভীর মুখ করে থাকিনি তো!
দিদিমা বললে–নিশ্চয় কিছু হয়েছে। বলো তো বউমা কী হয়েছে তোমার? খাওয়া হয়নি বুঝি? খেয়েছ? খেয়েছ তুমি?
ও-দিক থেকে শাশুড়ি বুঝি হঠাৎ সেই দিকেই আসছিল। তার কানে গিয়েছে কথাটা।
বললে–কে? কে খায়নি মাসিমা? কার কথা বলছো?
মাসিমা বললে–এই বউমার কথা বলছি। বউমার মুখখানা শুকনো-শুকনো দেখলুম কি না তাই জিজ্ঞেস করছিলুম বউমা খেয়েছে কি না—
শাশুড়িও বউয়ের দিকে চেয়ে বললে–কী বউমা, তুমি খাওনি?
নয়নতারা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু উত্তর দিলে না। উত্তর দিলে বলতে হতো কেউ তাকে খেতে বলেনি তো সে খাবে কী করে?
কিন্তু শাশুড়ি সে দিক দিয়েও গেল না। বললে–খাওনি তুমি? কিন্তু খাওনি কেন? এত লোক খেয়ে গেল আর তুমিই বা খেলে না কেন? কেউ বলবে তবে তুমি খাবে? একটু খেয়ে নিয়ে আমার উপকার করবে তাও তোমার দ্বারা হবে না?…তবু যদি একটা ছেলে বিয়োতে পারতে তো বুঝতুম–
মাসিমা বললে–আহা কেন তুমি ওকে বকছো বউ, ও পরের বাড়ির মেয়ে, সেদিন সবে নতুন বউ হয়ে এসেছে, ও নিজের মুখে কী করে খাওয়ার কথা বলে? তোমারই ওকে খাওয়াতে বসানো উচিত ছিল।
–তুমি রাখো তো মাসিমা! নতুন বউ! আমরা কি কোনওকালে বউ হইনি, না শাশুড়ির ঘর করিনি। আমি যদি আমার শাশুড়ির কাছে অমন বেয়াড়াপনা করতুম তা আমার শাশুড়ি আমার মুখে ঝামা ঘষে দিত না—
মাসিমা বললে–বউ, তুমি তোমার শাশুড়ির নামে অমন করে কথা বলো না, আমি তাঁকে চিনতুম, তিনি স্বগ্যে গেছেন, একদিনের জন্যেও তিনি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করেননি–
প্রীতি বললে–তুমি তো আমার শাশুড়ির দিকটাই কেবল দেখলে মাসিমা। আমার দিকটার কথাও ভাবো। আমি কি আমার শাশুড়ির সঙ্গে কোনওদিন গলা উঁচু করে কথা বলেচি, না বলবার সাহস হয়েছে।
–যাকগে, সেসব পুরোন কথা থাক, এখন তুমি খেয়ে নেবে এসো বউমা–-এসো– বলে বেহারি পালের বউ নয়নতারার হাত ধরে টানলে।
প্রীতি তার আগেই চেঁচিয়ে ডাকলে–ওলো ও গৌরী, বউমাকে খেতে দিসনি কেন, হ্যাঁ? কোনও দিকে কি তোর হুঁশ থাকে না?
গৌরীরও তখন খাওয়াদাওয়া চুকে গেছে। সে তখন পান চিবুচ্ছে। সে রান্নাবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বললে–ওমা, তাই নাকি? বউমা খায়নি? তা আমাকে বলবে তো? বউমা কি কুটুম্ব মানুষ নাকি যে ডেকে খাতির করে খাওয়াতে বসাতে হবে? আমরা সবাই যখন খেতে বসলুম তখন একটা পাতা পেতে নিয়ে আমাদের সঙ্গে বসে পড়লেই হতো–
বেহারি পালের বউ বললে–তুমি আর কথা বাড়িও না বাছা, কী দেবার আছে দাও দিকিনি বউমাকে, আমি পাশে বসে খাওয়াচ্ছি–
খেতে খেতে নয়নতারা যখন দেখলে কেউ কোথাও নেই তখন কান্নায় ভেঙে পড়লো। বললে–আর খেতে পারবো না দিদিমা, আমাকে আর খেতে বলবেন না আপনি।
দিদিমা বললে–না খাও, ওদের কথায় রাগ করতে নেই, রাগ করলে নিজেই ঠকবে–
নয়নতারা বললে–এর পরেও এই ছাই আমার গলায় ঢোকে?
দিদিমা বললে–গলায় ঢুকুক আর না ঢুকুক, জোর করে গিলে ফেল। তোমার তো এই খাওয়ার বয়েস। আর তা ছাড়া খাবেই বা না কেন? কার ওপর রাগ করে তুমি উপোস করবে? শাশুড়ি মানুষেরা ওরকম বলেই থাকে। আমার শাশুড়িও আমাকে ওরকম কত বলেছে। তোমার শাশুড়ি যখন বউ মানুষ ছিল তখন কত খোঁটা খেয়েছে নিজের শাশুড়ির কাছে। এখন মারা গেছে তাই অত তার গুণপনা ব্যাখ্যা হচ্ছে। আবার তুমিও যখন শাশুড়ি হবে তখন তুমিও তোমার বেটার বউকে অমনি বকবে। এ সব বাড়ির নিয়ম। ও নিয়ে রাগ করতে নেই–
নয়নতারা বললে–আপনি সব জানেন না তাই ওকথা বলছেন দিদিমা, জানলে আর বলতেন না–
দিদিমা বললে–কেন, আগে যে তোমাকে শাশুড়ি খুব আদর করতে দেখেছি। তোমাকে সিন্দুকের চাবি দিয়ে দিয়েছিল।
নয়নতারা বললে–সে চাবি এখন নিয়ে নিয়েছেন–
–সে কী? নিজে থেকে যে তোমার আঁচলে বেঁধে দিয়েছিল, আবার নিজেই সে-চাবি নিয়ে নিয়েছে?
–হ্যাঁ!
–কেন? কী করেছিলে তুমি?
–আমি আবার কী করবো! চাবি আমার কাছে থাকলেও আমি সিন্দুক কোনও দিনই ছুঁইনি। একদিন উনিই আমাকে বললেন চাবি দিয়ে দিতে, আমিও দিয়ে দিলুম
হয়ত আরো কথা হতো এ প্রসঙ্গে কিন্তু ঠিক সেই সময়ে শাশুড়ি সেখানে আসতেই কথা বন্ধ হয়ে গেল। বললে–কী, এখন বউমার রাগ ভাঙলো?
মাসিমা বললে–তুমি আর অমন খোঁটা দিয়ে কথা বোল না বউ, একটু আদর করলেই পারো তুমি নিজে
প্রীতি বললে–আমাকে কে আদর করে তার ঠিক নেই আমি করবো বউ-এর আদর। আমার কি সময় আছে মাসিমা যে জনে জনে দেখে বেড়াবো কে আদর পাচ্ছে কে পাচ্ছে না। সেই রাত থাকতে উঠিচি আর কখন যে শুতে যেতে পারবো তার ঠিক নেই, আমার মাথা-হাত-পা সব টনটন করছে তা জানো?
ততক্ষণ আরো অনেক রাত হয়েছে। সারা বারবাড়ির উঠোনে তখন কলাপাতা নিয়ে রাস্তার কুকুরদের টানাহ্যাঁচড়া চলছে। বেহারি পালের বউ আর দাঁড়ায়নি সেখানে।
