রাধা বললে–তুমি ছেলেমানুষ বাবা তাই ওকথা বলছো। বয়েস হলে বুঝতে সংসারে কেউ কারো নয় বাবা, কেউ কারো নয়, বাবাই বলো আর মাই বলো, সবাই পর। শুধু একলা তোমার মামার দোষ দিয়ে লাভ কী? তোমার মামাকে ছেড়ে যদি অন্য কারো কাছে গিয়ে দাঁড়াতুম তো সেও এই একই রকম করতো–
বলে রাধা কাঁদতে লাগলো।
সদানন্দ আর কথা বাড়াতে দিল না। কথা বাড়ালেই কান্না বাড়বে রাধার। এ রাধাকে আগে কখনও দেখেনি সদানন্দ। আগেকার রাধা গান গেয়েছে, পান-দোক্তা খেয়ে হেসেছে, বোধবয় মদও খেয়েছে প্রকাশমামার সঙ্গে। কিন্তু এতদিন পরে এ এক অন্য রাধাকে দেখলে সদানন্দ। এবারকার এরাধা ঠাকুরপূজো করে। এরাধা কালীঘাটে মায়ের দর্শন করতে চায়। এরাধা কাঁদে। নিজের দুঃখের কথা বলতে গিয়ে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়।
রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর রাধা বললে–তুমি শুয়ে পড়ো বাবা-দরজায় খিল দিয়ে দাও, আমি আসি
–কিন্তু তুমি? তুমি কোথায় শোবে?
–আমার জন্যে তুমি ভেবো না। আমার কি আর শোবার জায়গার অভাব? এ-পাড়ায় আমাদের অনেক বাড়ি আছে, যার-তার বাড়ির একটা ঘরে গিয়ে পড়ে থাকবো। আমার জন্যে তোমায় ভাবতে হবে না–
বলে রাধা চলে গিয়েছিল। মনে আছে সেই তক্তপোষের ওপর শুতে কেমন খারাপ লেগেছিল সদানন্দর। তবু রাধার মনে কষ্ট দিতে ইচ্ছে হয়নি তার। পরের দিন সকালে উঠেই কোথাও চলে যেতে চেয়েছিল সে, যেখানে গেলে নবাবগঞ্জের কেউ আর তার নাগাল পাবে না।
কিন্তু মাঝ রাত্রে হঠাৎ একটা শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। মনে হলো দুম-দুম্ করে কেউ যেন তার দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।
সদানন্দ ধড়মড় করে উঠে পড়েছে। রাধা নাকি! ঘরে হয়ত রাধার জিনিসপত্র আছে, তাই নিতে এসেছে।
খিলটা খুলতেই সদানন্দ দেখলে একজন অচেনা লোক। টলছে। খুব মদ গিলেছে বোধহয়।
–এতক্ষণ ধরে দরজা ঠেলছি, খুলছিস না কেন? মরণ-ঘুম ঘুমিয়েছিলি নাকি?
কথাটা বলেই তারপর বোধহয় একটু খেয়াল হলো। বললে–তুমি কে বাবা? হ্যাঁ?
নেশার ঘোরের মধ্যেও লোকটার বোধহয় একটু জ্ঞান ছিল তখনও। বুঝতে পেরেছে। যে-লোকটার সঙ্গে কথা বলছে সে মেয়েমানুষ নয়, পুরুষমানুষ।
–কাকে চাই?
লোকটা বললে–আপনাকে ডিস্টার্ব করলুম নাকি ভাই? হাত জোড় করছি, আমাকে মাফ করুন, আমি জানতুম না, রাধার যে বাঁধাবাবু আছে তা একদম স্রেফ ভুলে গিয়েছিলুম–
সদানন্দ বললে–ঠিক আছে, আপনি আসুন, আমি বেরিয়ে যাচ্ছি বলে যেমন অবস্থায় ছিল তেমনি অবস্থাতেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো সে। লোকটা তখনও বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা। বললে–আপনি কোথায় যাচ্ছেন ব্রাদার?
কিন্তু সদানন্দ সেকথায় কান দিলে না। রাধার বাড়ি ছেড়ে একেবারে বাজারের রাস্তায় গিয়ে পড়লো। বাজার তখন ফাঁকা। রেল-স্টেশনের বাজার। বন্ধ দোকান-ঘরগুলোর সামনের মাচাতেই অনেক ব্যাপারি শুয়ে আছে। তারপর সেখান থেকে একেবারে সোজা রেল-স্টেশনের প্লাটফরম্।
শব্দটা রাধার কানেও গিয়েছিল। যা ভয় করছিল সে তাই-ই হয়েছে। দৌড়তে দৌড়তে নিজের ঘরের কাছে এসেই যা দেখলে তাতে মাথায় রক্ত উঠে গেল। বললে–তুমি হঠাৎ কোত্থেকে এলে? আমার ঘরে লোক ছিল তাকে কোথায় বার করে দিলে?
লোকটা হেসে উঠলো দাঁত বার করে, বললে–তা আমি কী করে জানবো তোমার বাবু এসেছে আজকে? আমার অপরাধটা কী দেখলে? দরজায় তাহলে নোটিশ লিখে দেওয়া উচিত ছিল। এমন বেদিনে আসে কেন তোমার বাবু?
রাধা আর থাকতে পারলে না। সোজা একেবারে লোকটার গলাটা চেপে ধরলে। বললে–তাবলে তুমি আমার ঘরের লোককে তাড়িয়ে দিলে কেন তাই আগে বলো? কেন তাড়িয়ে দিলে? বলো? না বললে–তোমাকে আমি খুন করে ফেলবো, বলো?
লোকটা একে নেশায় টলছে, তার ওপরে মাঝরাত, তার ওপর আবার রাধা খুব জোরে গলাটা টিপে ধরেছে। এমন অবস্থার জন্যে তৈরি ছিল না সে। বলতে গেল–ছাড়ো আমাকে, ছেড়ে দাও…
কিন্তু রাধা তাকে কিছুতেই ছাড়বে না। বললে–আগে তুমি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও আগে–
লোকটা তখন কাবু হয়ে গেছে। তার গলাটা তখনও ধরে রেখেছে রাধা।
বললে–আমি তোমার এখানে থাকবো বলেই যে এসেছিলুম, আমি না-হয় আরো বেশি টাকা দেব–যত টাকা চাইবে তত টাকাই না-হয় দেব
রাধা চেঁচিয়ে উঠলো তোমার টাকায় আমি ঝাঁটা মারি, আমায় তুমি টাকা দেখাচ্ছ, বেরোও এখন থেকে বেরিয়ে যাও–
লোকটা সেই ঝাপসা অন্ধকারের মধ্যে বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
.
আবার সেদিন চৌধুরী মশাই-এর বাড়ির ভেতর থেকে গোলমাল উঠলো।
সদানন্দ বাড়ি থেকে চলে যাবার পর প্রথম প্রথম কেউ বুঝতে পারেনি। ঘটা করে শ্রাদ্ধ হলো কর্তাবাবুর। ঘটা বটে, কিন্তু আগেকার মত তেমন ঘন-ঘটা যেন নয়। আগের মত ভিয়েন বসলো বারবাড়ির উঠোনে। গ্রামের লোকও এল পাত পেড়ে খেতে। কিন্তু সবাই নয়। নেমন্তন্নর ব্যাপারেও কিছু উনিশ-বিশ করা হলো। চৌধুরী মশাই বললেন–একটু কষে লিস্টি করো কৈলাস, খরচা আর বাড়াতে চাই নে। এমনি কর্তাবাবুর অসুখে অনেক খরচ হয়ে গেছে–
রাত্রে যখন যে-যার বাড়ি চলে গেছে তখন বেহারি পালের বউও কাজকর্ম সেরে বাড়ি চলে আসছিল। হঠাৎ দেখলে নয়নতারা নিজের ঘরের দরজার চৌকাট ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
কেমন খারাপ লাগলো দেখতে। এত লোক-জন, এত খাওয়া-দাওয়া, এর মধ্যে বাড়ির পুত্রবধূ এ-রকম মুখ শুকনো করে দাঁড়িয়ে আছে কেন?
