আস্তে আস্তে এক সময়ে পৃথিবীতে দিন হলো। দিগন্তে সূর্য উঠলো, লোকালয়ে কোলাহল। নবাবগঞ্জ পেরিয়ে কোমলপুর, কোমলপুর পেরিয়ে ছুটিপুর। ছুটিপুর পেরিয়ে আরো অনেক দূরে চলো। আরো অনেক দূর তোমাকে যেতে হবে সদানন্দ। আরো অনেক দেশ।
মনে আছে যখন খেয়াল হলো তার তখন নবাবগঞ্জ ছাড়িয়ে সে অনেক দূর চলে এসেছে।
মনে হলো কে যেন পেছন থেকে ডাকলে–কে গো তুমি? বাড়ি কোথায় গো তোমার?
মেয়েলি গলা। গলাটা শুনেই সদানন্দ পেছন ফিরলো। হাতে বাজারের থলি, মাথায় ঘোমটা। ডুরে শাড়ি পরা মেয়েমানুষ।
রাস্তার মেয়েমানুষ এমন করে সাধারণত কোনও অচেনা পুরুষকে ডাকে না। সদানন্দ অবাক হয়ে গেল দেখে।
–প্রকাশবাবু তোমার কে হয় বল তো? মামা না?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ–
–আমি ঠিক চিনতে পেরেছি। আমার নাম রাধা। আমাকে মনে পড়ে তোমার? সেই তোমার মামার সঙ্গে তুমি আসতে আমার বাড়িতে। মনে পড়েছে?
সদানন্দ যেদিকে যাচ্ছিল সেই দিকেই চলতে চলতে বললে—হ্যাঁ—
কিন্তু রাধা একেবারে সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো। বললে–তোমার মাথায় কী হয়েছে? ব্যাণ্ডেজ বেঁধেছ কেন?
সদানন্দ বললে–ডাক্তার বেঁধে দিয়েছে–
–তুমি যাচ্ছো কোথায়?
সদানন্দর তখনও যাবার কোনও নির্দিষ্ট জায়গা ছিল না। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে কোনও উত্তর না বেরোতে রাধার কেমন সন্দেহ হলো। সদানন্দর পোশাক-পরিচ্ছদ দেখেও অবাক লাগলো। একটা ধুতি আর গেঞ্জি শুধু। গায়ে অন্য কোনও জামাও নেই। সন্দেহ হতেই রাধা সদানন্দর হাতটা ধরে ফেললে। বললে–এসো, আমার বাড়িতে এসো—
সদা আপত্তি করতে গেল। কিন্তু রাধা ছাড়বার পাত্রী নয়। বললে–আমি তোমাকে ছাড়ছি নে, তোমার মামা শুনলে কী বলবে বলো তো! বলবে তুমি সদাকে রাস্তায় দেখলে তবু এই অবস্থায় তাকে ছেড়ে দিলে?
আর কোনও ওজর-আপত্তিতে কাজ হলে না। রাধার সেই পুরোন বাড়িটা। অনেকবার সদানন্দ মামার সঙ্গে গিয়েছিল আগে। সে-সব ছোটবেলাকার ব্যাপার। তখন সদানন্দ বুঝত না কিছু। যাত্রা শুনে ফেরবার মুখে শেষরাত্রে রাধার বাড়িটাই ছিল প্রকাশমামার আশ্রয়। প্রকাশমামা এসে রাধাকে খুব চোটপাট করতো। এই রাধা ঘুম থেকে ওঠবার পর ঘোলের সরবৎ করে দিয়েছে। রাধার বাড়িতে বসে মাছের ঝোল দিয়ে দু’জনে মিলে কতদিন ভাত খেয়েছে। তারপর সন্ধ্যেবেলা প্রকাশমামা বোতল বের করে মদ খেতে শুরু করেছে। তখন রাধা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গেয়েছে। সেসব দিনে সদানন্দ কিছু বুঝতো না বলে প্রকাশমামা অনেক রকম মিথ্যে কথা বলে ভুলিয়েছে তাকে। রাধার বাড়িতে রাধার হাতের রান্না খেলে জাত যায় বলে প্রকাশমামা বারবার রাধার বাড়িতে ভাত খাওয়ার কথা বাবাকে বলতে বারণ করে দিয়েছে।
সেদিন সেই সকালবেলা সদানন্দকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাধা অনেক খাতির করলে। সদানন্দ চেয়ে দেখলে ঘরের ভেতর সেই তক্তপোষটা তখনও রয়েছে, সেই পুতুল ভরা কাঁচের আলমারিটা। কাঠের জলচৌকির ওপর রাধার সেই ঠাকুর। কেষ্ট ঠাকুর। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে রাধা পূজো করতো রোজ। দেখে মনে হলো সেদিনও সে পুজো করেছে। তখনও ঠাকুরের সামনে ফুল বেলপাতা রয়েছে।
দুপুরবেলা খেয়ে উঠে সদানন্দ বললে–আমি এবার যাই–
রাধা বললে–তোমার তো বিয়ে হয়েছে, না?
সদানন্দ বললে—হ্যাঁ–
–বউ কেমন হলো?
সদানন্দ বললে–ভালো।
রাধা বললে–তোমার মামা কিন্তু আমাকে বলেছিল তোমার নাকি বউ পছন্দ হয়নি। তুমি বউএর সঙ্গে নাকি শোও না।
সদানন্দ বললে–আমার মামার কথা তুমি বিশ্বাস করো নাকি?
রাধা বললে–বিশ্বাস আর কী করেই বা করি! তোমার মামাই তো আমাকে এ-পথে এনেছিল। তখন অনেক কিছু কথা দিয়েছিল, অথচ একটা কথাও রাখলে না–
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–কী কথা দিয়েছিল?
রাধা বললে–তুমি তার ভাগ্নে হও, সব কথা তোমাকে বলাও যায় না। আর সে-সব আজকের কথাও নয়, বলতে গেলে এখন আর মনেও পড়ে না সে-সব কথা। তখন যে কী মতি হয়েছিল আমার, তোমার মামার কথাতেই ভুলে গিয়ে চলে এসেছিলুম, নইলে কি আর আজ আমার এই দশা হয়? তখন শুনেছিলুম তোমার মামার নাকি অনেক টাকা, মস্ত বড় জমিদার। ভেবেছিলুম শান্তি না-পাই সুখ তো পাব। ভালো শাড়ি পরতে পাবো, ভালো-ভালো গয়না পরতে পাবো
কথা বলতে বলতে সেদিন রাধার চোখ দুটো কেমন যেন ভারি হয়ে উঠতে লাগলো।
–ওই শাড়ি-গয়নার লোভই আমাকে পথে নামিয়েছিল বাবা। নইলে তো অন্য কোনও লোভ ছিল না। গরীবের ঘরে জন্মেছিলুম বলে বড় দুঃখ ছিল আমার। ভেবেছিলুম তোমার মামার সঙ্গে গেলে যদি দুঃখটা ঘোচে তো তাই-ই বা মন্দ কী! কিন্তু পরে বুঝলুম সব মিথ্যে কথা। তোমার মামার যে কিছুই নেই তা কী করে তখন আমি বুঝবো? বাড়িতে যে তোমার মামার একটা বউ আছে সেকথাটাও আমাকে একবার বলেনি মুখ ফুটে–
সদানন্দ বললে–তা তুমি মামাকে ছেড়ে চলে গেলে না কেন?
রাধা বললে–ছেড়ে যাবো কোথায় বাবা, ছেড়ে গেলে কে আর আমায় দেখবে বলো? আর তোমার মামাকে তো চেন, যতবার কথাটা কানে তুলেছি ততবার একটানা-একটা ছুতো দিয়েছে। আর তারপর এখন তো বয়েস হয়ে গেছে, এখন এই বয়েসে আর কোথায় যাবো, বেশ আছি। একবার কালীঘাটে মায়ের দর্শন করবার ইচ্ছে হয়েছিল, তাও হলো না–
সদানন্দ বললে–তা তুমি পালিয়ে গেলে না কেন? মামাকে ছেড়ে তোমার বাবা-মার কাছেও ফিরে যেতে পারতে?
