বেহারি পাল বললে–সে কথা তো সবাই জানে। কিন্তু ওরা কি সেই ধরনের লোক? দেখনি আমার একটু পয়সা হয়ছে বলে কর্তামশাই আমাকে কী-চোখে দেখতো? যখন অবস্থা ভালো ছিল না আমার তখন একরকম ব্যবহার পেইছি, তারপর আবার যখন আমার অবস্থা ভালো হলো তখন অন্য রকম। তখন থেকে তো কর্তামশাই আমাকে মানুষ বলেই মনে করতেন না। অসুখের সময় কতদিন দেখা করতে গিয়েছি, যেন আমি গরু না ভেড়া, মানুষ না পাথর! নিজে না খেয়ে না পরে, লোকজনকে সুদে টাকা দিয়ে জমি-জমা করেছি, সে সব তো কানে গেছে কর্তামশাইএর।
বউকে এসব পুরোন কথা শোনোনো বৃথা। কারণ এসব নবাবগঞ্জের সবাই জানে। এত লোক বেহারি পালের দোকানে সওদা করতে আসতো, কিন্তু কর্তামশাইএর বাড়ি থেকে কখনও এক পয়সার সওদা করতেও কেউ আসেনি।
কৈলাস গোমস্তাকে একদিন রাস্তায় বেহারি পাল জিজ্ঞেস করেছিল–আচ্ছা কৈলাস, আমার দোকান তো তোমাদের কর্তামশাইএর বাড়ির পাশেই, কই তোমরা তো কোনও দিন আমার দোকান থেকে একটা আধলার জিনিসও সওদা করো না? আমার মাল কি খারাপ, না আমি ওজনে কম দিই, নাকি বাজার দরের বেশি দাম নিই—
কৈলাস বলেছিল–আজ্ঞে, তা নয়, আমি হলুম গিয়ে হুকুমের চাকর, আমি কী করবো বলুন? আমার ওপর যেমন হুকুম হবে আমি তেমনি তামিল করবো–
বেহারি পাল বলতো–তোমার কোনও দোষ নেই কৈলাস, তোমাকে আমি বলছি না। আমি তোমার কর্তাবাবুর কথাই বলছি। নিতাই হালদারের দোকানের ওপরও আমার কোনও রাগ নেই। আর আমার দোকান থেকে না কিনলে যে আমি উপোস করবো তাও নয়, কথাটা আমার মনে হয়েছে বলেই তোমায় জিজ্ঞেস করছি–
তা বেহারি পাল তখন থেকেই জানতো যে কারোর অবস্থা ভালো হোক, কারোর টাকা হোক এটা কর্তাবাবুর কাছে ভালো লাগতো না।
৩.২ কোথায় গেল সেই টাকা
কিন্তু আশ্চর্য, কোথায় গেল সেই কর্তাবাবু আর কোথায় গেল তাঁর সেই টাকা। তাঁর অত সাধের নাতির বিয়ের পর তিনি ভেবেছিলেন জীবনে যা-কিছু অন্যায় যা-কিছু অত্যাচার তিনি করেছে সব বুঝি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল। ভেবেছিলেন ভবিষ্যৎ কাল তাঁকে তাঁর বংশধরদের মধ্যে দিয়েই বুঝি অমর করে রাখবে। ক্ষণকালের পাপের দাগ চিরকালের কষ্টিপাথরে ধরা পড়বে না। তিনি যাবার আগে এই মিথ্যে বিশ্বাস নিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন যে পরবর্তীকালের কাছে মহাপুরুষ আখ্যা পেয়ে তিনি ধন্য হবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি জানতেও পারেননি যে-অপমৃত্যু দিয়ে তিনি নিজের হাত সুদৃঢ় করেছেন সেই হাতই তাঁর আত্মজের হাত হয়ে একদিন তাঁকেই আবার কলঙ্কিত করবে। পরোক্ষভাবে তাঁর কৃত সমস্ত অপঘাত-মৃত্যু একদিন সুদে-আসলে তাঁরও অপঘাত-মৃত্যুকে ডেকে আনবে!
মানুষের জীবন যদি অত সহজ-সরল হতো তাহলে ইতিহাসের পাতায় যত যুদ্ধ-বিগ্রহের বিবরণ লেখা আছে তার একটাও ঘটতো কিনা সন্দেহ। কিম্বা যত মহাপুরুষের নাম পৃথিবীতে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছে তাদের আবির্ভাব হয়ত এত সত্যও হতো না। আর এত অনিবার্যও হয়ত হয়ে উঠতো না। ধর্মের গ্লানির সঙ্গে মহাপুরুষের অভ্যুদয়ের বোধহয় এটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। সেই সম্পর্কটা যখনই বিচ্ছিন্ন হয় তখনই বাধে যত বিরোধ। তাই এক-একবার বিরোধ বাধে আর বিশ্বসংসার আর সমাজ কয়েক যুগ ধরে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যারা জীবনে ভোগ-সর্বস্ব তারা তখন বলে–বেশ আছি। বেশ থাকার সংজ্ঞা তাদের আলাদা, তাই বিপর্যয়ের মধ্যেই তারা আরাম পায় স্বস্তি পায়। কিন্তু সংসারে এমন এক-একজনও থাকে যে বলে এর থেকে আমাকে মুক্তি দাও প্রভু, এর থেকে আমাকে পরিত্রাণ করো।
কর্তাবাবুর অত সাধের গড়া সংসারে চৌধুরী মশাই মুক্তি চাননি। তিনি বলেছিলেন– বেশ আছি। আমার অনেক জমি, আমার অনেক সম্পত্তি, আমার অনেক প্রজা। আমার সিন্দুকে অনেক হীরে, অনেক জহরৎ, অনেক টাকা। চৌধুরী মশাইএর গৃহিণীও ভাবতে এই তো বেশ আছি। আমি আমার সন্তানের বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ এনেছি, আমার ঘর-আলো করা বউ হলো, এবার ঘর-আলোকরা একটা নাতি হবে। আমার কত আরাম, কত সুখ, কত শান্তি। এই আরাম-সুখ আর শান্তির আশাতেই প্রকাশমামা এই নবাবগঞ্জ ছাড়তে চাইতো না। কখনও যেত রাণাঘাটের রাধার বাড়ি, কখনও কালীঘাটের মাসির বাড়ি। আবার কখনও সেই আরামকে দীর্ঘস্থায়ী করতে মা কালী-মার্কা বোতলের আশ্রয় নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকতো। মনে মনে বলতো–বেশ আছি। আর তাদেরই বা দোষ কী! কে-ই বা সুখে ছিল না! তাস পাশা-দাবা খেলে আর যাত্রার মহড়া দিয়ে নিতাই হালদার, গোপাল ষাট, কেদার, গোবর্ধনও আরামে দিন কাটিয়ে দিচ্ছিল সারা জীবন। বলতো যুদ্ধের কথা থাক, আগে তাস ফেলো। আর ওদিকে কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে এদিকের বেহারি পাল পর্যন্ত কেউ এর ব্যতিক্রম ছিল না।
কিন্তু এদের মধ্যে একজনই শুধু বলে উঠলো–আমি বেশ নেই। আমি এ সহ্য করবো না। এর থেকে আমাকে মুক্তি দাও, এর থেকে আমাকে পরিত্রাণ করো।
সংসার থেকে পালিয়ে গেলেই কি মুক্তি আসে? পরিত্রাণ চাইলেই কি পরিত্রাণ পাওয়া যায়?
রাত তখন অনেক। নবাবগঞ্জে তখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সদানন্দ সেই অবস্থাতেই নবাবগঞ্জের রাস্তা দিয়ে দৌড়তে শুরু করেছে। ওরা আমাকে সংসারের নাগপাশ দিয়ে বাঁধতে চাইছে। ওরা আমাকে অন্যায়ের জাল ফেলে বন্দী করতে চাইছে। আমাকে তুমি মুক্তি দাও, আমাকে তুমি পরিত্রাণ করো। সমস্ত কলুষ বিনাশ করে আমাকে তুমি পরিশুদ্ধ করো। আমাকে বাঁচাও।
