প্রকাশ রায় বললে–ঠিক আছে, এখন তো একশো টাকা রইলো তোমার কাছে, ওটা তুমি বাতাসীকে দিয়ে দিও–আমি আগে আমার ভাগ্নের ফটোটা নিয়ে আসি
মাসি ততক্ষণে একশো টাকার নোটটা কপালে ঠেকিয়ে আঁচলে বেঁধে ফেলেছে। তখন তার কাজ হয়ে গেছে। আর দেরি না করে বাইরে চলে গেল।
ভেতর থেকে প্রকাশ বললে–তাহলে কালকে সকালের ট্রেনেই আমি চলে যাচ্ছি মাসি, আমার হিসেবটা বুঝিয়ে দিও—
.
নবাবগঞ্জে সেদিনও আবার অনেক রাত হয়েছে। আবার সব নিরিবিলি, আবার সব নিঝুম। এই সব রাত্রেই বুঝি মানুষের সব কলঙ্ক সব পাপ সাপের মত গর্ত থেকে বাইরে মুখ বাড়ায়। বাড়িয়ে শিকারের লোভে বুকে হেঁটে পরিক্রমা শুরু করে। পরিক্রমা করে কলকাতা থেকে। নবাবগঞ্জ সর্বত্র।
–দিদিমা, দিদিমা, ও দিদিমা, আমাকে বাঁচাও…ও দিদি…
বেহারি পালের বউ-এর ঘুম বড় পতলা। একটু শব্দ হলেই ঘুম ভেঙে যায়। আওয়াজটা কানে আসতেই ধড়মড় করে উঠে বসলো। তারপর সমস্ত জিনিসটা আন্দাজ করে নিলে। ওই তো, ঠিক যেন ও বাড়ির বউমার গলার মত!
বিছানা থেকে উঠে পাশের ঘরে গেল।–বললে–ওগো, শুনছো—ওগো—
বেহারি পাল মশাই উঠলো। বললে–কী হলো?
গিন্নি বললে–জানো, হঠাৎ চৌধুরীদের নতুন বউ আমাকে দিদিমা বলে যেন ডাকলে আমি স্পষ্ট শুনতে পেলুম। নতুন বউ যেন বললে–দিদিমা আমাকে বাঁচাও। তা আমি একবার ওবাড়িতে যাই, বুঝলে? আমার বড় ভয় হচ্ছে, মনে হচ্ছে নিশ্চয় কিছু বিপদ হয়েছে
–সে কী? এই এত রাতিরে তুমি ওদের বাড়িতে যাবে কি গো! ওরা যদি কিছু বলে তখন? সেদিন কত কী কথা শোনালে শুনতে পেলে না? ওদের শাশুড়ি-বউ-এর ঝগড়াতে তোমার থাকবার দরকার কী? অপমান করলে তখন তো গায়ে লাগবে–
কিন্তু গিন্নী বললে, না গো, বউটার বড় কষ্ট, আবার হয়ত কিছু কষ্ট দিচ্ছে ওরা, আমি যাই, বলা যায় না, শাশুড়ী যা গুণের মানুষ, মারধোরও করতে পারে।
বলে আর দাঁড়ালে না। কাপড়টা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে একেবারে সদর মাড়িয়ে চৌধুরী বাড়ির বার বাড়ির উঠোনে গিয়ে পড়লো।
হঠাৎ আবার সেই ডাক–ও দিদিমা আমাকে বাঁচাও–ও দিদিমা…
বার বাড়ির উঠোন পেরিয়ে ভেতর বাড়ির দরজায় গিয়ে জোরে জোরে ধাক্কা দিতে লাগলো।
–ও বউ, বউ, দরজা খোল। বউমা অত চেঁচাচ্ছে কেন? কী হয়েছে বউমার?
জোরে জোরে ধাক্কা দিতে দিতে বেহারি পালের বউ আবার বলতে লাগলো–ও বউ, বউ, আমি তোমার মাসিমা, দরজাটা খোল–
হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল। অন্ধকারে চৌধুরী-গিন্নীর চেহারাটা অস্পষ্ট ছায়ার মত দাঁড়িয়ে।
–কে?
বেহারি পালের বউ বলে উঠলো–আমি বউ আমি। বউমা অত চেঁচিয়ে উঠলো কেন গা? কী হয়েছে বউমার? আমাকে ডাকলে কেন?
প্রীতি বললে–আমার বউমার কী-হলো না-হলো তা নিয়ে তোমার তো দেখছি খুব মাথা ব্যথা মাসিমা!
মাসিমা বললে–তা মাথা ব্যথা হবে না বউ? মেয়েটা অমন করে চেঁচিয়ে উঠলো, ভাবলুম গিয়ে দেখে আসি কী হলো! মানুষের বিপদে-আপদে কি চুপ করে থাকতে পারা যায়?
প্রীতি বললে–আমার বউ-এর বিপদ-আপদের জন্যে তোমার বুঝি খুব ভাবনা? তা এতই যদি ভাবনা তো আমার বউকে কাল নিজের বাড়িতে আটকে রাখলেই পারতে? আবার সোহাগ করে আসতে দিলে কেন? তোমার বাড়িতেই খেতে শুতে থাকতো?
মাসিমা স্তম্ভিত হয়ে গেল বউ-এর কথা শুনে।
বললে–তুমি কী বলছো বউ? আমি বউমাকে আমার বাড়িতে আটকে রাখবো?
প্রীতি বললে–তা আমি কি অন্যায় বলেছি মাসিমা? কাল রাতিরে বউমা তোমার বাড়িতে যায়নি বলতে চাও? নিজের শাশুড়ি থাকতে তার কোন্ দায় পড়েছিল তোমার বাড়িতে যাবার শুনি? আজকে পরের বাড়ির দিদিমার ওপরে বউমার এত টানই বা হলো কেন? তবু যদি নিজের দিদিমা হতে তো তাও বুঝতাম
বেহারি পালের বউ বললে–আমার আসাই ঘাট হয়েছে বউ, কর্তা ঠিকই বলেছিল, এখন বুঝছি না-এলেই বুঝি ভালো হতো।
প্রীতি বললে–সেকথাটা আগে বুঝলে আমাকেও এত কথা বলতে হতো না আর তোমাকেও এত কথা শুনতে হতো না মাসিমা–
বেহারি পালের বউ বললে–ঠিক আছে বউ, আমি আসি
বলে আবার যেমন এসেছিল তেমনি চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু পেছন থেকে প্রীতি আবার ডাকলে।
বললে–একটা কথা শুনে যাও মাসিমা, পরের বাড়ির গেরস্তালি ব্যাপারে নাক গলাতে চেষ্টা করা, এটা ভাল কাজ নয়। আমার বউমা খেতে পেলে কি পেলে না, আমার বউমা রাতিরে একলা ঘরে শুতে ভয় পেলো কি পেলো না, সেটা দেখার কাজ আমার, পরের কাজ নয়–
বেহারি পালের বউ বললে–কিন্তু আমি তো তোমাদের পর মনে করি না বউ। পর মনে করলেই পর হয়। এতদিনে তুমিও আমাকে পর মনে করোনি, আমিও তাই। তা আজ যদি আমি পর হয়ে গিয়ে থাকি তো সে আমার কপাল বউ, সে আমার কপাল–
বলে বেহারি পালের বউ আর সেখানে দাঁড়লো না। সোজা নিজের বাড়িতে চলে এল।
বেহারি পাল সদরেই দাঁড়িয়ে ছিল। বললে–কী হলো? খুব কথা শোনালে তো? আমি তোমাকে বললুম যেও না তুমি সেই গেলে!
বেহারি পালের বউ সেকথার কোনও উত্তর না দিয়ে নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লে। বেহারি পালও পেছনে-পেছনে এসে দাঁড়ালো ঘরের ভেতরে।
বললে–দেখ, যখন মানুষের সময় খারাপ হয় তখন এমনিই হয়। তখন আর কারোর সঙ্গে মানুষ ভালো ব্যবহার করতে পারে না, তখন কাউকেই আর সহ্য হয় না–
বউ বললে–তা আমি কি ওদের টাকায় ভাগ বসাতে গেচি, না আমার সঙ্গে ওদের সেই সম্পর্ক! পাশাপাশি বাস করলে বিপদে-আপদে মানুষ মানুষের বাড়ি যায় না?
