মাসি মিষ্টি কথা বলতে যেমন, আবার পকেট কাটতেও তেমনি।
প্রকাশ বললে–ঠিক আছে, তুমি যা ভালো বোঝ মাসি তাই করো, আমি এই শুয়ে রইলুম–
কিন্তু সত্যি-সত্যি শুয়ে প্রকাশ থাকে না। খেয়ে উঠেই বেরিয়ে পড়ে ঘুরতে। ঘুরতে ঘুরতে কাঁহা কাঁহা চলে যায় তার ঠিক নেই। বড়বাজারের দুধওয়ালা ধর্মশালা থেকে শুরু করে দক্ষিণেশ্বরের কালিবাড়ি পর্যন্ত কোথাও ঘুরতে বাকি থাকে না তার। ভালো করে নজর দিয়ে দেখে সকলকে। সকলের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলোয়। যাবে আর সে কোথায়? এই শহরেই কোথাও কোনও কোণে সদা আছে নিশ্চয়ই। যেখানে যে-আস্তানাতেই থাকুক রাস্তায় কি একবারের জন্যও বেরোবে না?
তারপর আছে কলকাতার বাজারগুলো। যে-যেখানে থাকুক, বাজারে একবার আসতেই হবে। সদা কি আর বাজার করতে আসবে? তা নয়। তবু অনেকগুলো লোককে একসঙ্গে বাজারেই পাওয়া যায়। সন্ধ্যেবেলা আর বেরোতে পারে না প্রকাশ। তখন ব্ল্যাক-আউট। তখন অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে মিলিটারি-লরির ধাক্কা লাগলেই সঙ্গে সঙ্গে খতম। তখন এই মাসির বাড়িই ভালো। তখন এ-পাড়া আবার জম-জমাট। আগে যেমন ফাঁকা ছিল এখন আবার তেমনি জম-জমাট। তখন বস্তির বাড়িতে বাড়িতে মদের সঙ্গে ফুলুরি-পেঁয়াজির চাট জমে ওঠে। কোনও কোনও বাড়িতে আবার গান-বাজনার ঠাট্টা। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যখন ট্যাঙ্ক বারুদ-বোমার ঘায়ে কোটি-কোটি লোকের জীবনান্ত অবস্থা তখন এ-প্রান্তে যৌবন নিয়ে ছেঁড়াছেঁড়ি কাণ্ড চলে।
কিন্তু সেদিন একটা অঘটন ঘটে গেল। হাওড়া স্টেশনের প্লাটফরমে গিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল প্রকাশ রায়। বিকেল হবো-হবো। মিলিটারিস্পেশাল এসেছে। খুব ভিড় চারদিকে। প্রকাশ সকলের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো। সদা যদি মিলিটারিতে নাম লিখিয়ে থাকে। সদার পক্ষে কিছুই বিচিত্র নয়।
–হটো, হটো, হট যাও–
কোথা থেকে মানুষের একটা ঢেউ এসে প্রকাশকে একেবারে অনেক দূরে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। যখন চমক ভাঙলো দেখলে কে একজন হোমরা-চোমরা মানুষ যাচ্ছে, তার জন্যেই এত সতর্কতা। যুদ্ধের সময় মানুষকে আর মানুষ বলেও মনে করে না কেউ। যেন সবাই গরু ভেড়ার সামিল।
হঠাৎ পায়ে কী একটা ঠেকতেই প্রকাশ চেয়ে দেখলে। মানিব্যাগের মতন ঠিক। জিনিসটা কুড়িয়ে তুলে নিতেই চারিদিকে চেয়ে দেখলে। কেউ দেখে ফেলেনি তো! তারপর সেটা পকেটে পুরে ফেলে একেবারে সোজা প্লাটফরমের বাইরে। কিন্তু সেখানে গিয়েও স্বস্তি পেলে না। ভেতরে কী আছে কে জানে? সেখান থেকে একেবারে মাসির বাড়িতে চলে এসেছে। সেখানে নিজের ঘরখানাতে ঢুকেই দেখলে একটা মেয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে।
বললে–তুই এখন যা বাপু এখেন থেকে, আমার কাজ আছে–
মেয়েটা চলে যেতেই প্রকাশ দরজা বন্ধ করে দিলে। একেবারে খিল বন্ধ। শালীদের কাউকে বিশ্বাস নেই।
মানি-ব্যাগটা খুলতেই হাত কাঁপতে লাগলো ঠক্ ঠক্ করে। হে মা কালী, হে মা জগদম্বা, তোমাকে আমি জোড়া-পাঁঠা বলি দিয়ে পূজো দেব মা। ভেতরে যেন টাকা থাকে মা।
হঠাৎ বাইরে থেকে মাসির গলা শোনা গেল–ওগো ছেলে, ও ভালোমানুষের ছেলে, বলি ভর সন্ধ্যেবেলায় দরজায় খিল দিলে কেন গা? আমার মেয়ে আছে নাকি ঘরে?
ব্যাগটার মধ্যে কিছু নেই। একেবারে ফাঁকা ব্যাগ। প্রকাশ রায়ের কপালটাই ফুটো। যেমন তার ফুটো কপাল, তেমনি ফুটো ব্যাগ!
প্রকাশ রায় তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিলে।
মাসি বললে–ওমা, তাই বলি! আমি ভাবলুম কাকে ঘরে ঢুকিয়ে তুমি বুঝি খিল দিয়েছ! খবর আছে। আমি বাতাসীর বাড়ি গিয়েছিলুম
–তাই নাকি? তা কী খবর? বড়বাবু রাজি হয়েছে?
মাসি বললে–তা তো হয়েছে। কিন্তু বড়বাবু বলেছে তোমার ভাগ্নের ছবি চায়। ছবি না হলে খুঁজে বার করবে কী করে?
প্রকাশ বললে–ছবি তো নেই আমার কাছে। কিন্তু চেহারা বলে দিতে পারি। লম্বা গড়ন, ফরসা গায়ের রং, টিকোলো নাক, চুলগুলো সব সময় উস্কোখুস্কো থাকে। বেশ ভাবুক-ভাবুক চেহারা।
মাসি সব শুনলো। বললে–ও-সব বললে তো চিনতে পারবে না, একটা ছবি হলে তাড়াতাড়ি ধরা যাবে, নইলে পুলিসের লোক, বুঝতেই পারছো তো, গা করবে না মোটে–
তারপর একটু থেমে বললে–আর টাকা! টাকার কথাটাও বলি। মোটা টাকা লাগবে কিন্তু
প্রকাশ বললে–আমি তো বলিইছি টাকা দেব। তা কত টাকা লাগবে মোট?
মাসি বললে–আগাম দিতে হবে কিছু তারপর বাকিটা তোমার ভাগ্নেকে পাওয়া গেলে তখন দিলেই চলবে–
প্রকাশ বললে–একশো টাকা এখন দিতে পারি আগাম। তাতে চলবে?
–একশো টাকা মাত্তোর?
মাসির প্রথমে অনিচ্ছে ছিল। তারপর বললে–তা দাও, এখন একশো টাকাই দাও, বাকি ন’শো কিন্তু হাতে হাতে শোধ করতে হবে।
–ন’শো! প্রকাশ রায় টাকার অঙ্কটা শুনে যেন চমকে উঠলো।
বললে–মোট এক হাজার? যুদ্ধের বাজার বলে দাম বাড়লো নাকি? একটু কমসম করে হয় না?
মাসি বললে–তুমি যে কী বলো বাবা তার ঠিক নেই! জিনিস-পত্তোরের দাম চারদিকে কী রকম আগুন হয়েছে তুমি দেখতে পাচ্ছো না? আগে আমার এই বাড়িতেই চার-আনা আট-আনার লোক বসিয়েছি, এখন পারি?
প্রকাশ বললে–আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। গরজ যখন আমার তখন আর টানাহ্যাঁচড়া করবো না, যা চাইছো তাই-ই দেব, আমার কাজ উদ্ধার হলেই হলো–
মাসি বললে–আর টাকাটা বড়বাবু তো নিজে নেবে না। বড়বাবু তেমন লোকই নয়। অমন মানুষ হয় না, তা জানো? নেহাৎ ভালোবাসার মেয়েমানুষ আবদার ধরেছে তাই রাজি হয়েছে। কিন্তু দলের লোকেরা তো আর ধম্ম করতে পুলিসের চাকরিতে ঢোকেনি, তারা ত নেবে! টাকাটা তাদের জন্যে
