প্রকাশমামার দৌড় সাধারণত ভাগলপুর আর রাণাঘাট পর্যন্ত। দেশে কালে-ভদ্রে কখনও গেছে, কিন্তু টাকা সেখানে নিয়ম করে পাঠিয়েছে বরাবর। ফুর্তিই করুক আর যা-ই করুক সমস্ত মনটা পড়ে থাকে তার ভাগলপুরে। জমিজমা তেমন নেই যে সেই চাষবাসের ওপর নির্ভর করে সংসার চলবে। বরাবর গলগ্রহ। ছোটবেলায় গলগ্রহ ছিল পিসেমশাইএর। বড়লোক পিসোমশাইএর বাড়িটাই ছিল বলতে গেলে তার নিজের বাড়ি। নিজের বাপ-মা মারা গিয়েছিল ছোট বয়েসে। সেই তখন থেকেই একসঙ্গে মানুষ হয়েছিল প্রীতি আর প্রকাশ।
যেন দুই ভাই বোন।
কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায় নিজে হাত-টান মানুষ। টাকা হাত দিয়ে বেশি গলতো না। তাই প্রকাশের তেমন পছন্দ হতো না পিসেমশাইকে।
একদিন প্রকাশ জিজ্ঞেস করেছিল–এত টাকা তোমার কে খাবে পিসেমশাই? তুমি মরে গেলে কার জন্যে টাকা রেখে যাবে?
পিসেমশাই বলতো–কেন, আমার যখন নাতি হবে সে খাবে–
পিসেমশাই-এর বিষয় বুদ্ধি দেখে প্রকাশ তখনই অবাক হয়ে গিয়েছিল। কবে পিসেমশাই-এর মেয়ের বিয়ে হবে, কবে আবার সেই মেয়ের ছেলে হবে তখনকার কথা ভেবে বুড়ো টাকা জমাচ্ছে। এরই নাম যাকে বলে দূরদৃষ্টি!
ও-সব দূরদৃষ্টি ফুরদৃষ্টির ধার ধারতো না প্রকাশ রায়। তার মত ছিল দিয়তাং ভূজ্যতাং। অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষ দু’দিনের জন্যে মাত্র আসে। সে-দুটো দিন কেটে গেলে সবাইকেই একদিন চোখ উল্টে চিৎপটাং হতে হবে। সুতরাং ফুর্তিই সকলের জীবনের একমাত্র সারবস্তু হওয়া উচিত। এই জীবনদর্শন নিয়ে প্রকাশ রায় পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিল আর এই জীবন-দর্শনে আস্থা রেখে সে জীবন-সমুদ্রে পাড়ি দিচ্ছিল। এর পর পিসেমশাই একদিন তার বিয়ে দিয়ে দিলে। পিসেমশাই ভেবেছিল বিয়ে দিয়ে দিলেই প্রকাশের দায়িত্বজ্ঞান ভূমিষ্ঠ হবে আর তখন টাকা উপার্জনের দিকে সে মনোযোগ দেবে। অর্থাৎ টাকার ওপর তার মায়া বসবে।
পিসেমশাইএর দূরদৃষ্টি এই প্রথমবারই বুঝি মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়েছিল। টাকার ওপর মায়া তো প্রকাশের বসেই নি, উল্টে টাকা ওড়াবার প্রবৃত্তিটাই ক্রমে ক্রমে প্রবল হয়ে উঠেছিল।
আসলে টাকাকে যারা অশ্রদ্ধা করে টাকাও বুঝি তাদের অশ্রদ্ধা করে। টাকার মূল্য যে বোঝে না টাকাও বুঝি তার মূল্য দেয় না। টাকার জগতের এমনই নীতি যে ভালোবাসার মানুষকে সে বুকে করে রাখে।
কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়ের বসতবাড়ির লাগোয়া একটা জায়গায় তিনি প্রকাশের জন্যে একটা ছোট বাড়ি করে দিলেন। বললেন–তুই তোর ঘর-সংসার ওইখানে পাত্, আমার ঘাড়ে আর কদ্দিন থাকবি?
কিন্তু ঘর-সংসার পাতবো বললেই পাতা যায় না। তার জন্যে রেস্ত লাগে। প্রকাশ রায়ের সেই জিনিসটিরই বড় অভাব ছিল বরাবর। এমন সময় প্রীতির বিয়ে হলো নবাবগঞ্জে। প্রকাশ বউ-ছেলে-মেয়ে ছেড়ে সেই যে দিদির কাছে গিয়ে রইল, সেখান থেকে আর এলো না। দিদিও ছাড়লে না তাকে। বললে–আর কিছুদিন থেকে যা তুই, তারপর একদিন গেলেই হবে। তোর তো সেখানে কোনও রাজকার্য নেই–
তখন থেকে প্রকাশ দিদির ফাই-ফরমাস খাটে আর সেই ফাই-ফরমাসের সুবাদে একবার রেলবাজার, একবার রাণাঘাট আর একবার কলকাতা করে বেড়ায়। কাজ কি দিদির কম!
এতগুলো জায়গার মধ্যে কলকাতার ওপরেই ছিল প্রকাশ রায়ের বেশি টান। যে কাজটা রেলবাজারেই সমাধা হয়ে যায় তার জন্যে প্রকাশ রায়ের কলকাতায় না গেলে চলে না। এই কলকাতায় কত রূপই না দেখেছে প্রকাশ। দিনের কলকাতা, সন্ধ্যের কলকাতা, রাত্রের কলকাতা ছাড়াও ঝগড়ার কলকাতা, মারামারির কলকাতা, ফুর্তির কলকাতা, টাকার কলকাতা আর সঙ্গে সঙ্গে প্রমোদের কলকাতা, বস্তির কলকাতা, অভাবের কলকাতা, দারিদ্র্যের কলকাতা, সমস্তই সে দেখেছে। তাই কলকাতা দেখতে তার আর বাকি নেই কিছু। তবু ফুরসৎ পেলেই প্রকাশ রায় কলকাতায় চলে আসে। দুতিন দিন এখানে কাটায়, তারপর আবার টাকার খ্যাঁচ পড়লেই নবাবগঞ্জে ফিরে যায়।
এবার প্রকাশ রায় এসেছিল একটা গভীর উদ্দেশ্য নিয়ে।
মাসি বলেছিল–বড়বাবুকে বলে যা করবার আমি করে দেব, তোমায় কিছু ভাবতে হবে না বাবা। সে দায় আমার ওপর ছেড়ে দাও তুমি–
প্রথম দু’দিন গায়ের ঘাম মারতেই কেটে গেল প্রকাশ রায়ের। কেবল পেট ভরে দু’বেলা পরোটা-মাংস খেতে লাগলো আর নেশার ঘোরে পড়ে-পড়ে ঘুমোতে লাগলো।
একদিন জিজ্ঞেস করলে–-কই মাসি, কিছু হলো?
মাসি বললে–অত তাড়া কীসের, এ কি তাড়াহুড়োর কাজ যে হুট বলতে করে দেব! বাতাসীকে বলেছি, বাতাসী আবার ফুরসৎ মত বড়বাবুকে বলবে
প্রকাশ বললে—এ-কথা বলতে ফুরসতের আবার কী দরকার? এ বলতে তো একমিনিটও লাগে না–
মাসি বললে–কী যে বলো তুমি তার ঠিক নেই। যে কাজের যা নিয়ম। বড়বাবুর মেজাজ কি সব দিন সমান থাকে, মেজাজ বুঝে তো কথা বলতে হবে। বড়বাবুর মাথায় হাজারটা ঝঞ্ঝাট। সে-সব ঝঞ্ঝাট ভুলতে বাতাসীর বাড়িতে আসে, আর এখানেও যদি ঝঞ্ঝাটের কথা ওঠে তো মানুষের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যাবে না? তাহলে মাগ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার কী দোষ করলো?
প্রকাশ রায় বললে–তা বটে—
মাসি বললে–বড়বাবুর কথা না হয় ছেড়েই দিলুম, এই তোমার কথাই ধরো না বাবা, তোমারও তো বাড়িতে মাগ-ছেলে-মেয়ে আছে, তবু তুমি মাসির বাড়িতে কেন আসো বলো? ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট ভোলবার জন্যেই তো। নইলে মিছিমিছি টাকা নষ্ট করতে কে চায় বলো? কিছু ফায়দা পাও বলেই তো মাসির বাড়িতে আসো। তোমাদের মতো ভালোমানুষের ছেলেদের পায়ের ধুলো পড়ে বলেই তো আমার মেয়েরা দুটো পেটে খেতে পায়। নইলে তোমাদের বাড়িতে কি পরোটা-মাংসের অভাব, না তোমাদের বাড়িতে খাওয়া জোটে না? তা তো নয়।
