নয়নতারা কী বলবে বুঝতে পারলে না। সে যেন বোবা হয়ে গেছে তখন।
–চুপ করে আছো যে, কথার জবাব দাও!
–কুয়োতলায় গিয়েছিলুম।
–কুয়োতলায় গিয়েছিলে? মিছে কথা বলতে তোমার লজ্জা হলো না? ছিঃ, এবাড়ির বউ হয়ে তোমার এই মতি? তুমি ভেবেছ আমি কিছু দেখিনি? আমি নিজের চোখে দেখলুম তুমি সদর দিয়ে ঢুকে বার বাড়ি হয়ে ভেতরে এলে আর বলছে কিনা তুমি কুয়োতলায় গিয়েছিলে?
নয়নতারা চুপ করে রইল।
কিন্তু শাশুড়ি ছাড়লে না। বললে–কী হলো? ভেবেছ চুপ করে থাকলেই সাতখুন মাফ হয়ে যাবে? ভেবেছ বোবার শত্রু নেই, না? কিন্তু এও তোমাকে বলে রাখি বউমা, এ বাড়ির বউ হয়ে এরকম উড়ুউড়ু স্বভাব আমি সহ্য করবো না। যদি এ বাড়ির নিয়মকানুন মেনে চলতে পারো তো ভালো আর তা যদি না মেনে চলতে পারো তো তার ফল খারাপ হবে–এই তোমায় বলে রাখছি–
নয়নতারা তখনও চুপ করে ছিল।
শাশুড়ি বললে–আমার কথা কানে ঢুকলো, না ঢুকলো না? ঢুকলো?
নয়নতারা ঘাড় নাড়লো। বললে—হ্যাঁ—
শাশুড়ি বললে–আর একটা কথা, তুমি যেখানে রাত কাটিয়ে এলে তাদের বলে দিও, আমাদের বাড়ির শাশুড়ি-বউতে যা কিছু হয় তা নিয়ে যদি অন্য কেউ মাথা ঘামায় তো তাদেরও আমি ছেড়ে কথা বলবো না। আমি সকলের হাঁড়ির খবর জানি। নতুন দু’টো পয়সার মুখ দেখেছে বলে যেন কেউ চৌধুরীদের সঙ্গে টেক্কা না দিতে আসে বুঝলে?–এখন যাও–
এতক্ষণ যা-কিছু হচ্ছিল সবই বেহারি পালের গিন্নীর কানে গেল। শোবার ঘর ছেড়ে বেহারি পালের বউ একেবারে বাগানের পাঁচিলের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কান পেতে ছিল।
কথাবার্তার শব্দে বেহারি পাল নিজেও এসে গিন্নীর পাশে দাঁড়ালো।
জিজ্ঞেস করলে–কে এসেছিল গো?
–ওদের বউ।
বেহারি পাল বললে–তা তো শুনেছি, আমি আমার ঘরে শুয়ে শুয়ে সব শুনেছি। তা ওদের বউ এত রাত্তিরে বাড়ি থেকে চলে এসেছিল কেন? শাশুড়ি-বউতে ঝগড়া হয়েছে নিশ্চয়ই!
গিন্নী বললে–সে-সব তো কিছু ভাঙলে না। ভয়ও তো আছে। যা গুণের শাশুড়ি–
বেহারি পাল বললে–ছেলে কি আর সাধে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে—
গিন্নী বললে–আহা, বউমার জন্যে বড় কষ্ট হয়, একেবারে কচি বয়স তো। নিজের মা’টা ছিল, তাও পট করে মারা গেল! একেই বলে কপাল!
বেহারি পাল বললে–কোনও পথ না পেয়ে বুঝি তোমার কাছে ছুটে এসেছে?
গিন্নী বললে–ওই শোন না, সেই জন্যেই তো শাশুড়ী মাগী খোঁটা দিচ্ছে। বলিহারি শাশুড়ির নজর। মাঝ রাতিরেও মাগীর চোখে ঘুম নেই, বউএর পেছনে লেগেছে
বেহারি পাল বললে–চলে এসো, তুমি চলে এসো, ওদের শাশুড়ি বউতে ঝগড়া, তাতে আমাদের কী? আমাদের নিজেদের ঝঞ্ঝাট কে সামলায় তার ঠিক নেই, আমরা ওদের নিয়ে ভেবে মরছি! ওদের ছেলে ওদের বউ, ওরাই সামলাক–
কিন্তু গিন্নী বললে–তা আমি কি ওদের বাড়ির কথা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি, আমি ভাবছি বউটার কথা, বউটা তো পরের বাড়ির মেয়ে, তার কেন মাঝখান থেকে এত ভোগান্তি!
বেহারি পাল বললে–তা দোষ তো ছেলেটার। ছেলেটাই বা বিয়ে করতে গেল কেন? যদি জানতোই যে তার বাপ-মা-ঠাকুর্দা এমন তো তা জেনে শুনেও কেউ বিয়ে করে?
গিন্নী বললে–তুমি ছেলেটারই দোষ দেখছো। ছেলেটা কী করবে? ছেলের বাপ-ঠাকুর্দা যদি অমন করে মিথ্যে স্তোক না দিত তো সে কি বিয়ে করতো? সে তো বিয়ের দিন গায়েহলুদের সময়ই বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তাকে তো জোর করে বেঁধে ধরে এনে বিয়ে করতে পাঠালে, তুমি তো সব দেখেছ–
খোলা আকাশের তলায় বাগানের ঝোপজঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল। আকাশ তখনও ভালো করে ফর্সা হয়নি। বেহারি পালেরও অনেক কাজ। পরের বাড়ির কেচ্ছা শুনলে তার পেট ভরবে না। তাদেরও সংসার আছে, সংসারের দায়-দায়িত্ব আছে। সব বাড়ির যা-যা আছে তাদেরও তো সবই আছে। বরং অনেক বেশি মাত্রাতেই আছে।
বললে–এসো, এসো চলে এসো তুমি। ভোর হয়ে আসছে
ও-বাড়ি থেকে তখন আর কোন আওয়াজই আসছে না। গিন্নীও আর দাঁড়ালে না। আস্তে আস্তে ঘরের দিকে চলে এলো।
বেহারি পাল বললেও নিয়ে আর ভেবো না তুমি।
গিন্নী বললে–আমি কি ভাবতুম! বউটা যদি রাততিরে আমাদের বাড়ি না আসতো আমিই কি ও নিয়ে মাথা ঘামাতুম মনে করেছ?
বেহারি পাল বললে–তা ভেবে আর তুমি কী-ই বা করবে? আমিও কিছু করতে পারবো না, তুমিও কিছু করতে পারবে না। শেষকালে মাঝখান থেকে আমাদের ওপর ওরা যত ঝাল ঝাড়বে।
গিন্নী বললে–তা যাক, আমরা কিছু নাই বা করতে পারলুম, মাথার ওপর ভগবান বলে তো একজন আছে। ভগবান তো সবই দেখছে। তার চোখ তো কেউ এড়াতে পারবে না–
আর ওদিকে চৌধুরী মশাই তখন জেগেই ছিলেন। গৃহিণী ঘরে আসতেই বললেন– কী হলো? বউমা এলো?
গৃহিণী বললে–হ্যাঁ এসেছে–
–তা কী বললে? বেহারি পালের বাড়িতে কেন গিয়েছিল এত রাত্তিরে তা কিছু বললে না?
প্রীতি বললে–বলবে আবার কী? আবার বলছে কি না কুয়োতলায় গিয়েছিল! ভেবেছে আমি কিছু টের পাইনি!
চৌধুরী মশাই বললেন–তা হলে তো দেখছি বউমা সোজা মেয়ে নয়।
প্রীতি বললে–তা আমিও কি সোজা মেয়ে? আমিও দেখাতে পারি কে কত সোজা আর কে কত ব্যাঁকা—
.
নবাবগঞ্জে যখন এই আধিপত্য আর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে, কলকাতা শহরে তখন আর এক ষড়যন্ত্রের জাল পাততে শুরু করছে প্রকাশমামা। কলকাতায় তখন যুদ্ধের আমল। যুদ্ধের আমল মানে লুঠের আমল। সে এমন এক আমল যখন আয় আর ব্যয়ের কোনও হিসেব নেই। জীবন আছে মৃত্যুও আছে তখন, কিন্তু জীবন-মৃত্যুর কোনও মূল্যায়ন নেই। অথচ এককালে যেমন এই শহর থেকে লোকে পালাতে ব্যস্ত ছিল তেমনি আবার এই শহরে তখন ফিরে আসতে পারার জন্যেও হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। বিহার-আসাম উড়িষ্যা-ঢাকা-চট্টগ্রাম থেমে ট্রেনে করে লোক আসছে তো আসছেই। সকলেরই এক কথা-কলকাতায় চলো। আসলে কলকাতা তখন সাউথ-ইষ্ট-এশিয়ার মিলিটারি হেডকোয়াটার্স। যুদ্ধের সব মাল সাপ্লাই হচ্ছে এই কলকাতা থেকে। টাকা কামাতে চাও এখানে এসো, আর টাকা ওড়াতে চাও তো তাও এখানেই এসো। ফুর্তি লুটতে চাও আর ফতুরই হতে চাও তো এখানেই তোমাকে আসতে হবে। এমন দরাজ শহর দুনিয়াতে আর কোথাও পাবে না। বাঁচি যদি তো কলকাতায় গিয়ে বাঁচবো, আর যদি মরি তো কলকাতাতে গিয়েই মরবো।
