–কিন্তু কেন বলো তো বউমা? তোমার কি একলা ঘরে শুতে ভয় করে?
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ বড্ড ভয় করে।
–তা সে কথাটা শাশুড়িকে বললেই পারো। তাহলে তোমার শাশুড়ি তোমার পাশে শুতো।
নয়নতারা বললে–শাশুড়িকে সেকথা বলতে আমার ভয় করে দিদিমা।
দিদিমা বললে–তা বটে, যার ছেলেই ওরকম বাপ-মার কাছে থাকতে পারলে না তো তার বউই বা থাকবে কী করে?
তারপর একটু থেমে বললে–তা হ্যাঁ বউমা, একটা কথা তোমায় জিজ্ঞেস করি– বলো তো সদা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেল কেন? তোমার সঙ্গে কি তার কিছু ঝগড়া হয়েছিল?
নয়নতারা বললে–দিদিমা, আপনি তো সব জানেন তাহলে আর জিজ্ঞেস করছেন কেন? আমার দিক থেকে আমি বলতে পারি সবই আমার কপালের দোষ। কপাল ছাড়া আর কাকে দোষ দেব বলুন?
দিদিমা বললে–গাঁয়ের লোক নানা রকম কথা বলছে কি না। ছাই ভস্ম মাথা-মুণ্ডু নানারকম কথা কানে আসছে। তোমার শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলে সে তো তোমার নামেই দোষ দিচ্ছে–
–আমার নামে! আমার নামে দোষ দিচ্ছেন আমার শাশুড়ি?
দিদিমা বললে–তা থাক গে, সে-সব কথা এখন থাক। ওসব তোমার এখন শুনে কাজ নেই–তুমি কি মনে করেছ তোমার শাশুড়ির কথা আমি বিশ্বাস করি? ও হলো গিয়ে ঝাড়-মিথ্যেবাদী। আমি তোমার বাবার কথাও বলি, কিছু মনে কোর না, তোমার বাবা কি আর পাত্র পেলেন না, এই চৌধুরীবাড়িতে তোমার মতন মেয়ের বিয়ে দিতে হয়? তোমার মত এমন যার রূপ তার কি পাত্তোরের অভাব?
তারপর নিজেই আবার সে-প্রসঙ্গ বদলে বললে–যাক গে, সেকথা এখন বলে লাভ নেই বউমা, এখন কী হয়েছিল তোমার তাই বলো, তোমার ক্ষিধে পেয়েছে? কিছু খাবে?
নয়নতারা বললে–না দিদিমা, এত রাত্তিরে কেউ খায়!
দিদিমা বললে–তাহলে? তাহলে তোমার জন্যে আমি কী করব তাই বলো?
নয়নতারা বললে–আমার জন্যে আপনার ঘুম হলো না। তাই ভেবেই আমার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমি কী করবো বলুন তো দিদিমা! রাত্তির হলেই আমার ও বাড়িতে বড্ড ভয় হয়। রাত হলেই ভয়ে আমার বুক দূর-দূর করে ওঠে
–কেন? রাত্তিরে অত কীসের ভয়?
নয়নতারা বললে–আচ্ছা দিদিমা, রাত্তিরে যদি রোজ আপনার কাছে এসে শুই তো আপনার আপত্তি আছে?
দিদিমা বললে–ওমা, সে কী কথা! তুমি ওদের বাড়ির বউ হয়ে আমাদের বাড়ি শুলে লোকেই বা কী বলবে আর তোমার শাশুড়িই বা তা করতে দেবে কেন? মিছিমিছি ভাববে আমি বুঝি তোমার কানে ভাঙচি দিয়েছি
বাইরে পশ্চিমপাড়ার দিক থেকে মুরগী ডেকে উঠতেই নয়নতারা জানালার বাইরের আকাশটার দিকে চেয়ে দেখলে। বললে–ভোর হয়ে এলো বুঝি দিদিমা! আকাশটার দিকে চেয়ে দেখুন তো?
দিদিমাও জানালার কাছে সরে গিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে বললে–সকাল এখনও হয়নি, এইবার হবো-হবো–
নয়নতারা এতক্ষণ বিছার ওপর গা এলিয়ে দিয়েছিল। এবার উঠে বসলো। বললে– এবার তাহলে যাই দিদিমা, এখন চলে না গেলে সবাই আবার জেনে ফেলবে–
দিদিমা বললে–চলো তোমাকে আমি এগিয়ে দিয়ে আসি, অন্ধকারের মধ্যে তুমি একলা যেতে পারবে না–
নয়নতারা তখন ভালো করে মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়েছে। যাবার জন্যে একেবারে তৈরি।
বাইরে বারান্দায় পা বাড়িয়েই বললে–আসি দিদিমা—
কিন্তু চেয়ে দেখলে দিদিমাও তার পেছনে পেছনে আসছে। বললে–আপনি আবার আসছেন কেন দিদিমা, আমি ঠিক যেতে পারবো।
যদি তোমাদের সদর দরজা বন্ধ থাকে? অন্ধকার রাস্তায় তুমি একলা যাবে?
কিন্তু বাইরের অন্ধকারের দিকে চেয়ে নয়নতারা বড় ভয় পেয়ে গেল। আসবার সময় ঝোঁকের মাথায় চলে এসেছিল। তখনও কোনও দিকে কিছু ভাবেনি। এখন ফেরবার সময় যেন গা ছমছম করতে লাগলো তার। হঠাৎ মনে পড়ে গেল এই সদরে ঢোকবার মুখে ডানদিকে চণ্ডীমণ্ডপের কাছেই কোথাও কালীগঞ্জের বউকে খুন করা হয়েছিল। কথাটা মনে পড়তেই পা দুটো যেন আরো ভারি ঠেকলো। পেছনে ফিরে চেয়ে বললে–দিদিমা আপনি যান, আমি এসে গেছি, দরজা খোলা আছে।
দিদিমা বললে–তুমি আগে ভেতরে ঢোকো বউমা, আমি দেখি তবে যাবো—
দিদিমা দাঁড়িয়ে দেখলে নয়নতারা বারবাড়ির উঠোনে ঢুকলো। তারপর আর দেখা গেল না। অন্ধকারে মিলিয়ে গেল বউমার চেহারাটা।
নয়নতারা আসবার সময় বারবাড়ির দরজাটা খুলে চলে এসেছিল। দরজাটা তখনও তেমনি খোলাই রয়েছে। ভেতরবাড়িতে ঢুকে আস্তে আস্তে দরজায় আবার খিল লাগিয়ে দিলে। এতটুকুও শব্দ হলো না। তারপর পা টিপে টিপে আবার তার নিজের ঘরের দিকে চলতে লাগলো। কিন্তু এমন করে আর ক’দিন চলবে? এমনি করে প্রত্যেক রাত্রে কি দিদিমার বাড়িতে গিয়ে রাত কাটাতে হবে নাকি তাকে?
কিন্তু নিজের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই যেন ভূত দেখে নয়নতারা চমকে উঠলো। মনে হলো তার ঘরের দরজা আগলে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে।
–কোথায় গিয়েছিল বউমা?
শাশুড়ির গলার শব্দটা নয়নতারার বুকে গিয়ে শেলের মত বিঁধলো।
–বলো কোথায় গিয়েছিলে?
নয়নতারা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। শাশুড়ির মুখের দিকে চাইতেও যেন তার ভয় করছিল। নয়নতারা কল্পনাও করতে পারেনি যে তার অনুপস্থিতিটা শাশুড়ির চোখে ধরা পড়বে। অথচ জানবার তো কথাও নয় কারো। যাবার সময় সে তো কোনও শব্দও করেনি। নিঃশব্দেই নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
–কই কথা বলছো না যে? দরজা হাট করে খুলে রেখে কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি, বলো? না বললে তোমায় ঘরে ঢুকতে দেব না। বলো?
