মাসি বললে–না বাবা, আজকে আমার একাদশী, আজকে আমার বিলিতি খেতে নেই, আমি দিশিই খাবো। তা আমার কথা ছেড়ে দাও। তুমি পরোটা না ভাত কী খাবে?
প্রকাশমামা বললে–ভাত-ফাত নয়, পরোটা। পরোটা আর পাঁঠার মাংস।
গিরিধারীকে সেই রকম অর্ডার দেওয়া হলো। বাড়ির অন্য মেয়েরাও পেসাদ পাবে। সুতরাং বেশি করেই আনতে হবে। মাসি হিসেব করে টাকা দিয়ে দিলে গিরিধারীকে।
প্রকাশমামা মাসিকে একান্তে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললে–তোমাকে একটা কাজ করতে হবে মাসি–
–কী কাজ?
–তোমার সেই বাতাসী! বাতাসী আছে?
–কেন, বাতাসীর ঘরে বসবে নাকি তুমি?
প্রকাশামামা বললে,–আরে তা কেন, সেই বড়বাবুর জন্যে বলছি। বড়বাবু আসে তো?
মাসি বললে–না বাবু, বড়বাবু এখন বাতাসীকে পাকাবাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে। এখানে বড় গোলমাল হচ্ছিল।
–কিন্তু বড়বাবুকে দিয়ে আমার যে একটা কাজ করাতে হবে!
–কী কাজ?
–আমার ভাগ্নেকে চেনো তো? সেই সেবার নিয়ে এসেছিলুম তোমার কাছে! সেই ভাগ্নেটা আমার হঠাৎ বাড়ি থেকে পালিয়েছে। বুঝলে? এদিকে নতুন বউ বাড়িতে রয়েছে, ওদিকে সেও পালিয়েছে। এখন তোমার বড়বাবু যদি একটু সাহায্য করে তা তাকে উদ্ধার করা যায়। ওরা তো ডিটেকটিভ পুলিস, বুঝলে না, ওদের অসাধ্যি কিছু নেই। তা আমি টাকা যা খরচ লাগে সব দেবো–
মাসি গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলে কত টাকা ছাড়বে?
প্রকাশমামা বললে–বড়বাবু যত চাইবে। টাকার জন্যে কিছু আটকাবে না।
ততক্ষণে গিরিধারী হোটেল থেকে পরোটা-মাংস-ডিম সব এনে হাজির করেছে।
মাসি বললে–ঠিক আছে, তুমি এখন খেয়ে-দেয়ে নাও, আজ রাত্তিরে তো আর কিছু হবে না, কাল সকালে যা হয় সব ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু আমার বখরা যেন ঠিক থাকে বাবা। দেখো–
প্রকাশমামা বললে–সে-সব নিয়ে তুমি ভেবো না—
.
সেদিনও রাত্রে নয়নতারা ঘুমোচ্ছিল। ক’দিন ক’রাত না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কখন অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। হঠাৎ মনে হলো কে যেন তার গায়ে হাত দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে নয়নতারা চীৎকার করে উঠেছে–কে? কে?
সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকা দিতেই হাতটা তার গা থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
নয়নতারা সামনের দিকে চোখ মেলে দেখতেই মানুষটা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু মানুষটাকে চিনতে দেরি হলো না নয়নতারার। রাত কত কে জানে! নয়নতারা উঠে বসলো। কিন্তু অন্যদিনের মত চেঁচিয়ে উঠলো না। আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠলো। ততক্ষণে সমস্ত ব্যাপারটা স্পষ্ট বুঝে নিয়েছে সে। তারপর নিজের শাড়িটা গুছিয়ে নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলে। মাথায় ঘোমটা টেনে দিলে। আজ এর একটা বিহিত না করলে চলবে না। রোজ রোজ এ আর সহ্য করা উচিত নয়।
বেহারি পালের বউ-এর সকাল-সকাল ঘুম আসে না। প্রথম রাতটা আড়ামোড়া খায়। কিছুতেই আর ঘুম আসতে চায় না। তারপর মাঝরাত থেকে একটু একটু হাই ওঠে।
সেদিন সবে ঘুম আসছিল এমন সময় হঠাৎ বাইরে থেকে কে যেন ডাকলে–দিদিমা, ও দিদিমা–
মিহি মেয়েলি গলা।
বেহারি পালের বউ-এর কেমন সন্দেহ হলো। এ যেন চেনা-চেনা গলা মনে হচ্ছে!
তাড়তাড়ি দরজাটা খুলে বাইরে আসতেই দেখে আগাগোড়া চাদরে ঢেকে কে যেন ঘোমটা দিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
–কে? বউমা?
নয়নতারা সামনে এল এবার। বললে–হ্যাঁ দিদিমা, আমি–
–একি? বউমা? তুমি এত রাত্তিরে?
নয়নতারা তখন হাঁপাচ্ছে। বেহারি পালের বউএর মনে হলো যেন নয়নতারা অনেক দূর থেকে দৌড়তে দৌড়তে তাদের বাড়িতে এসেছে।
নয়নতারা বললে–দিদিমা…
কিন্তু বলতে গিয়েও মনের কথাটা পুরো বলতে পারলে না। হাঁপাতে লাগলো।
দিদিমা বললে–কী হলো বউমা এত রাত্তিরে? তুমি এত হাঁপাচ্ছো কেন? তোমার শাশুড়ি কোথায়?
নয়নতারার মুখে তখনও কোনও কথা বেরোচ্ছে না। বেহারি পালের বউ সব দেখেশুনে বললে–তুমি ঘরের ভেতরে এসো বউমা। তুমি বড় হাঁফাচ্ছ। এসো এসো–
বলে নয়নতারাকে নিজের ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে বিছানার ওপর বসালে। তারপর হারিকেন জ্বেলে ভালো করে নয়নতারার মুখটা দেখলে। খুব ভয় পেলে মানুষের যেমন হয়, নয়নতারারও ঠিক তেমনি চেহারা হয়েছে তখন। জিজ্ঞেস করলে–এবারে বলো তো বউমা, কী হয়েছে তোমার? বাড়ি থেকে চলে এলে কেন? কেউ কিছু বলেছে?
নয়নতারা তবু কিছু বললে–না।
–শাশুড়ি জানে যে তুমি এখনে চলে এসেছ?
তবু নয়নতারার মুখে কোনও জবাব নেই। যেন একটা অজ্ঞাত ভয়ে নয়নতারা আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
–কী হলো? তোমার মুখে কোনও কথা নেই কেন?
এতক্ষণে নয়নতারার মুখে যেন একটু কথা বেরোল। বললে–আপনি যেন কাউকে বলবেন না দিদিমা যে আমি এখানে এসেছিলুম। কেউ যেন এ-কথা জানতে না পারে।
দিদিমা বললে–কিন্তু কাল সকালবেলা? কাল সকালে যদি তুমি এখানে থাকো তাহলে তো সবাই-ই জানতে পারবে, আমাকে আর কিছু বলতে হবে না তখন।
নয়নতারা বললে–কাল সকাল হবার আগেই আমি এখান থেকে চলে যাবো দিদিমা। আজ এই রাতটুকুই শুধু আপনার এখানে আমাকে একটু থাকতে দিন–
দিদিমা বললে–তা তো থাকতে দিচ্ছি, এখানে তোমাকে থাকতে দিতে তো আমার আপত্তি নেই। কিন্তু তোমার শাশুড়ি? তোমার শাশুড়ি তো লোক ভালো নয় বউমা। শাশুড়ি জানতে পারলে আর রক্ষে রাখবে ভেবেছ?
নয়নতারা বললে–আমার শাশুড়ি জানতে পারবে না দিদিমা। ভোর হবার আগেই আমি চলে যাবো। শুধু রাতটুকু আপনার এখেনে থাকতে দিন আমাকে
