.
কিন্তু সন্দেহটা দৃঢ় হলো আরো অনেক পরে। উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে ঘুরে আবার পূর্বদিকে ভেতর-বাড়িতে আসবার কথা। কাল এই সারা বাড়ি অতিথি-অভ্যাগতে ভরে উঠবে। গতকাল থেকেই ভিড় শুরু হয়েছে। মাঝখানে একটা দিন শুধু কালরাত্রি। তারপরেই ফুলশয্যা।
গৌরী পিসী হঠাৎ সদানন্দকে দেখতে পেয়েছে। বললে—হ্যাঁ রে, তুই এখানে, আর ওদিকে যে সবাই তোকে খুঁজছে বাবা! রাত-বিরেতে অন্ধকারে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন? গাব গাছের তলায় কী করছিলি?
ওদিকে দোতলায় ছেলে হরনারায়ণ কর্তাবাবুর কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
বাবাকে জিজ্ঞেস করলে–বৌমা কেমন দেখলেন?
কর্তাবাবু বললেন–ওসব কথা এখন থাক, তোমার নতুন বেয়াই-বেয়ানকে আনতে যাবে কে?
ছেলে বললে–প্রকাশকে বলেছি।
–প্রকাশ? প্রকাশ কে?
–আমার সম্বন্ধী।
–তোমার সম্বন্ধী! তোমার সম্বন্ধী আবার কবে হলো? তোমার তো সম্বন্ধী ছিল না, বৌমা তো বেয়াই-এর একই সন্তান!
–-আজ্ঞে, আমার আপন সম্বন্ধী নয়, আপনার বৌমার মামার ছেলে। আপনার বৌমার মামাতো ভাই—
–ও–
যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন কর্তাবাবু। ছেলের সম্বন্ধীর কথা শুনেই চমকে উঠেছিলেন। তা চমকে ওঠবারই কথা। এত ভেবে-চিন্তে তিনি ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন, মাত্র একটা উদ্দেশ্য নিয়েই। উদ্দেশ্যটা হলো বাড়িতে শুধু যেন বউই না আসে। তার সঙ্গে যেন রাজত্বও আসে। না, অর্ধেক রাজত্ব কথাটা ভুল। কর্তাবাবু যখন ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন, তখন এটা জেনেশুনেই দিয়েছিলেন যে ছেলে একদিন শ্বশুরের সমস্ত সম্পত্তি পাবে।
–চক্রবর্তী মশাই কখন আসছে?
–কাল সকালে আসবার কথা। রজব আলীকে বলেছি রেলবাজারে গাড়ি নিয়ে হাজির থাকতে–
ভাগলপুরে বউমার বাপের যে সম্পত্তি আছে তা কুড়িয়ে বাড়িয়ে পাঁচ-ছ’ লাখ টাকার মতন। তার ওপর কর্তাবাবুর নবাবগঞ্জের নিজের সম্পত্তি। একুনে সব মিলিয়ে আরো কয়েক লাখ। তিনি যখন এ সংসার থেকে বিদায় নেবেন তখন এই ভেবেই নিশ্চিন্ত হয়ে যাবেন যে তার বংশধারা আর তার বংশের ঐশ্বর্য যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ অক্ষয় অব্যয় অম্লান হয়ে বিরাজ করবে। তারপর যখন তার ছেলেও আর থাকবে না, তখন নাতি থাকবে। সেই নাতিই নরনারায়ণ চৌধুরীর বংশের জয়ধ্বজা চিরকাল আকাশে উঁচু করে তুলে রাখবে।
তা দোতলার একটা ঘরের মধ্যে পঙ্গু হয়ে পড়ে থাকলে কী হবে, তার নজর কিন্তু সব দিকে। একদিন এক জমিদার বাড়িতে সামান্য গোমস্তার কাজ করে প্রথম জীবন কাটিয়েছেন। তখন থেকেই বুঝেছেন কাকে বলে পয়সা। পয়সার যে কী মূল্য তা তখন থেকেই চিনতে শিখেছিলেন তিনি। তখনই বুঝেছিলেন যে প্রচুর পয়সার মালিক না হলে আর বেঁচে থেকে কোনও সুখ নেই। তাই তখন থেকেই পয়সার সাধনাতেই মন দিলেন তিনি। এমন করে মন দিলেন যে লোকে বুঝতে পারলো যে হ্যাঁ সাধক বটে। শেষে একদিন যখন সিদ্ধিলাভ করলেন তখনই পেছনে লাগলো শনি। অত পয়সা করেও তার শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। যখন পয়সার পাহাড়ের ওপর বসে আছেন, যখন আত্মীয়-স্বজন, পাইক লাঠিয়াল বরকন্দাজ নিয়ে নবাবগঞ্জের সকলের মাথায় উঠেছেন তখনও মনে শান্তি নেই। হঠাৎ বলা-নেই কওয়া-নেই, একদিন দীনু কাছে এসে দাঁড়ায়। তার মুখের চেহারা দেখেই কর্তাবাবু বুঝতে পারেন কী হয়েছে।
তবু জিজ্ঞেস করেন–কী রে, কী হয়েছে?
দীনু মুখ নিচু করে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলে–আজ্ঞে আবার কালীগঞ্জের বৌ এসেছে–
রেগে যেতেন কর্তাবাবু। গলা চড়িয়ে বলতেন–তা বলা-নেই কওয়া-নেই ওমনি হুট করে এলেই হলো? হঠাৎ আবার এলো কেন? আমি টাকা কোথায় পাবো? আমার কি টাকার গাছ আছে? আমি টাকার চাষ করি? আমি এখন কী করব? তুই গিয়ে কালীগঞ্জের বউকে বল এখন দেখা হবে না–আমার শরীর ভালো নেই–
দীনু বলতো–আজ্ঞে আমি যে বলেছি আপনি ভালো আছেন!
–কেন বললি ভালো আছি? আমি ভালো আছি না খারাপ আছি তুই জানলি কী করে? তুই কি আমায় জিজ্ঞেস করেছিলি?
বুড়ো মানুষ দীনু লোকটা। ফাইফরমাশ খাটাই তার কাজ। সে এত মতলব-ধান্দা ফন্দি ফিকির কিছু বোঝে না।
বললে–না আজ্ঞে, আপনাকে তা জিজ্ঞেস করিনি–
–তাহলে! তাহলে কী করে বুঝলি যে আমার শরীর ভালো আছে?
–আজ্ঞে আমার ভুল হয়েছিল। আমি সেই কথা গিয়ে বলে আসি যে আমার ভুল হয়েছিল। কর্তাবাবুর শরীর ভালো নেই। তার সঙ্গে এখন দেখা হবে না–
–হ্যাঁ, তাই বলে আয়।
দীনু চলে যাচ্ছিল। কর্তাবাবুর আবার কী মনে হলো। ডাকলেন। বললেন–দীনু, শোন্, ওকথা বলতে হবে না, তুই বরং তাকে ডেকেই নিয়ে আয়–
এমনি কতবার। কোথায় সেই ইছামতী পেরিয়ে কালীগঞ্জ। আর কোথায় এই নবাবগঞ্জ। পাকা প্রায় পঁচিশ ক্রোশ রাস্তা। তা মধ্যে আবার ইছামতী। কথায় বলে একা নদী বিশ ক্রোশ। এই এতখানি রাস্তা ঠেঙিয়ে আসতো সেই কালীগঞ্জের বৌ। আর এসেই সেই টাকা! টাকার তাগাদা। যেন কর্তাবাবুর কানে স্মরণ করিয়ে দিতে আসতো যে তুমি জমিদারই হও আর যে-ই হও আসলে তুমি আমার অনুগত কর্মচারী। আমার ভৃত্য।
আর সদা এসে ঠিক তখনই দাঁড়াত সেখানে। তখন খুব ছোট সে। পাশের সিন্দুকটা খুলতেই সে দেখতে পেতো ভেতরে কত সোনা, কত মোহর, কত টাকা, কত নোট! দেখতে দেখতে সেই ছোটবেলাতেই সদানন্দর চোখ দুটো পাথর হয়ে যেতো। যত লোক আসে দাদুর কাছে, তাদের সকলের যথাসর্বস্ব এনে ওইখানে ঢেলে দিত। সে সব জমা হয়ে ক্রমে ক্রমে দাদুর সিন্দুকের ভেতরে পাহাড় হয়ে যেত। আর দাদু তত বলতো আমার টাকা কোথায়? টাকা কোথায় আমার? আমার কি টাকার গাছ আছে? আমি কি টাকার চাষ করি?
