হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন মেয়ের খেয়াল হলো। বললে–ওরে, কাছাটা দেখলি নে? কাছাটার মধ্যে যদি টাকা থাকে!
ততক্ষণে লোকটা একটু এগিয়ে গিয়েছে। একজন মেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সামনে গিয়ে পথ আটকে ধরেছে। বললে–দেখি, তোমার কাছা দেখি–
পেছন-পেছন আরো সবাই বলা-নেই কওয়া নেই লোকটার কাছাটা টেনে খুলে দিয়েছে।
লোকটা চিৎকার করে উঠেছে–আরে করো কী, কাছা টানতে হবে না, আমি নিজেই দেখাচ্ছি–
কিন্তু এ-লাইনের মেয়েরা এত সহজে মুখের কথায় বিশ্বাস করে না। তারা কাছাটা খুলতেই দেখল কাছার মুড়োতে টাকা বাঁধা রয়েছে।
–এই তো টাকা রয়েছে! এতক্ষণ চালাকি হচ্ছিল?
লোকটা খপ করে টাকাটা ধরে ফেলেছে। কিছুতেই দেবে না টাকা। বললে–এ আমার টাকা নয় গো, এ পরের টাকা, ছাড়ো–ছাড়ো–
বলে মেয়েদের হাত ছাড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করলে।
মেয়েরা তখন পাড়া কাঁপিয়ে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে–ও মাসি, মাসি, এই দেখ পালিয়ে যাচ্ছে–
মাসি চিৎকার শুনে বাইরে এসে দাঁড়ালো–কী লা, কী হয়েছে ওখানে? কে পালাচ্ছে?
মেয়েরা বলে উঠলো-এই দেখ না মাসি, টাকা নেই বলে পালাচ্ছিল, এদিকে কাছায় টাকা লুকিয়ে রেখেছে
মাসি সামনে গিয়ে লোকটাকে ভালো করে দেখলে। তারপর মেয়েদের বললে–আরে, তোরা ওর কাছা ছাড়, কাছা ধরেছিস কেন? তুমি এসো বাবা, আমার মেয়েদের কথায় কিছু মনে কোর না, এসো, তোমার টাকা কেউ কেড়ে নেবে না, তোমার কোনও ভয় নেই, এসো এসো–
অনেক দিন পরে একটা খদ্দের এসেছে, মাসি তাকে সহজে হাতছাড়া করতে চাইলে না। আদর করে লোকটার হাত ধরে ডাকতে লাগলো। বললে–কিছু ভয় নেই বাবা তোমার, আমার সঙ্গে এসো–
লোকটা বললে–আমি ক্ষুদির বাড়ি যাচ্ছি, ওখানে আমার দলের লোকরা আছে–
–তা দলের লোকরা থাকলেই বা। ওরা ক্ষুদির বাড়িতে আছে থাকুক, তুমি আমার বাড়িতে থাকো। ক্ষুদির চেয়েও ভালো ভালো মেয়ে আছে আমার কাছে। তুমি আগে দেখই না, দেখতে দোষ কী বাছা? পছন্দ না-হয় ক্ষুদির কাছেই যেও। আর যদি পছন্দ হয় তো এখেনেই রাতটা থাকো। কাল সকালে আবার তোমার দলবলের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে–
কিন্তু এদিকে যখন এমনি টানাহ্যাঁচড়া চলেছে ওদিকে গলির মোড়ে তখন প্রকাশমামা ঢুকছে। অন্ধকার আশ-পাশ দেখে দেখে পা টিপে টিপে চলেছে। ট্রেনটা দেরি করে আসাতেই এই দুর্ঘটনা। নইলে, বিকেল বিকেল এলে এমন হতো না।
সামনে দিয়েই একটা লোক মাথা মুড়ি দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ কেমন সন্দেহ হলো প্রকাশমামার। সদানন্দ না! তাকে দেখে মাথায় মুড়ি দিয়েছে!
পেছন থেকে ডাকলে–এই সদা, সদা-সদা না?
ডাক শুনে লোকটা আরো জোরে পা চালিয়ে দিলে।
প্রকাশমামার সন্দেহটা আরো দৃঢ় হলো–এই সদা, সদা, আমি তোর প্রকাশমামা রে, সদা—
লোকটা তখন আরো জোরে অদৃশ্য হয়ে যেতে চাইছে। এবার প্রকাশমামা দৌড়তে লাগলো। তাকে দেখে বোধহয় পালাচ্ছে। লুকিয়ে লুকিয়ে এখানে এসেছিল। ভাবতে পারেনি যে মামা আবার তার পিছু ধাওয়া করবে!
লোকটাও যত জোরে যায় প্রকাশমামাও তত আরো জোরে যেতে লাগলো। শেষে দৌড়ে গিয়ে লোকটার চাদরটা চেপে ধরে ফেললে।
–কী রে, পালাচ্ছিস যে? এত ডাকছি তোকে মোটে শুনতে পাচ্ছিস না?
কিন্তু মুখটা কাছ দেখেই কেমন চটকা ভাঙলো। সদা নয়। অন্য লোক। এ-পাড়ায় এসেছিল বলে মাথায় চাদর মুড়ি দিয়ে বেরোচ্ছে। খানিক দূরে গিয়ে চাদর খুলে গায়ে জড়িয়ে নেবে।
ততক্ষণে চাদরটা ছেড়ে দিয়েছে প্রকাশমামা। বললে–কিছু মনে করবেন না দাদা, বড্ড ভুল হয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলুম আমার ভাগ্নে সদা–
বলে আর কথা বাড়ালে না প্রকাশমামা। ছি! ছি! লোকটা ভদ্রলোক বলে কিছু বললে না। অন্য ধরনের লোক হলে কেলেঙ্কারি কাণ্ড হয়ে যেত! সত্যিই তো সদা কেন এখানে আসতে যাবে? সে তো ভালো ছেলে। এমন সন্দেহ হলোই বা কেন তার? বোধহয় নেশাটার মাত্রা একটু বেশি হয়ে গেছে। ছিঃ–
তারপর মাসির বাড়ির সামনে আসতেই দেখে অবাক কাণ্ড!
এতক্ষণে মাসিও দেখতে পেয়েছে তাকে। মেয়েরাও দেখে ফেলেছে।
–ওমা, ভালো মানুষের ছেলে যে? তুমি কখন এলে বাবা? কী ভাগ্যি আমার, তবু মাসিকে মনে পড়লো এ্যাদ্দিন বাদে–
যে-লোকটা এতক্ষণ কাছা নিয়ে সামলাতে পারছিল না, সে এই সুযোগে ছাড়া পেয়ে বাঁচল। কাছা আঁটতে আটতে সে তার নিজের পথে চলে গেল। এতদিন পরে পুরোন খদ্দের এসে গেছে আর উটকো খদ্দেদের দরকার নেই। মাসির একগাল হাসি বেরোল ভালো মানুষের ছেলেকে দেখে।
বললে–এসো বাবা, এসো, তা খাওয়া-দাওয়া তো কিছু হয়নি তোমার? একেবারে ট্রেন থেকে নেমেই আসছো তো?
প্রকাশমামা গোড়াতেই পকেট থেকে পাঁচখানা দশ টাকার নোট বার করে ফেলে দিলে।
বললে–এই নাও, মাংস-ডিম-মাছ যা আনবার আনাও, মালও আনাও–তোমার কাছে একটা কাজের জন্যে এসেছি–
মাসি তখন টাকা পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সেটা আঁচলে বেঁধে ফেলেছে। খবর পেয়ে গিরিধারীও এসে গেছে। বাড়ির মেয়েরাও প্রকাশমামাকে দেখে কিলবিল করে উঠেছে। আর ভাবনা নেই। এবার হোটেল থেকে মাংস-ডিম-মাছ সব এসে যাবে। ব্ল্যাক-আউটের বাজারে খদ্দেরপাতি কিছু নেই। আজ অনেকদিন পরে কিছু ভালোমন্দ পেটে পড়বে তবু।
বললে–কী খাবে তুমি বলো বাবা–
প্রকাশমামা বললেও দিশি-ফিশি নয়, আজ বিলিতি খাবো। তুমিও তো বিলিতি খেতে ভালোবাসো।
