–তারপর?
রাধা বললে–তারপর আর কী! তারপর আর জানি না–
খবরটা শুনেই প্রকাশমামা সঙ্গে সঙ্গে উঠে চলে এসেছে নবাবগঞ্জে। এইরকম একবার কোথাও গিয়েছে আর নবাবগঞ্জে ফিরে এসেছে। চেষ্টার কসুর করেনি কিছু প্রকাশমামা। দিদি বলতো কী রে, খবর পেলি কিছু?
যেমন-যেমন খবর পেত প্রকাশমামা তেমনি-তেমনি এসে দিদির কাছে খবর দিয়ে যেত। আর টাকা নিয়ে যেত। রাধার কাছে খবরটা পেয়েই সোজা দিদির কাছে চলে এসেছিল।
দিদি বলতো–তাহলে বেঁচে আছে তো সে?
প্রকাশমামা বলতো–বেঁচে থাকবে না কোথায় যাবে শুনি? দেখবে আমি তাকে ঠিক খুঁজে বার করবো। ওদিকে রেলবাজারে পুলিসকে লাগিয়েছি, রাণাঘাটের পুলিসকে লাগিয়েছি। সকলকে টাকা খাইয়েছি কি মিছিমিছি? তা রাণাঘাটে একবার যখন তাকে দেখা গেছে তখন নিশ্চয়ই কলকাতায় গেছে সে–। এবার গিয়ে কলকাতার পুলিসকে গিয়ে টাকা খাইয়ে আসবো–
দিদি বলতো–তা কলকাতায় যাবে কী করে সে? তার কাছে কি টাকা আছে? টাকা পয়সা তার কাছে তো কিছুই নেই, ঘর থেকে এক কাপড়েই তো বেরিয়ে গেছে। একটা গামছা পর্যন্ত নিয়ে যায়নি সঙ্গে করে। রেলে উঠবে কী করে? টিকিটচেকাররা ধরবে না?
প্রকাশমামা বলতো–টিকিট? টিকিট কেউ কেনে ভেবেছ আজকাল? আমার মতন যারা বোকা-সোকা মানুষ তারাই কেবল টিকিট কেটে মরে। যুদ্ধের সময় এখন কে-ই বা টিকিট কাটছে আর কেই-ই বা টিকিট চাইছে! তা দাও, আরো শ পাঁচেক টাকা দাও দিকিনি, এবার কলকাতার পুলিসকে গিয়ে ধরতে হবে–
শুধু টাকাই বরাবর নিয়ে গেছে প্রকাশমামা, কিন্তু কাজের কাজ তখনও পর্যন্ত কিছুই হয়নি। সদানন্দও আর বাড়ি ফিরে আসেনি।
তা এবার প্রকাশমামা শ’ পাঁচেক টাকা পকেটে পুরে আবার কলকাতায় গিয়ে হাজির হলো। কলকাতা মানেই প্রকাশমামার কাছে স্বর্গ। টাকা থাকলে কলকাতা সকলের কাছেই স্বর্গ। তবে বিশেষ করে প্রকাশমামার কাছে ট্যাঁকে যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ কাকে ভয় করবো বলো? কেন ভয় করতে যাবো কাউকে? আমি কি তোমার চেয়ে কোনও অংশে ছোট হে?
প্রকাশমামা যখন রাধার বাড়িতে যায় তখনও যেমন বুক ফুলিয়ে ঢোকে এখানেও তেমনি। এই মাসির বাড়িতে। মাসি এখন বুড়ি হয়ে গেছে বটে, কিন্তু মাসি যখন বুড়ি ছিল, তখন থেকে প্রকাশমামা এ বাড়ির বাঁধা গাহেক। যখনই দিদির কাছে টাকা পেয়েছে তখনই সারা বাঙলাদেশের সব জায়গায় গিয়ে ফুর্তি উড়িয়েছে। প্রথমে ভাগলপুর থেকেই শুরু হয়েছিল ঘোড়দৌড়। তারপর যেখানেই এতটুকু ফুর্তির ছিটেফোঁটা গন্ধ পেয়েছে সেখানে গিয়েই ফুর্তির ঘোড়দৗর উড়িয়েছে প্রকাশমামা।
কলকাতায় তখন ব্ল্যাক-আউট চলছে। কালীঘাটের বাজারের পাশের গলিগুলোতে তখন তেমন আর জৌলুস নেই। বাড়িউলী মাসির খদ্ধের তখন আরও কমে গিয়েছে। চারিদিকে অন্ধকার। রাস্তার আলোগুলোর মুখ ঢাকা। কারোর মুখ যে ভালো করে দেখবে তার উপায় নেই। কদিন আগেই বোমা পড়ার সময় কলকাতা একেবারে ফাঁকা হয়ে গিয়ছিল। মাসির বড় দুর্ভাবনা হতো। খরচ-পত্তোর চলবে কী করে!
গলি দিয়ে কেউ তেমন লোক গেলে সবাই ছেঁকে ধরে।
মেয়েরা বলে–কোথায় যাচ্ছে গো? ওদিকে কোথায় যাচ্ছো?
লোকটা বলে–আমি আসছি, আমার কাজ আছে ওদিকে–
বোঝা গেল লোকটা একজন এ-পাড়ার কাঁচা খদ্দের। তখন আর ছাড়ন-ছোড়ন নেই। কেউ হাত ধরে টানে, কেউ জামা ধরে, কেউ বা কোঁচার খুট। লোকটাও আসবে না, মেয়েরাও ছাড়রে না। সেই অন্ধকার ফালি-গলির মধ্যে তখন টানাটানি পড়ে গেল। সন্ধ্যে থেকে কারো বউনি হয়নি তখনও। অনেকের কেরোসিন তেল কেনবার পয়সা পর্যন্ত জোটেনি। আর সেই সময় যদিই বা একটা খদ্দেরের মুখ দেখা গেল তো সে-ও কিনা হাতছাড়া হয়ে যাবে!
লোকটা বললে–-ছাড়ো ছাড়ো, ওগো ছাড়ো আমাকে–
মেয়েদের মধ্যে একজন বেশ ডাকাবুকো। সে বললে–কেন বাপু, ছাড়বো কেন তোমাকে? আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি? আমাদের ঘরে বসলে কি তুমি এঁটো হয়ে যাবে?
লোকটা বললে–আমার দলের লোক আছে ক্ষুদির বাড়িতে, আমি তাদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি–আমাকে ছাড়–একি, কাপড় ছাড়ো, আমাকে ন্যাংটো করে দেবে নাকি?
কথাটা শুনে একজন লোকটার কোঁচার খুঁটটা আরো জোরে টেনে ধরলে। বললে– তা ক্ষুদির চেয়ে কি আমরা খারাপ দেখতে? আমরা কি সুখ দিতে পারি না?
লোকটা আর পারলে না। জোর করে কোঁচাটা এঁটে ধরে বললে–আমার কাছে টাকা নেই, মাইরি বলছি টাকা নেই, টাকা-ফাঁকা সব ওদের কাছে আছে–আমাকে মিছিমিছি ধরছো তোমরা–
এ-সব যুক্তি মেয়েদের অনেক শোনা আছে। ঢোকবার ইচ্ছে না থাকলে এ-সব ধাপ্পা সকলেই দেয়। এসব কথা এ-পাড়ার মেয়েরা বিশ্বাস করে না।
বলে-দেখি, টাকা আছে কি না, পকেট দেখি—
বলে সবাই মিলে লোকটার জামার পকেট হাতড়াতে লাগলো–
লোকটা তখনও চেঁচাচ্ছে–বলছি আমার কাছে টাকা নেই, তবু শুনছে না, এ কি গেরো
একজন বলে উঠলো–তা টাকা না থাকুক, আট আনা পয়সাও নেই?
–না, আট না পয়সাও নেই—
–তাহলে চার আনা?
কিন্তু কারোর মুখের কথায় অত বিশ্বাস কী? ততক্ষণে জামার পকেট, কাপড়ের ট্যাঁক, সবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ফেলেছে সবাই। কোথাও টাকাকড়ি কিছু নেই।
এবার লোকটাকে সবাই হতাশ হয়ে ছেড়েই দিচ্ছিল। ইঁদুরই যদি ধরতে না পারলো তো তেমন বেড়াল পুষে লাভ কী?
লোকটা চলেই যাচ্ছিল। এতক্ষণে যেন লোকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচলো। সে যেদিকে যাচ্ছিল সেই দিকেই চলতে আরম্ভ করলো।
