প্রকাশমামা নাকি তখনও হঠাৎ এক-একদিন নবাবগঞ্জে এসে উদয় হতো। রেলবাজারের স্টেশন থেকে নেমে সাইকেল-রিকশা চড়ে এসে হাজির হতো।
নিতাই হালদারের দোকানে যারা বসে থাকত তারা জিজ্ঞেস করতো–কী গো শালাবাবু, সদার কোনও খোঁজখবর পেলেন?
প্রকাশমামা রিশার ওপর বসেই চিৎকার করে বলতো–আমার ভাই কথা বলবার এখন সময় নেই, পরে কথা হবে–
প্রকাশমামা বরাবরই ব্যস্তবাগীশ লোক। কোনও দিনই তার গল্প করবার সময় ছিল না। সদানন্দর বিয়ে দেওয়ার সময় তার তো নাইবার-খাবার সময়ই ছিল না। সেটা যদি বা মিটলো, তারপর সদানন্দকে পুলিসে ধরা। আর তারপর বাড়ি ছেড়ে সদানন্দর পালিয়ে যাওয়া। এক-একবার একটা কাণ্ড হয়েছে আর প্রকাশমামা লাল হয়ে উঠেছে। ক্রমে-ক্রমে তার জামা-কাপড়ের বাহার বেড়েছে। ভাগলপুরের বাড়িতে বউকে মনি-অর্ডার করে টাকা পাঠিয়েছে, আর রাণাঘাটের রাধার ঘরে গিয়ে বাবুয়ানির মেজাজ উড়িয়েছে। প্রকাশমামা রাধার ঘরে গেলে সেদিন উৎসব লেগে যেত। রাধার রান্নাঘর থেকে মাছ-মুরগী আর ইলিশ মাছের ভুরভুরে গন্ধ সমস্ত পাড়াটা মাত করে দিত। গন্ধ বেরোলেই পাড়ার মেয়েরা বুঝতে রাধার বাবু এসেছে–
সেদিন অনেক দিন পরে আবার ঘর থেকে মাংস রান্নার গন্ধ বেরোল।
এমনিতে রাধা ডালভাত-আলুভাতে খেয়েই দিন কাটিয়ে দেয়। কিন্তু প্রকাশমামার তাতে রুচি হয় না। বলে–ও কি খাওয়া! তার থেকে উপোস করে থাকা ভালো।
প্রকাশমামা খাবে তো কালিয়া-পোলাও খাবে আর তা যদি না পায় তো খাবেই না। যখনই রাধার বাড়িতে আসতো তখন একেবারে বাজার থেকে মুরগী কিম্বা পাঁঠার মাংস আলু পেঁয়াজ সব কিছু নিয়ে ঢুকতো।
সেদিনও বাড়ি ঢোকবার মুখেই প্রকাশমামা ডাকলে-রাধা, এই রাধা–
চেনা গলার ডাক পেয়েই রাধা ধড়মড় কর উঠে বসলো। তারপর পড়ি-কি-মরি করে উঠোনে এসে সদরের হুড়কো খুলে দিলে। প্রকাশমামা বললে–মাংস এনেছি, এক হাঁড়ি ভাত চড়িয়ে দে আর মাংসয় বেশ গরগরে ঝাল দিবি–ঝাল না হলে মুখে মাল একেবারে আলুলি ঠেকে–
বলে মাংসর থলিটা রাধার হাতে দিয়ে পা দুটো ধুয়ে নিয়ে ঘরে গিয়ে ঢুকলো। তারপর জামার পকেট থেকে বোতলটা বার করে রেখে গায়ের জামাটা খুলে ফেলল। তারপর আলনা থেকে রাধার একটা শাড়ি লুঙ্গির মতন করে পরে নিয়ে রাধার বিছানায় বাবু হয়ে বসলো।
একেবারে কায়েমী বন্দোবস্ত প্রকাশমামার। এইটেই তার বরাবরের নিয়ম। যে দু’এক দিন রাধার বাড়ি থাকবে ততদিন রাধার বাড়ি ছেড়ে আর কোথাও নড়বে না। ওই তক্তপোষের ওপর বসে সিগারেট টানতে টানতে মদ গিলবে আর কেবল চিৎপাত হয়ে ঘুমোবে।
রাধা রান্নাঘরে উনুনে আগুন দিয়ে দিয়েছে তখন। তারই ফাঁকে একবার এল। বললে– তা এতদিন পরে আমাকে বুঝি মনে পড়লো গা?
প্রকাশমামা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললে–আসতে যে পেরেছি এই তোর ভাগ্যি। বাড়িতে যে কেলেঙ্কারি কাণ্ড হয়েছে…
–কেলেঙ্কারি? আবার কি কেলেঙ্কারি কাণ্ড হলো?
প্রকাশমামা বললে–আমার সেই ভাগ্নেকে দেখেছিস তো? বেটা একেবারে আস্ত অপোগণ্ড। অত লাগসই মেয়ে দেখে বিয়ে দিলুম, তা বউ-এর সঙ্গে মোটে শোবে না–
–শোবে না মানে?
–শোবে না মানে শোবে না! কত রকমের বেকুব লোকই যে আছে সংসারে তাই ভাবি। বাপের অত টাকা। ঠাকুর্দা মারা যাবার পর তো সব তার বাবাই পেয়েছে। ঠাকুর্দার এক ছেলে। আবার আমার ভাগ্নেটাও ছিল বাপের এক ছেলে। তবু বলে বউ-এর সঙ্গে শোবে না
–কেন? বউ কি নষ্ট নাকি?
–আরে দূর, আমি নিজে দেখে সম্বন্ধ করে বিয়ে দিয়েছি, এখন সে-সব পুরোন কাসুন্দি থাক, ভাগ্নেটা আর এক কাণ্ড করে বসেছে। হঠাৎ বাড়ি থেকে পালিয়েছে–
রাধা চমকে উঠলো। বললো–পালিয়েছে মানে? তোমার ভাগ্নে তো আমার এখেনে এসেছিল!
–তোর এখেনে? তোর এখেনে আমার ভাগ্নে এসেছিল? কবে? কদ্দিন আগে?
প্রকাশমামা খবরটা শুনে একেবারে তক্তোপোষের ওপর লাফিয়ে উঠে বসেছে। বললে–তুই এতক্ষণে তো কিছু বলিসনি আমাকে? তা হঠাৎ তোর এখেনে আসতে গেল কেন?
রাধা বললে–সে কি নিজে এসেছে? তোমার ভাগ্নেকে তো আমি চিনি, সে কি আমার কাছে আসবার ছেলে? আমি বাজার করে রাস্তা দিয়ে আসছি দেখি তোমার ভাগ্নে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। মনে হলো ডাক্তারখানা থেকে বেরোচ্ছে
–তারপর?
রাধা বললে–আমি চিনতে পেরে ওকে জিজ্ঞেস করলাম মাথায় কী হয়েছে?
–তা কী বললে সে?
রাধা বললে–সে কথার জবাব দিলে না তোমার ভাগ্নে। জামা কাপড়ের চেহারা দেখে বুঝলুম একটা কিছু হয়েছে। তা জোর করে তাকে আমার বাড়িতে নিয়ে এলুম। বুঝলুম ক’দিন খায়নি কিছু। কাছে একটা পয়সাও নেই, তার দুর্দশার একশেষ। তোমার খবর জিজ্ঞেস করলুম, কিছুই বললে না সে।
–তারপর কোথায় গেল সে তাই বল্ না। আমি তো তাকে খুঁজতেই বেরিয়েছি।
রাধা বললে–কোথায় গেল তা কি সে আমায় বলে গেছে? আমার এ-ঘরে ঢুকতেই চায়নি প্রথমে। আমার সঙ্গে ভালো করে কথাই বলেনি। এমন ভাব দেখালে যেন আমাকে সে চেনেই না। কিন্তু আমি ছাড়িনি তবু। বাড়িতে এনে খাওয়ালুম দাওয়ালুম। বললুম এখেনে আরাম করে শোও। তা শুলো। আমি এই তক্তপোষটা ছেড়ে দিলুম তার শোবার জন্যে, আর আমি গিয়ে পাশের বাড়িতে শুলুম। কিন্তু ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘরের দরজা খোলা। কোথাও নেই সে। আমাকে না বলে কয়ে মাঝরাত্তিরেই চলে গেছে
