অথচ আগে শাশুড়ি কত আদর করতো তাকে। এ বাড়িতে এসে পর্যন্ত ওই শাশুড়ির কাছেই তখন যা-কিছু মনের কথা খুলে বলতে পারতো। যখন সেবার বাবা এসে তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল তখন তো সে ওই শাশুড়ির মুখের দিকে চেয়েই বাবার সঙ্গে যেতে রাজি হয়নি। কিন্তু এখন? এখন আর বাবা আসছে না কেন? এখন বাবাও কি তাকে ভুলে গেল?
হয়ত এমনিই হয়। হয়ত সব মেয়ের জীবনেই এমনি হয়। বিয়ে হয়ে যাবার পর সব বাবা-মাই হয়ত এমনি করে মেয়েকে ভুলে যায়। বলতে গেলে হয়ত কেবল মা’ই মেয়েকে মনে রাখে। সত্যি তার কপালটাই খারাপ! নইলে সেই মা-ই বা কেন চলে যাবে? মা যদি এখন বেঁচে থাকতো তো সে নিজেই মার কাছে চলে যেত। মা’কে গিয়ে বলতো–মা, এবার থেকে আমি আর শ্বশুরবাড়ি যাবো না, আমি এখন থেকে তোমার কাছেই থাকবো। তুমি আমায় থাকতে দেবে না?
মা হয়ত তবু সান্ত্বনা দিত তাকে। আদর করতো তাকে। মা হয়ত বলতো–তুই কিছু ভাবিসনি মা, ওরকম কত ছেলে বাড়ি থেকে রাগ করে চলে যায়, তারপর দেখেছি একদিন আবার ফিরে আসে। ও কিছু না, তুই কিছুদিন কষ্ট করে থাক, দেখবি সদানন্দ আবার একদিন তোর কাছে ফিরে আসবে
কিন্তু হঠাৎ চোখ দুটো ঘুমে ঢুলে আসতে লাগলো। কিন্তু দরজা খুলে রাখলে ঘুম আসবে কী করে?
নয়নতারা আর থাকতে পারলে না। তাড়াতাড়ি ঘরের দরজায় খিল তুলে দিয়ে বিছানার ওপর গিয়ে গা এলিয়ে দিলে। দিয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করলে। ঘুমে চোখ ঢুলে আসছে, কিন্তু তবু ঘুম আসছে না। বিছানার ওপর একবার এপাশ একবার ওপাশ করতে লাগলো। কিন্তু তবু কিছুতেই ঘুম এলো না। কেবল মনে হতে লাগলো তার ঘরের দরজা বন্ধ রয়েছে, যদি শাশুড়ী জানতে পারে! যদি বকে শাশুড়ি!
না, আর নয়, নয়নতারা তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে দরজার খিলটা খুলে দিয়ে যেন নিশ্চিন্ত হলো। না হোক ঘুম, ঘুম না হলে অবশ্য তার শরীর খারাপ হবে ঠিকই, কিন্তু তাকে নিয়ে তো সংসারে অশান্তির সৃষ্টি হবে না। তাকে কেন্দ্র করে সংসারে অশান্তি হবে এটাকেই নয়নতারার সব চেয়ে বেশি ভয়।
হঠাৎ শাশুড়ির কথায় ঘুম ভেঙে গেল নয়নতারার।
–বউমা, বলি তুমি নিজে গিয়ে চা খাবে, না তোমার মুখের কাছে এনে চায়ের বাটি ধরবো? তুমি যদি বলো তো তাও আনতে পারি। আনবো?
শাশুড়ির কথায় লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে গেল নয়নতারা। কখন যে চোখ দুটো জুড়ে ঘুম এসে গিয়েছিল তা তার খেয়াল ছিল না। চারদিকে রোদ উঠে গেছে। জানালা দিয়ে রোদ এসে ঘরের ভেতরটা একেবারে ভাসিয়ে দিয়েছে। এত দেরি পর্যন্ত তো কখনও ঘুমোয়নি সে! এ কী করে হলো! এ কেন হলো!
বাইরে এসে দাঁড়াতেই তার আগের রাত্রের সব ঘটনাগুলো মনে পড়তে লাগলো। দিনের আলোয় ঘটনাকে যেন স্বপ্ন বলে মনে হতে লাগলো। তবে কি স্বপ্ন দেখেছিল নাকি সে? তার ঘরে যে ঢুকেছিল সেও কি স্বপ্নের মানুষ? সেই ভয় পেয়ে শাশুড়ির ঘরের সামনে এসে ডাকা! সেই শাশুড়ির বকুনি! সবই স্বপ্ন নাকি তাহলে? নয়নতারা অনেকবার করে ঘটনাগুলোকে মনে করবার চেষ্টা করলে। স্বপ্নই যদি হবে তো সে এতক্ষণ ঘুমোল কী করে? শেষরাত্রের দিকে ঘুম এসেছিল বলেই তো এত বেলা পর্যন্ত সে ঘুমিয়েছে। বিছানায় যাবার সঙ্গে সঙ্গে যদি ঘুম আসতো তো সে কি এত বেলা করে ঘুম থেকে উঠতো!
সবাই যখন রান্না নিয়ে ব্যস্ত তখন নয়নতারাও রান্নাঘরের দরজার সামনে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। সবাই কাজ করছে। এ সময়ে সে যদি তার নিজের ঘরে গিয়ে বসে থাকে তাহলেও দোষ হবে তার। আবার শুধু যদি চুপচাপ দাঁড়িয়েও থাকে তাহলেও দোষ হবে।
শাশুড়ি হঠাৎ বলে উঠলো–তুমি আবার যাবার-আসবার পথের ওপর রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছো কেন শুনি? নিজের কাজও করবে না, কাউকে কাজও করতে দেবে না। হয় এখান থেকে সরে যাও না-হয় নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো, খাবার সময় তোমাকে ডেকে পাঠাবোখন। এখন সরো দিকিনি এখান থেকে, পথ ছাড়ো–
নয়নতারা কী করত বলা যায় না, কিন্তু তার আগেই চৌধুরী মশাই হঠাৎ ভেতরবাড়িতে এসে হাজির। তিনি কথা বলতে বলতে ঢুকছিলেন–ওরে গৌরী, কোথায় গেলি? চণ্ডীমণ্ডপে যে চা দিতে হবে, সব ভুলে গেলি নাকি?
নয়নতারা শ্বশুরকে দেখে মাথার ঘোমটাটা আর একটু মুখের ওপর টেনে দিয়ে নিজের ঘরে চলে এল। কিন্তু আবার সেই ঘর! তার নিজের ঘর। সেই ঘর আর বাইরের বারান্দা–এইটুকুই তার পরিক্রমার পরিধি। এইটুকুর মধ্যেই তাকে বন্দী হয়ে থাকতে হবে। এই বন্দিত্ব থেকে কি তার মুক্তি নেই।
.
সারা দেশ ঘুরে সদানন্দর তখন একটা বিশেষ উপলব্ধি হয়েছে। এই উপলব্ধি হয়েছে যে সমস্ত পৃথিবীটাই আসলে নবাবগঞ্জ। এই নবাবগঞ্জটাই যেন বড় আকার নিয়ে সমস্ত পৃথিবীতে রূপান্তরিত হয়েছে। আর আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে এই নবাবগঞ্জের চৌধুরী বংশটাই যেন ডালপালা ছড়িয়ে সারা পৃথিবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কর্তাবাবুর মত পৃথিবীতে হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ কর্তাবাবু ছড়িয়ে রয়েছে, এই চৌধুরী মশাই-এর মত হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ চৌধুরী মশাইও এই পৃথিবীতে চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু তারাই যেন ভেতরে ঢুকে সব কিছু তিলে তিলে ধ্বংশ করে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
এই চৌধুরীবাড়িও তেমনি করে তিলে তিলে নিঃশেষ হতে চলেছিল তখন। যেদিন সদানন্দর বিয়ে হলো সেইদিন বুঝি তা প্রথম প্রকাশ পেলে। তারও আগে থেকে হয়ত শুরু হয়েছিল, কিন্তু তখন কেউ তা টের পায়নি। ছাইচাপা আগুনের মত তা ভেতরে ভেতরে গুমরে মরছিল। কিন্তু প্রথম ধোঁয়া দেখা গেল বোধহয় সেই সদানন্দর বিয়েকে উপলক্ষ করে। তার পর থেকেই যা শুরু হলো তা সদানন্দ নবাবগঞ্জের লোকের কাছে শুনেছে।
