বেহারি পালের বউ-এর তখন ঘুমে চোখ ঢুলছে। গান শুনে এসে শুতে পারলে বাঁচে। বললে–কী?
–কাকে এনেছি দেখ। চৌধুরী মশাই-এর ছেলে সদানন্দ।
বউ-এর যেন বিশ্বাস হলো না। বললে–বলছো কী? আমাদের সদানন্দ? এতদিন কোথায় ছিল সে?
বেহারি পাল বললে– চৌধুরী মশাই-এর কাছে গিয়েছিল, ছেলেকে নাকি চৌধুরী মশাই বাড়িতে ঢুকতেই দেয়নি, তাড়িয়ে দিয়েছে দূর করে। তাই আর কোথায় যাবে, তাকে আমাদের বাড়িতে ডেকে এনেছি–
বেহারি পালের বাড়িতে ঘর-দোরের অভাব নেই আর আগেকার মতন। এখন যুদ্ধের কল্যাণে ব্যবসাও আরো ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। আরো টাকাপয়সা হয়েছে। বেহারি পালের বউ বাইরে বেরিয়ে এল। বলল-কই কোথায় সদানন্দ, দেখি–
সদানন্দর মুখে সেই খোঁচা-খোঁচা দাড়িগোঁফ। ময়লা পাঞ্জাবি, ছেঁড়া চটি কিন্তু হাসি মুখ।
বেহারি পালের বউ বললে–এতদিন কোথায় ছিলে বাবা তুমি? সে-ই তুমি এলে, আর কিছু দিন আগে আসতে পারলে না, তাহলে আর নয়নতারার এমন করে সর্বনাশ হতো না—আহা–
সদানন্দ কিন্তু নির্বিকার। সে তখন হাসছে।
বেহারি পালের মনে পড়তে লাগলো সেই ঘটনাটা। নয়নতারাই পরে বলেছিল। শাশুড়ি যেমন বলেছিল তেমনি করে দরজা খুলে রেখেই শুয়েছিল নয়নতারা। তারপর হয়ত একটু তন্দ্রাও এসেছিল। জানালা দিয়ে আকাশের জ্যোৎস্না এসে পড়েছিল বিছানার ওপর।
হঠাৎ যেন একটা কীসের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তার। ঘুমটা ভাঙতেই দেখলে কে যেন একেবারে বিছানার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কে? কে?
নয়নতারা যেন স্পষ্ট দেখতে পেল মানুষটাকে। চিনতে পারলে। এক মুহূর্তে নয়নতারা নিজের কাপড়টা সামলে নিয়ে উঠে বসেছে। না, স্বপ্ন তো নয়, সত্যিই তো সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মানুষটাকে–
নয়নতারা আর থাকতে পারলে না। চিৎকার করে উঠলো–মা–মা–মা–
নয়নতারার সমস্ত শরীরটা তখন ঘামে ভিজে উঠেছে। তার চিৎকারে ঘরটা আবার ফাঁকা। মনে আছে অনেক রাত্রে শাশুড়ি এসে তার পাশে শুয়ে পড়েছিল। তার পরে কখন সে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর কিছুই খেয়াল ছিল না তার। কিন্তু যে মানুষটা তার ঘরে এসেছিল সে তখন উধাও। নয়নতারা বিছানা ছেড়ে উঠলো। তারপর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে চারদিক দেখলে। কেউ কোথাও নেই। তাহলে কে তার ঘরে ঢুকেছিল?
সমস্ত বাড়িটা অন্ধকার। তাড়াতাড়ি শাশুড়ির ঘরের সামনে এসে আবার ডাকতে লাগলো–মা, মা–দরজাটা একটু খুলুন–
কিন্তু ভেতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
কিন্তু শাশুড়িকে না ডেকে অন্য কী উপায়ই বা আছে তার? অথচ রাত্রে ডাকলে হয়ত শাশুড়ি রাগ করবে।
নয়নতারা আবার ডাকলে–মা, ওমা–
এতেও যখন সাড়া পাওয়া গেল না তখন দরজায় ধাক্কা দিতে হলো। হয়ত মা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। সারাদিনের ঝঞ্ঝাটের পর ঘুমে অচৈতন্য হয়ে আছে।
–মা, মা, ওমা এবার সাড়া পাওয়া গেল। দরজার খিল খুলে শাশুড়ি বাইরে বেরিয়ে এল। বললে– কে? বউমা? কী হলো?
নয়নতারা বললে–আমার খুব ভয় পাচ্ছে—
শাশুড়ি ব্যাপার শুনে রেগে উঠলো–সবই কি তোমার ঢং বউমা? তোমার ভয় পাচ্ছে। তো আমি কি করবো? তোমার ভয় পাচ্ছে তো এ-কথাটা বলবার জন্যে এই ভর-দুপুর রাতে আমার ঘুম না ভাঙালে তোমার চলতো না? কাল সকালে বললে তোমার মহাভারত এমন কী অশুদ্ধ হয়ে যেত শুনি?
নয়নতারা বললে–আমার খুব ভয় করছিল মা, মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমার ঘরে ঢুকেছে–
–তুমি আর ঢং কোর না বউমা, তোমার ঘরে কে ঢুকতে যাবে শুনি? কার এত দায় পড়েছে যে এত রাত্তিরে না ঘুমিয়ে তোমার ঘরে ঢুকতে যাবে?
নয়নতারা বললে–চোর-ডাকাত কত কী থাকতে পারে তো! আপনি আমাকে দরজা খুলে রেখে শুতে বলেছিলেন তাই বলছি। আপনি তো আমার পাশেই শুয়েছিলেন, কখন উঠে গেলেন আমি টের পাইনি—
শাশুড়ি বললে–তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে আমি চলে এসেছি। আমার যে আবার নিজের বিছানা ছাড়া অন্য কারো বিছানায় ঘুম আসতে চায় না। আর চোর-ডাকাতের কথা বলছো, তা চোর-ডাকাতের আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই তোমার ঘরে তারা ঢুকতে যাচ্ছে! তোমার সোনা-দানা সব তো আমার সিন্দুকের মধ্যে! তোমার ঘরে ঢুকে ডাকাতরা কী নেবে শুনি?
–কিন্তু মা, আমি কাল থেকে রাত্তিরে দরজায় খিল দিয়ে শোব।
শাশুড়ি বললে–কালকের কথা কালকে হবে। ও-সব কথা রাতদুপুরে বলে কী হবে? তার চেয়ে আমাকে এখন একটু ঘুমোতে দাও–। তুমি তো সারাদিন ঘুমিয়েই কাটাও, আমি সারাদিন গতরে খেটে রাততিরটুকু যে একটু ঘুমোব তোমার জ্বালায় কি তারও যো নেই–
বলে আর সেখানে দাঁড়ালো না শাশুড়ি। নয়নতারার মুখের ওপরে দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঘুমোতে গেল।
নয়নতারা সেখানে সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কী করবে বুঝতে পারলে না। ঘরে গিয়ে সে ঘুমোবে কেমন করে? ভাবলে হারিকেনটা জ্বালিয়ে রাখলে হয়। কিন্তু এ বাড়িতে এতদিন এসেছে, হারিকেন কোথায় থাকে তাও তো সে জানে না।
আস্তে আস্তে সে আবার নিজের ঘরে গেল। নিজের ঘরের খোলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। চারিদিকে কেউ কোথাও নেই। বড় ভয় করতে লাগলো তার। কিন্তু এমন করে সমস্ত রাত একা-একলা সে জেগে থাকবে কী করে? না-ঘুমিয়ে কত দিন কাটাবে? দূরে বারোয়ারিতলায় বোধ হয় যাত্রার রিহার্সাল চলছে। কিছু কিছু গানবাজনার অস্পষ্ট সুর কানে ভেসে আসছে। এখন একজন কারো সঙ্গে কথা বলতে পারলে ভালো লাগতো। দিদিমা যদি আসতো এ-সময় তো খুব ভালো হতো। ওই একটা লোক। ওই একটা লোকের কাছেই তবু মনের কথা খুলে বলা যায়। আর এখানকার অন্য সবাই-ই যেন তার পর!
