বেহারি পালের বউ সবই জানতো। তার কাছে কিছু লুকোন চলতো না। বলতো তুমি মিছে কথা বলছো, বউমা, আমি সব দেখেছি, তোমার খাওয়াই হয়নি আজকে–
নয়নতারা অবাক হয়ে যেত বেহারি পালের বউ-এর মুখের দিকে চেয়ে। তারপর আর কিছু করতে না পেরে তার কোলে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলতো।
কাঁদতে কাঁদতে বলতো–আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করে না দিদিমা–কিছু ভালো লাগে না। ওরা একটু দূরে সরে গেলেই আমি ভাতগুলো জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিই, কুকুরে এসে সব খেয়ে যায়।
বেহারি পালের বউ বলতো–খাবে কী বউমা, ক্ষিধে হবে কেন? তোমাকে কী খেতে দেয় তোমার শাশুড়ি তা তো আমার দেখতে বাকি নেই, ওই ডাল আর ভাত কেউ খেতে পারে?
তারপর আঁচলের ভেতর থেকে দিদিমা কতদিন খাবার বার করতো। কোনও দিন মাছ ভাজা, কোনও দিন পোস্তর বড়া। এমনি সব কত কী খাবার! বাড়িতে যা রান্না হতো সব বেছে বেছে আঁচলের আড়ালে লুকিয়ে এনে নয়নতারাকে খাওয়াতো।
বেহারি পালের বউ-এর কাছে নয়নতারা নিজের মনটা উজাড় করে ঢেলে দিত। বলতো–এ রকম কেন হলো দিদিমা? আপনি তো গোড়া থেকেই সব দেখে আসছেন, আমি কী এমন দোষ করেছি যে আমাকে শাশুড়ি মোটে দেখতে পারেন না–
দিদিমা বলতো–তোমার শাশুড়ি কি মানুষটা ভালো যে তোমাকে দেখতে পারবে বউমা?
নয়নতারা বলতো–কিন্তু আগে তো এমন ছিলেন না। আগে আমাকে কত আদর করতেন, তা তো আপনার দেখেছেন–
–ছাই আদর করতো, ছাই! ও এক নম্বরের বদমাইশ মেয়েমানুষ! আমি তোমার শাশুড়িকে চিনি না বলতে চাও?
–কিন্তু আমি তো শাশুড়িকে বরাবর ভক্তি শ্রদ্ধা করে এসেছি দিদিমা! আমি তো আমার দিক থেকে কোনও দোষ করিনি। আমার নিজের মা নেই, তাই বরাবর শাশুড়িকেই আমি আমার মা বলে মনে করেছি। আমার কি দোষ আপনিই বলুন?
বেহারি পালের বউ বলতো দোষ তোমার নয় তো কার বউমা? দোষ তো সব তোমারই
–আমার দোষ? কেন?
–তা তোমাকে কেন শাশুড়ি আদর-যত্ন করবে? তুমি শ্বশুর-শাশুড়ির কোনও উপকারে এসেছ? তুমি তোমার সোয়ামীকে ঘরে আটকে রাখতে পেরেছ? সোয়ামী না থাকলে মেয়েমানুষের আবার খাতির-যত্ন কী? কথায় বলে সোয়ামী নেই যার সে ঘরের বার। সোয়ামী-পুত কিছুই নেই তোমার, কে তোমাকে ভালোবাসবে বউমা? তুমি কি তোমার শাশুড়ির কোলে একটা নাতি তুলে দিতে পেরেছ?
নিজের অক্ষমতায় নিজের অসার্থকতায় নয়নতারা আরো ভেঙে পড়তো। বলতো আপনি তো সব জানেন দিদিমা, আপনি জেনেশুনে তবু এই কথা কেন বলছেন?
এসব কথা বেশিক্ষণ হতো না। বাইরে কারো পায়ের আওয়াজ হলেই বেহারি পালের বউ তাড়াতাড়ি উঠে যেত। যাবার আগে বলতো–আমি আসি বউমা, পরে আবার এক সময়ে আসবোখন, তোমার শাশুড়ি মাগী দেখতে পেলে আবার অনর্থ বাধাবে—যাই–
কিন্তু বাইরে গিয়ে শাশুড়ির কাছে বেহারি পালের বউ আবার অন্য মানুষ। শাশুড়ি বলতো-এসো এসো মাসিমা, কী রাঁধলে আজকে?
এটা-ওটা কথা হবার পর বেহারি পালের বউ জিজ্ঞেস করতো তোমার বউমা কোথায় বউ, বউমাকে যে দেখছিনে?
শাশুড়ি বলতো–বউমা আর কোথায় থাকবে, নিজের ঘরেই ঘুমোচ্ছে, ঘুম ছাড়া তো বউমার আর কোনও কাজ নেই–
এমনি করেই চলছিল নয়নতারার জীবন। যেদিন প্রথম বউ হয়ে এ বাড়িতে এসেছিল তখন একরকম, আবার যখন সদানন্দ বাড়ি থেকে চলে গেল তখন একেবারে অন্যরকম। কর্তাবাবু মারা যাবার পর থেকেই যেন একেবারে এ বাড়ির জীবনযাত্রা অন্য দিকে মোড় ফিরলো।
সেদিন হঠাৎ শাশুড়ি বললে–বউমা, আজ রাত্তিরে ঘরের দরজায় খিল দিয়ে শুয়ো না, দরজা খুলে শুয়ো–বুঝলে?
কথাটা ঠিক বুঝতে পারলে না নয়নতারা। বললে–দরজা খুলে শোব?
শাশুড়ি গম্ভীর মুখে বললে—হ্যাঁ–
নয়নতারা তবু বুঝতে পারলে না। জিজ্ঞেস করলে–কেন মা? দরজা খুলে যোব কেন?
শাশুড়ী বললে–যা বলছি তাই কোর, তর্ক কোর না—
কিন্তু আপনিই তো আগে আমাকে রোজ দরজা বন্ধ করে খিল দিয়ে শুতে বলতেন?
শাশুড়ি তেমনি সুরেই বললে–আগে যা বলতুম বলতুম, আজ তুমি দরজা খুলে শোবে।
তবু কেমন যেন খটকা লাগলো নয়নতারার মনে। হঠাৎ শাশুড়ি তাকে দরজা খুলে শুতে বলছে কেন?
বললে–আপনি বুঝি আজ রাত্তিরে আমার ঘরে শোবেন?
শাশুড়ি এতক্ষণে রেগে গেল। বললে–তুমি তো দেখছি খুব বেয়াদব মেয়ে বউমা। আমি তোমার ঘরে শুই না-শুই তাতে তোমার কী? আমি যা বলছি তাই করবে–যাও এখন–
এসব কথা বেহারি পাল জানে। বেহারি পালের বউও জানে। আর শুধু বেহারি পালের বউই নয়, ওই নিতাই হালদার, কেদার গোবর্ধন যারা বারোয়ারিতলায় নিতাই হালদারের দোকানের সামনের মাচায় বসে তাস খেলে তারাও জানে। যেসব মেয়েরা নদীতে চান করতে যায় আর এবাড়ির ও-বাড়ির গল্প করে তারাও জানে। এককালে নবাবগঞ্জের চৌধুরীবাড়ির নতুন বউ নয়নতারাকে নিয়ে কত হইচই বেধে গিয়েছিল কত কানাঘুষো চলেছিল। কালের খরস্রোতে সে-সব প্রসঙ্গ প্রায় ভেসে গিয়েছে এখন। কিন্তু এতদিন পরে সেই সদানন্দকে দেখে আবার যেন সব মনে পড়তে লাগলো তাদের।
গান তখনও পুরোদমে চলেছে :
আর নারীরে করিনে প্রত্যয়।
নারীর নাইকো কিছু ধর্মময় ॥
নারীর মিলতে যেমন ভুলতে তেমন,
দুই দিকে তৎপর।
মজিয়ে পরে চায় না ফিরে
আপনি হয় অন্তর।
বেহারি পালও গান শুনছিল। বলতে গেলে বেহারি পালই বেশি চাঁদা দিয়েছিল গানের জন্যে। নবাবগঞ্জের মাথা এখন বেহারি পাল। অনেক রাত্রে বাড়ি ফিরে গৃহিণীকে ডাকলে, ওগো শুনছো–
