নয়নতারা তখন স্নান করে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে ভিজে চুল শুকোচ্ছে।
হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে শাশুড়ি দৌড়ে এল কুয়োতলায়। বললে–বউমা তুমি কি কালা? কানে কালা হয়েছ নাকি তুমি?
নয়নতারা বললে––কেন মা? কি হয়েছে?
–তুমি আবার বলছো কী হয়েছে। আমি যে এদিকে তোমাকে ডেকে ডেকে গলা ফাটিয়ে ফেলছি তা তো তোমার কানে যায় না বাছা। না তুমি ভাবছো শাশুড়ি ডেকে ডেকে মরুক গে, আগে চুল তো শুকোই।
নয়নতারা সঙ্কোচে জড়োসড়ো হয়ে বললে–কিন্তু আমি তো শুনতে পাইনি মা–
শাশুড়ি বললে–তা শুনতে পাবে কেন? শুনলে যে গেরস্তের সংসারের সাশ্রয় হবে। সংসার পুড়ে যাক ঝুড়ে যাক তাতে তোমার কী? তোমাকে তো আর গতরে খেটে পয়সা উপায় করতে হয় না? যাকে পয়সা উপায় করতে হয় সে বুঝবে। বলি উনুনে যে দুধ পুড়ে যাচ্ছে সেই দুধপোড়া গন্ধও তো মানুষের নাকে আসে! তোমাকে দিয়ে কি বাছা আমার সংসারের কোনও কাজটাই হবে না বউমা, শুধু গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াবার জন্যেই তোমাকে বউ করে বাড়িতে এনেছি? তবু বুঝতুম যদি নিজের স্বামীকে বাড়িতে আটকে রাখতে পারতে–
বলতে বলতে শাশুড়ি যেমন এসেছিল তেমনি আবার গরগর করে রান্নাবাড়ির দিকে চলে গেল।
নয়নতারাও শাশুড়ির পেছন পেছন রান্নাবাড়ির ভেতরে এসে দাঁড়ালো। দেখলে এক কড়া দুধ উনুনে জ্বাল দেওয়া হচ্ছিল, কারোর নজর ছিল না সেদিকে। সবাই সংসারের যে যার কাজে ব্যস্ত। তারই মধ্যে সমস্ত দুধটা কখন পুড়ে একেবারে চাঁছি হয়ে গেছে। এতখানি লোকসানের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সে যে কী করবে বুঝতে পারছিল না। গৌরী পিসীর মুখেও তখন কথা নেই। বিষ্টুর মাও দুর্ঘটনার আকস্মিকতায় একেবারে বোবা হয়ে গেছে। সবাই মিলে তখন রান্নায় হাত লাগিয়েছে। এই অবস্থায় নয়নতারার যেন নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছিল।
হঠাৎ শাশুড়ির কথায় যেন তার চমক ভাঙলো। শাশুড়ি বললে–তুমি আবার ঠুঁটো জগন্নাথের মতন ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলে কেন শুনি? তোমার ঘর আছে, তুমি ঘরে যাও না, ঘরে গিয়ে পটের বিবি সেজে শুয়ে থাকো না গিয়ে, খাবার হলে তোমাকে ডাকবোখন, দয়া করে তখন খেয়ে নিয়ে আমার হেঁসেল মুক্ত করে দিও, যাও–
নয়নতারা সেইখানে দাঁড়িয়ে শাশুড়ির সমস্ত কথাগুলো শুনলো। তারপর আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে না। সোজা নিজের ঘরে গিয়ে বিছানার বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লো।
শুয়ে পড়ে কখন যে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিল তার খেয়াল ছিল না। শাশুড়ির ডাকাডাকিতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যেতেই নয়নতারা শুনতে পেলে শাশুড়ি বলছে–এত ঘুম তোমার কোত্থেকে আসে বৌমা? আর তাও বলি, আমি তোমাকে ঘরে গিয়ে শুতে বললুম বলে তুমিও অমনি শুয়ে পড়লে? বলি আক্কেল জিনিসটাও কি মাথা থেকে বিদেয় করে দিয়েছ তুমি? বুড়ি শাশুড়ি মরে মরে তোমাকে ভাত বেঁধে এনে তোমার মুখে তুলে দেবে। আর তুমি দয়া করে গিলবে, এই কি তুমি চাও? তা তাই যদি চাও তো তাও দিতে পারি, তোমার মুখের কাছে ভাতের থালা এনে তোমাকে খাইয়ে দিতে পারি। তাই-ই দেব!
নয়নতারা তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে রইল। বললে–আমায় মাফ করবেন মা, আমি বুঝতে পারিনি–কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম–
শাশুড়ি বলে উঠলো–তা তো ঘুমিয়ে পড়বেই বউমা, বাড়িতে এতগুলো দাসীবাদী আছে, তুমি ঘুমোবে না তো কে ঘুমোবে! ভগবান তোমাকে ঘুমোবার কপাল দিয়েছে, তুমি তো ঘুমোবেই। আমার খেটে মরার কপাল তাই আমি চিরটাকাল কেবল খেটেই মরবো–
তারপর আর কথা না বাড়িয়ে নয়নতারা গিয়ে খেতে বসতো। খেতে খেতে অনেক কষ্টে চোখের জলটাকে আটকে রাখতো। নইলে শাশুড়ি দেখতে পেলেই আবার নতুন করে সে-জন্যে গঞ্জনা দেবে। বাবা-মার কাছে বড় আদরে মানুষ হয়েছিল নয়নতারা। জীবনে গঞ্জনাটাকে তাই বরাবর সব চেয়ে ভয় করে এসেছে সে। আর এখন সেই গঞ্জনাই কিনা তাকে দিনের পর দিন শুনে যেতে হচ্ছে!
অথচ কী করেছে সে? কী অপরাধটা সে করেছে যে তাকে এত গঞ্জনা সহ্য করতে হবে?
গৌরী পিসীও যেন অন্য রকম হয়ে গিয়েছিল তখন। যে গৌরী পিসী বিয়ের পর তাকে অত আদর করতো, তারই বা ব্যবহার অমন হয়ে গেল কেন কে জানে?
বেহারি পালের বউ চুপি চুপি চুপি এক-একদিন এসে হাজির হতো।
বলতো–তোমার শাশুড়ি কোথায় বউমা?
নয়নতারা বলতো–বোধ হয় ঘুমোচ্ছেন, ডেকে দেব?
বেহারি পালের বউকে বড় ভালো লাগতো নয়নতারার। কিন্তু শাশুড়ির ভয়ে দিদিমা বেশি আসতেও পারতো না। যখন দুপুরবেলা সবাই একটু ঘুমিয়ে পড়তো তখন টিপি টিপি পায়ে নয়নতারার ঘরে এসে বসতো।
বলতো–কেমন আছো বউমা?
প্রথম প্রথম বেহারি পালের বউকে দেখলেও ভয় পেয়ে যেত নয়নতারা। মনে হতো যদি দিদিমা শাশুড়িকে বলে দেয়! তাই শুয়ে থাকলে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে বসতো।
বেহারি পালের বউ বলতো–উঠলে কেন বউমা, তুমি শুয়ে থাকো না, আমি দেখলুম এ বাড়ির সবাই ঘুমোচ্ছে কিনা তাই তোমার কাছে এলুম। তা সকালবেলা শাশুড়ি তোমাকে অত বকছিল কেন বউমা, তুমি কী করেছিলে কী?
প্রথম প্রথম নয়নতারা নিজের দুঃখের কথা কিছু বলতো না। কিন্তু পাশের বাড়ির কথা কত দিন আর চাপা থাকে? বেহারি পালের বউ বলতো–তোমার শাশুড়ি তোমাকে খেতে টেতে দেয়?
নয়নতারা বলতো–দেয়–
