–বলো, কেন এসেছ তুমি? বলো, কথার জবাব দাও! কথা বলছো না কেন? সদানন্দ জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেল। তবু তার মনের কথাগুলো বুঝি চোখের ভাষায় স্পষ্ট হয়ে উঠলো। তার চোখ দুটো বললে–কেন এসেছি? এসেছি মানুষ কেমন করে রক্তের ঋণ শোধ করে তাই দেখতে! কপিল পায়রাপোড়া, মাণিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিকের রক্ত, কালীগঞ্জের বউ-এর রক্ত কি মিথ্যে হবে?
চৌধুরী মশাই আর থাকতে পারলেন না। বললেন–কথার জবাব দেবে না তো বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও আমার সামনে থেকে, যাও বেরিয়ে–
সদানন্দ আর দাঁড়ালো না। সদানন্দ বেরিয়ে আসবার আগেই চৌধুরী মশাই-এর দরজাটা তার মুখের ওপরেই দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিচে আসতেই হঠাৎ যেন আবার সেই ডাক–খোকা–
সদানন্দ এক মুহূর্তের জন্যে একটু থমকে দাঁড়ালো। একবার চারিদিকে চাইলে। কই, কোথাও তো কেউ নেই, তবে কে তাকে ডাকলে?
–খোকা! তুই এসেছিস?
এবার সদানন্দ বড় ভয় পেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বারান্দা পেরিয়ে সদরের দিকে পা বাড়াবার চেষ্টা করলে। হঠাৎ একটা কালো ছায়ার মত কে যেন পায়ের কাছে এসে তাকে শুঁকতে লাগলো।
–কে? কে? কে?
না, কেউ নয়। মিছিমিছি ভয় পেয়েছিল সদানন্দ। ছায়াটা একটা কুকুর। তাদেরই আশ্রিত কুকুর। বাড়ি পাহারা দিচ্ছে উঠোনে বসে। অথচ অবলা জীবটা জানে না যে পাহারা দেবার মত কিছু নেই আর এবাড়িতে। এতদিন পাহারা দিয়েই কি তুই কিছু আটকাতে পেরেছিস! সর্বনাশ যখন আসে তখন হাজার পাহারা দিলেও আসে, পাহারা না দিলেও তা আসে। পাইক বরকন্দাজ-লাঠিয়ালবন্দুক রাইফেল দিয়েও তা রোধ করা যায় না। কারণ আর কেউ না জানুক সদানন্দ ভালো করেই জানতো–তুমি হাজার চেষ্টা করলেও জীবনের মত মৃত্যুকেও ঠেকানো যায় না। পৃথিবীতে একমাত্র মৃত্যুরই মৃত্যু নেই। এ-পৃথিবীতে একমাত্র মৃত্যুই অবিনশ্বর।
সেখান থেকে দৌড়তে দৌড়তে সে সোজা এসে দাঁড়ালো বারোয়ারিতলায়। সেখানে তখন অসংখ্য মানুষের ভিড়। লণ্ঠন জ্বালিয়ে কবিয়ালের আসর বসেছে। কবিয়াল তখন সেই চেনা গানটাই রসিয়ে রসিয়ে গাইছে।
আগে যদি প্রাণসখি জানিতাম
শ্যামের পীরিত গরল মিশ্রিত
কারো মুখে যদি শুনিতাম ॥
কূলবতী বালা হইয়া সরলা
তবে কি ও-বিষ ভখিতাম ॥
সদানন্দ সেখানে গিয়ে নিঃশব্দে ভিড়ের মধ্যে বসে পড়লো।
.
সে বহুদিনের কথা। সে কথা সদানন্দের জানা না থাকলেও গ্রামের আর কারো জানতে বাকি ছিল না। ওই বেহারি পালের বউ সকলের আগে জেনেছিল। আর তারপর গ্রামের আবাল বৃদ্ধবনিতা কারো শুনতে বাকি ছিল না।
সদানন্দ চলে যাবার পর থেকেই রহস্যটা যেন আস্তে আস্তে আরো ঘনিয়ে আসছিল।
কর্তাবাবুর মৃত্যুর পর অবশ্য কেউ বুঝতে পারেনি। মৃত্যু না মৃত্যু! বহুদিন ধরে যে মানুষটা ভুগছিল তার মৃত্যুতে কে আর কী সন্দেহ করবে! যেমন ঘটা করে জমিদার বাড়িতে শ্রাদ্ধ হয় তেমনি করেই তাঁর শ্রাদ্ধ হলো। লোকজন খেলেও প্রচুর। একেবারে পেট পুরেই খেলে সবাই। কিছু কিছু লোক ছাঁদা বেঁধেও বাড়িতে নিয়ে গেল। দক্ষিণা পেলে ব্রাহ্মণরা। কাপড়ও পেলে বাড়ির লোকজনেরা। যারা পাতা পেতে খাবে না তারা ছাঁদা বেঁধে নিয়ে গেল। মোটকথা নবাবগঞ্জের গ্রামবাসীরা কদিন ধরে খুব একচোট আনন্দ করে নিলে।
শুধু একজনের কথা কারো মনে পড়লো না। সে বাড়ির ছেলে সদানন্দ।
বেহারি পাল একবার জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিল–সদানন্দর কোনও খবর পেলেন নাকি চৌধুরী মশাই!
চৌধুরী মশাই কথাটা শুনে ক্ষেপে গেলেন। তবু মনের রাগ মনে চেপে রেখেই বললেন সে-ছেলের খোঁজখবর পেলেই বা কী লাভ? সে থাকলেও যা, না থাকলেও তাই—
বেহারি পাল বলতে গেল–কিন্তু হাজার হোক আপনার নিজের ছেলেই তো সে! সে যত অন্যায়ই করুক, আপনি কি বাপ হয়ে তাকে ছেড়ে থাকতে পারবেন? অন্তত আপনি না হোক, তার গর্ভধারিণীও কি ভুলতে পারবেন তাকে?
কিন্তু এসব প্রসঙ্গ বেশি আলোচনা করতে চাইতেন না চৌধুরী মশাই। চৌধুরী মশাই যেন তারপর থেকে অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। যেন আরো খিটখিটে আরো গম্ভীর। কর্তাবাবুর দোতলার ঘরটা তখন খালিই পড়ে থাকতো। তিনি সেখানেই নিজের থাকবার বন্দোবস্ত করে নিয়েছিলেন।
চণ্ডীমণ্ডপে কেউ এসে চৌধুরী মশাই-এর কথা জিজ্ঞেস করলেই সেরেস্তাদার বলতো–তিনি তো আর নিচেয় নামেন না, ওপরে আছে–
কিন্তু সামান্য একটা আর্জি পেশ করবার জন্যে অনেকেই ওপরে যেতে চাইতো না। চৌধুরী মশাইও অনেক বাজে ঝামেলা থেকে বেঁচে যেতেন। কিন্তু যখন সন্ধ্যে হয়ে আসতো তখন কেমন যেন একটা আতঙ্কে বুকটা শিরশির করে উঠতো। রাত্রে ভয়ে ভয়ে অনেক সময় যেন দম আটকে যাবার মত অবস্থা হতো। কে যেন গলা টিপে ধরতো তাঁর। ধড়মড় করে তিনি উঠে আলোটা জ্বালতেন। এক গেলাস জল খেতেন। তারপর আবার শোবার চেষ্টা করতেন।
পাশে শুয়ে এক-একদিন গৃহিণীর ঘুম ভেঙে যেত। বলতো–কী হলো? ঘুম আসছে না তোমার?
চৌধুরী মশাই বলতেন–না, জলতেষ্টা পেয়েছিল—
তারপর আবার জিজ্ঞেস করতেন–বউমা কোথায়?
গৃহিণী বলতো–কেন? বউমার কথা জিজ্ঞেস করছো কেন? বউমা তার নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছে–
রাত্রে ওই পর্যন্তই।
কিন্তু সকাল বেলা বাড়ির আবার অন্য এক চেহারা। বাড়ির লোক বলতে তো মাত্র দু’জন। কর্তা আর গিন্নী। আর এ ছাড়া আছে আর একজন। পরের বাড়ির মেয়ে। তখন কর্তাবাবুও আর নেই, সদানন্দও নেই। সংখ্যায় দু’জন কমে গেছে। কিন্তু দু-তিনজন প্রাণীকে কেন্দ্র করে যে নাটক ঘটে চলেছে তা বুঝি পৃথিবীর কোনও সংসারেই আগে কখনও ঘটেনি।
