কেদার বললে–হাসছিস যে?
সদানন্দ বললে–ওই গানটা শুনে। ওই গানটা শুনলেই আমার অন্য কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয় লোকটা ভূলে গাইছে। ‘শ্যামের পীরিত গরল মিশ্রিত’ কথাটা ঠিক নয়, ওটা হবে ‘টাকার পীরিত গরল মিশ্রিত’।
বলে আবার হাসতে লাগলো।
নিতাই বললে–তোর বাবার সঙ্গে দেখা করেছিস?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, বাবা বাড়িতে ঢুকতে দিলে না। বাড়ি থেকে বার করে দিলে—
বলে আবার হাসতে লাগলো।
পরমেশ মৌলিকও শুনছিল পাশে বসে। সেও অবাক হয়ে গেল। বললে–তোমাকে ঢুকতেই দিলেন না চৌধুরী মশাই?
পরমেশ মৌলিকের চাকরি চলে গিয়েছিল। শুধু পরমেশ মৌলিক নয়, সকলের চাকরিই চলে গিয়েছিল। কৈলাস গোমস্তা, দীনু কেউই নেই আর তখন চৌধুরী বাড়িতে। কৈলাস, দীনু, পরমেশ মৌলিক সবাই তখন চাকরি করছে বেহারি পালের আড়তে।
সত্যিই এ কবছরে নবাবগঞ্জের ভেতরে যে এত পরিবর্তন হয়ে গেছে তা সদানন্দ জানতো না। যখন নবাবগঞ্জে এসে সে পৌঁছেছিল তখন কেউই জানতে পারেনি। বহুবছর পরে আসা। বলতে গেলে এক যুগ। এই এক যুগে যে কত কী ঘটে গেছে তা যেন ভাবাও যায় না। সমস্ত পৃথিবীটাই সদানন্দের দেখা হয়ে গিয়েছিল। জীবনের প্রদক্ষিণ-পথে কেন যে আবার সে তার জন্মভূমিতে ফিরে এল তা সে-ই জানতো। ভেবেছিল সে এসে দেখবে তার রক্তারক্তির ফলে কোথায় কী প্রতিক্রিয়া হলো! যে কর্তাবাবু তাঁর বংশরক্ষে করবার জন্যে এত আয়োজন করেছিলেন তার শেষটাও দেখবার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু শুধু কর্তাবাবুর শেষটাই নয়, ফিরে এসে অনেক কিছুই শেষ দেখতে পেলে সদানন্দ। দেখলে যে বাড়িতে একদিন সে জন্মেছে সে বাড়ি তখন ঠিক সেই কালীগঞ্জের জমিদারের বাড়ির মতই ভূতের বাড়ি হয়ে গেছে।
আস্তে আস্তে সদানন্দ বারবাড়ির উঠোনে ঢুকলো। সেই উঠোন যেখানে বিধু কয়ালের ছেলে ধান-চাল-সরষে আর পাটের ওজন নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। ডান দিকে চণ্ডীমণ্ডপ। তার পাশেই বংশী ঢালীর ঘর। সব ফাঁকা। জায়গাটার চারদিকে আগাছা ঝোপঝাড় জন্মে একেবারে যাতায়াতের রাস্তা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। তারপরে ভেতর বাড়ি। ভেতরবাড়িতে ঢুকতে কেমন ভয় করতে লাগলো সদানন্দর। মনে হলো কে যেন পেছন থেকে ডাকলে– খোকা–
সদানন্দ শিউরে উঠেছে। কে?
ঠিক যেন মা’র গলার মতন। সদানন্দও ডাকলে–মা–
সদানন্দর গলার আওয়াজ পেয়ে একদল চামচিকে কড়িকাঠ থেকে ফর ফর করে বাইরে উড়ে গেল। অনেকদিন ঝাট পড়েনি বারান্দায়। অনেকদিন যেন কারোর পায়ের স্পর্শও পড়েনি বাড়িতে। যেন সব বিশৃঙ্খলা চারদিকে। কিন্তু ভেতরবাড়ির দরজার সামনেই বাধা পড়লো। দরজার মাথায় তালা ঝুলছে। আর সামনে যাওয়া গেল না। সদানন্দ এবার চলে আসছিল। পাশে দোতলায় ওঠবার সিঁড়ি। কেন মনে হলো যেন ওপরে দোতলায়ও সে গিয়ে দেখবে। এ সমস্ত বাড়িরই তো উত্তরাধিকারী সে। সে নরনারায়ণ চৌধুরীর পৌত্র, হরনারায়ণ চৌধুরীর একমাত্র সন্তান। তার এ বাড়ির সর্বত্র যাবার অধিকার আছে।
আধখানা উঠেই মনে হলো যেন ওপরের ঘর থেকে একটা অস্পষ্ট আলোর ক্ষীণ রেখা আসছে। তাহলে ওপরে নিশ্চয়ই কেউ আছে। তার পায়ের বোধহয় আওয়াজ হয়েছিল সামান্য। সেই সামান্য আওয়াজেই কে যেন ভেতরে সচেতন হয়ে উঠেছে।
–কে?
শুনেই বোঝা গেল চৌধুরী মশাই-এর গলা। সমস্ত নিস্তব্ধতার মধ্যে একজন সজীব মানুষের চলা-ফেরা তাঁকে বিচলিত করে তুলেছে। কোনও প্রত্যুত্তর না পেয়ে চৌধুরী মশাই আবার বললেন–কে? কে ওখানে?
সদানন্দ স্পষ্ট গলায় বললে—আমি–
চৌধুরী মশায় উত্তরটা শুনে বোধ হয় খুশী হলেন না। বললেন–আমি কে? নাম নেই–?
সদানন্দ বললে–আমি সদানন্দ–
সঙ্গে সঙ্গে চৌধুরীবাড়ির মাথায় যেন বাজ পড়লো। সদানন্দর মুখের সামনে দরজাটা হাট করে খুলে গেল এক মুহূর্তে। আর সদানন্দ দেখতে পেলে সামনে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে বাবা।
খানিকক্ষণ দু’জনের মুখেই কোনও কথা নেই। যেন দু’জনেই দুজনের সামনে ভূত দেখেছে। একদিন এই সদানন্দকে ঘিরে যে-লোকটার ভাবনা-চিন্তা-আনন্দ আর শান্তির শেষ ছিল না সেই তাকেই সামনে দেখে তিনি কী যে করবেন ভেবে পেলেন না। একদিন নিজের মাথায় আঘাত করে এ বাড়ির কপালেও এক চরম আঘাত দিয়েছিল এই সদানন্দ। এই চৌধুরী মশাই-এর আজ সব গেছে। এই সদানন্দের জন্যে চৌধুরী মশাই সমস্ত গ্রামের লোকের কাছে চরম কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়েছিলেন। এর জন্যেই তাঁর সর্বস্ব গেছে, তাঁর মান-মর্যাদা বংশ সমস্ত ধুলোয় মিশেছে। এই এর জন্যেই তিনি আজ অভিশাপগ্রস্তের মত দিন কাটাচ্ছেন। আর তিনি যখন সর্বনাশের শেষ ধাপে এসে পৌঁছেছেন ঠিক তখনই কিনা আবার এ এসে হাজির হয়েছে।
–কেন এসেছ? কেন এসেছ বলো?
সদানন্দ কোনও উত্তর দিলে না। শুধু হাসলো একবার ঠোঁটের ফাঁকে।
–আবার হাসছো? তোমার লজ্জা করে না? কেন এলে আবার আমার বাড়িতে?
সদানন্দ তবু কোনও উত্তর দিলে না। যেমন হাসছিল তেমনিই হাসতে লাগলো।
–হাসছো কেন? কথার জবাব দাও?
সদানন্দ এবার স্পষ্ট করে হাসতে লাগলো। যেন চৌধুরী মশাই-এর সর্বনাশ দেখে সে খুশী হয়েছে। যেন বলতে চাইছে–আমি তো আগেই সাবধান করে দিয়েছিলুম। বলেছিলুম কালীগঞ্জের বউ-এর ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হবে। তখন তো আপনারা আমার কথা শোনেননি। তখন তো আপনারা জোর করে আমাকে আমার ঘরে পুরে সুন্দরী বউকে সামনে লেলিয়ে দিয়ে দরজায় শেকল দিয়ে দিয়েছিলেন। তখন তো ভেবেছিলেন মেয়েমানুষের সুন্দর মুখ দেখে আমি ভুলে যাবো। ভেবেছিলেন দশ হাজার টাকার খেসারত আর আপনাদের দিতে হবে না। কিন্তু কোথায় গেল সেই দশ হাজার টাকার ধাপ্পা? এখন যে তার গুণোগার দিতে হচ্ছে দশ লাখ টাকার সেলামী গুনে দিয়ে! কিন্তু এই দশ লাখ টাকার সেলামী গুণে দিয়েও কি কালীগঞ্জের বউ-এর রক্তের ঋণ শোধ করতে পারবেন? এখনও যে অনেক গুণোগার বাকি আছে।
