আর নয়নতারা সেই নিজের ঘরের বিছানার ওপর বসে বসেই ভাবতে লাগলো এ কী রকম বাড়ি! এ কী রকম বাড়িতে বিয়ে হয়েছে তার! এ কী রকম শাশুড়ি, এ কী রকম শ্বশুর, এ কী রকম সংসার! তাহলে তার স্বামী যা বলেছিল কিছুই তো মিথ্যে নয়? কালীগঞ্জের বউকে তাহলে এখানেই খুন করা হয়েছে! তাহলে কি সেই কালীগঞ্জের বউ এর অভিশাপই শেষ পর্যন্ত ফললো?
বাইরের একটা শব্দে হঠাৎ নয়নতারা চমকে উঠলো। মনে হলো দীনুর গলা। দীনু বাইরে থেকে বলছে–ছোট মশাই, একবার শিগগির আসুন, কর্তাবাবু যেন কেমন করছেন—
.
জীবনের যদি কোনও একটা মানে থাকে তো সে-মানেটা হলো এই যে জীবন কখনও থেমে থাকে না, সে চলে। চলতে চলতে কখনও সে অচলায়তনে গিয়ে শেষ হয় আবার কখনও অনন্তে গিয়ে পরিপূর্ণতা পায়। এই পরিপূর্ণতা পাওয়াটাই হলো আসল পাওয়া। একদিন সদানন্দও এমনি করে চলতে আরম্ভ করেছিল। সেই চৌধুরী বংশে জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছিল তার চলা। সব মানুষই তো এমনি করে চলা শুরু করে। কিন্তু তারই মধ্যে হঠাৎ এক-একজনেরই বা কেন মাঝপথেই অচলায়তন এসে পথ আটকে দাঁড়ায়? সদানন্দেরও এমনি যাত্রাপথের মাঝখানে একদিন বাধা এসে দাঁড়ালো। সে এক এমন বাধা যে তার মনে হলো সামনে চলবার আর বুঝি পথ নেই।
কিন্তু না, মানুষ তো পালিয়ে রেহাই পায় না। পালিয়ে যাওয়া মানেই তো থেমে যাওয়া। থামবার জন্যে তো সে জন্মায়নি। থেমে গিয়েছিল কর্তাবাবু, থেমে গিয়েছিল চৌধুরী মশাই। যদি সদানন্দ নয়নতারার সঙ্গে মানিয়ে-গুনিয়ে আপোস করে ঘরসংসার করতো তাহলেই সে হয়ত থেমে যেত। চৌধুরী মশাই-এর মতই সে চণ্ডীমণ্ডপে বসে সেরেস্তার খাতা-পত্র দেখতো। তার জমিজমার অঙ্ক বাড়তো আর বংশপরম্পরায় বিষয়-সম্পত্তি ভোগদখল করতো।
কিন্তু তা হলো না।
নবাবগঞ্জের লোকের তখন পরের বাড়ির ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নেই। কোথা থেকে কে যেন খবর এনে দিলে যে যুদ্ধ বেধেছে। বারোয়ারিতলায় নিতাই হালদারের দোকানের সামনের মাচায় সেদিনও তেমনি তাসের আড্ডা বসেছে।
কেদার দাস তাস খেলতে খেলতে জিজ্ঞেস করলে কার সঙ্গে কার যুদ্ধ বেধেছে রে?
পাশেই ছিল পরমেশ মৌলিক। বললে–খেলার সময় বাজে কথা বলবিনে কেদার, খবরদার, আগে তাস দে–
যুদ্ধের কথা আর আলোচনা হলো না। যে যুদ্ধতে সারা পৃথিবীর ভূগোল-ইতিহাস রাজনীতি অর্থনীতি সব কিছু ওলোট-পালোট হয়ে গেল তা নিয়ে আর কেউ মাথা ঘামালো না। নবাবগঞ্জ যেমন চলছিল তেমনিই চলতে লাগলো। পূজোর সময় যাত্রা, কবিগান, পাঁচালী চলতে লাগলো আর বাকি বারোমাস ক্ষেত-খামারের কাজ।
সেদিনও রাত্রের দিকে কবিগান চলছে বারোয়ারিতলায়। বেশ ভিড় হয়েছে চারদিকে। কবিয়াল গান গাইছে:
চৈত্র মাসে চালতে মিঠে
মিটে ডাহুকের রাও।
গাছের তলায় ছায়া মিঠে
মিঠে দখিন বাও।।
খয়ের মিঠে পানে রে ভাই
পান মিঠে চুনে।
বয়েস কালে কামিনী মিঠে
ঘৃত মিঠে নুনে।
সারাদিনে খাটাখাটুনি করে সবাই আসর জাঁকিয়ে গান শুনতে বসেছে। বেশ মজা লাগছে। পৃথিবীর কোথায় কোন্ কোণে যুদ্ধ বেধেছে, মারামারি লাঠালাঠি চলেছে, কোথায় ইংলন্ড, কোথায় জার্মানী আর কোথায় বা জাপান তা জানবার দরকার নেই আমাদের। যুদ্ধ বাধলেও যা, আর না বাধলেও তাই। আমাদের পক্ষে সবই সমান। আমাদের খেটে খাওয়ার কপাল। আমাদের যখন বরাবর খেটেই খেতে হবে তখন ও-সব রাজারাজড়ার ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী! তার চেয়ে এই যাত্রা কবিগান পাঁচালি নিয়েই মেতে থাকি। আর আছে তাস। তাস খেলতে খেলতেই রাতগুলো কাবার করে দিই–
হঠাৎ আসরের এক কোণ থেকে অনুরোধ এলো–একটু রসের গান হোক এবার আগে যদি প্রাণসখি জানিতাম–
তা রসের গানই শুরু হলো একটার পর একটা।
আগে যদি প্রাণসখি জানিতাম
শ্যামের পীরিত গরল মিশ্রিত
কারো মুখে যদি শুনিতাম।
কুলবতী বালা হইয়া সরলা
তবে কি ও-বিষ ভখিতাম।।
সঙ্গে সঙ্গে সারা আসরময় হুল্লোড় পড়ে গেল। রীতিমত তারিফের হুল্লোড়। এই গানটা অনেকবার শুনেছে নবাবগঞ্জের লোক। তবু এ-গান যেন পুরোন হতে নেই নবাবগঞ্জের লোকদের কাছে। কবিয়ালের দল এলেই বায়না ধরে–ওই গানটা গাও হে, আগে যদি প্রাণসখি জানিতাম–
ভিড়ের ভেতরে এক কোণে বসে একটা লোক একমনে গানটা শুনছিল। আর ভাবছিল রাধার কথা। ছোট বেলায় সেই রানাঘাটের রাধার বাড়িতেই গানটা প্রথম শুনেছিল সে।
হঠাৎ পাশ থেকে একজন বলে উঠলো–আরে সদা না? সদা তুই? তুই অ্যাদ্দিন পরে কোত্থেকে এলি?
সদানন্দ এতক্ষণ নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল। কেউ জানতে পারেনি তার কথা। চুপি চুপি এতকাল পরে এসে পৌঁছেছিল নবাবগঞ্জে।
পাশেই বসে ছিল কেদার। সেও দেখলে। সেও চিনতে পেরেছে। আরে তুই? তুই কোত্থেকে এলি?
শুধু কেদার নয়, কেদার, গোবর্ধন, নিতাই হালদার, গোপাল ষাট সবাই একবারে হই হই করে উঠেছে। চৌধুরীবাড়িতে এতদিন এত কাণ্ড হয়ে গেল আর যাকে নিয়ে কাণ্ড সে-ই এতদিন পরে সশরীরে এখানে এসে হাজির!
–কোথায় ছিলি তুই এতদিন?
সকলেরই ওই এক প্রশ্ন। এ কী চেহারা হয়েছে সদার! এই ক’বছরে একেবারে ভোল পালটে ফেলেছে সদা। মুখে অল্প-অল্প খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। গায়ে ময়লা পাঞ্জাবি, পায়ে ছেঁড়া চটি।
সদানন্দ হাসতে লাগলো।
