নয়নতারা ফিরেই আসছিল। কিন্তু আবার উঠতে লাগল। না, হেরে যাবার জন্যে সে এ বাড়ির বউ হয়ে আসেনি। কেন হারতে যাবে সে? বাবা তো তাকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেই শিখিয়েছে বরাবর। এখানে এই শ্বশুরবাড়িতেও সে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
আবার সে ওপরে উঠতে লাগলো সিঁড়ি দিয়ে। সিঁড়ির যেখানে শেষ ধাপ সেখানেই একটা বারান্দা মতন। তার পাশেই একটা ঘরের মত মনে হলো। ঘরের ভেতরে মনে হলো টিম-টিম করে একটা হারিকেন জ্বলছে।
এটা কার ঘর? এই ঘরের মধ্যেই শুয়ে আছে নাকি সে?
নয়নতারার আবার যেন কেমন সঙ্কোচ হতে লাগলো। যদি তাকে দেখে আবার মানুষটা রেগে ওঠে! আবার সমস্ত শাস্তি নিজের মাথায় তুলে নেয়! আবার যদি সে অজ্ঞান-অচৈতন্য হয়ে পড়ে। তখন তা সব জানাজানি হয়ে যাবে।
রাত তখন অনেক। সমস্ত নবাবগঞ্জ ঘুমোচ্ছে। এতটুকু সাড়াশব্দ নেই কারো।
দরজাটা বন্ধ। নয়নতারা বারান্দা দিয়ে পাশের জানালাটার কাছে এসে দাঁড়ালো। জানালার আধখানা পাল্লা খোলা।
সেই খোলা জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে চেষ্টা করলে।
হঠাৎ অস্পষ্ট আলোয় মনে হলো ঘরের মধ্যে কে যেন নড়ে বেড়াচ্ছে। এ কার ঘর? এই কি কর্তাবাবুর ঘর নাকি?
হঠাৎ নজরে পড়লো তার শ্বশুর!
ভালো করে দেখলে চেনা যায় তার শ্বশুরকে। চৌধুরী মশাই এত রাত্রে ঘরের মধ্যে নড়ে বেড়াচ্ছেন কেন? এত রাত্তিরে চৌধুরী মশাই জেগে ঘরের মধ্যে কী করছেন?
বুকটা থর-থর করে কাঁপছে নয়নতারার। কিন্তু তবু চোখ দুটো বন্ধ করে থাকতে পারলে না।
দেখলে চৌধুরী মশাই আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর তার একটু দূরে মেঝের ওপর শুয়ে আছে একজন বুড়ো মানুষ। ঘুমন্ত বুড়ো মানুষটার সারা শরীর চাদর দিয়ে ঢাকা।
হয়ত উনিই কর্তাবাবু। কর্তাবাবুর নামই সে বরাবর শুনে এসেছে। দেখেনি সে কখনও। একবার শুধু দেখেছিল। সেও ঠিক দেখা নয়। নতুন বউ হয়ে যখন এসেছিল সে তখন শুধু ওপরে উঠে একবার ঘোমটায় মুখ ঢেকে প্রণাম করেছিল কর্তবাবুকে। আর তারপর এই আজ।
নয়নতারার চোখ দুটো হঠাৎ বড় কৌতূহলী হয়ে উঠলো।
নয়নতারা দেখলে চৌধুরী মশাই কর্তাবাবুর মুখের সামনে নিচু হয়ে বসলেন। কী যেন তিনি দেখতে লাগলেন কর্তাবাবুর মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে। তারপর দুটো হাত কর্তাবাবুর গলার কাছে তুলে নিয়ে এক মুহূর্ত বুঝি দ্বিধা করতে লাগলেন।
নয়নতারা একটা অজ্ঞাত বিপদ কল্পনা করে নিয়ে ভয়ে আর্তনাদ করতে যাচ্ছিল। না না না, তোমরা খুনী, তোমরা সবাই খুনী! তুমি ঠিক বলেছিলে তুমি ঠিকই করেছিলে গো এ বংশের রক্তের মধ্যে পাপের জীবাণু মেশানো আছে! এরা কপিল পায়রাপোড়াকে গাছের ডালে ঝুলিয়ে আত্মঘাতী করিয়েছিল, এরা মাণিক ঘোষের ভাতের থালা পা দিয়ে ঠেলে ফেলে টিনের চাল খুলে নিয়েছিল, এরা ফটিক প্রামাণিককে রাস্তায় পাগল করিয়ে ছেড়েছিল। এদের তুমি ক্ষমা কোর না গো, এদের শাস্তি তুমি মাথায় তুলে নিয়েছ ঠিকই করেছ।
নয়নতারা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো–না-না-না—
কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোবার আগেই পেছন থেকে ডাক এলো—বউমা–
সঙ্গে সঙ্গে নয়নতারা যেন বাস্তবে ফিরে এসেছে।
দেখলে পেছনে শাশুড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
শাশুড়ী বললে–এসো বউমা, এসো, এদিকে এসো–
বলে সিঁড়ি দিয়ে আগে-আগে নিচে নামতে লাগলো। নয়নতারাও শাশুড়ির পেছন-পেছন নিচেয় এল। তারপর একেবারে নয়নতারাকে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে শাশুড়ি বললে–তুমি এত রাত্তিরে ওপরে গিয়েছিলে কী করতে?
নয়নতারা হতবাক হয়ে তখনও চুপ করে আছে। চোখের সামনে যেন তখনও দৃশ্যটা ভাসছে। তখনও যেন চৌধুরী মশাই কর্তাবাবুর গলার কাছে দুটো হাত উঁচু করে আছে
–কই বউমা, কথা বলছো না যে? ওপরে কী করতে গিয়েছিলে, বলো!
নয়নতারা বললে–আপনি যে বলেছিলেন উনি ওপরের ঘরে আছেন। তাই দেখা করতে গিয়েছিলুম।
–তা বলে এই রাত্তির বেলা যেতে হয়? তোমার কি আক্কেল বলে কিছু থাকতে নেই? তুমি আমাকে যাবার আগে জিজ্ঞেস করলে না কেন? আমি কি তোমাকে যেতে বারণ করতুম? তুমি যে হঠাৎ ওপরে গেলে, তা ওপরে কখনও গিয়েছ তুমি?
নয়নতারা বললে–কিন্তু আমি যে আর থাকতে পারছিলুম না মা, আমি যে ছটফট করছিলুম ওঁর সঙ্গে একবার দেখা করবার জন্যে।
শাশুড়ি বললে–না, আর কখনও এমন কাজ কোর না, তুমি এ বাড়ির নতুন বউ, আমাকে না বলে তুমি আর কোথাও যেও না। বুঝলে?
তারপর একটু থেমে বললে–তুমি জানলায় উঁকি দিয়ে কী দেখছিলে?
নয়নতারা কী বলবে বুঝতে পারলে না!
–বলো কী দেখছিলে?
নয়নতারা শাশুড়ির চোখের দিকে চেয়ে ভয় পেয়ে গেল।
বললে–আমি কিছু দেখিনি–
–দেখিনি মানে? আমি যে দেখলুম তুমি জানলায় উঁকি দিচ্ছ? এ কী রকম স্বভাব তোমার, পরের ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখা? বলো কী দেখেছ?
নয়নতারা বললে–আমি ওঁকে খুঁজছিলুম–
ওঁকে মানে? খোকাকে? খোকার সঙ্গে যদি দেখা করবার এত ইচ্ছে তোমার তো আমাকে বললে না কেন? আমিই তোমাকে সঙ্গে করে খোকার ঘরে নিয়ে যেতুম। এ-স্বভাব তো তোমার ভালো নয় বউমা–
হয়ত এই প্রসঙ্গে আরো অনেক কথা বলতো শাশুড়ি। কিন্তু বাইরে যেন কার পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল।
–কই, কোথায় গেলে তুমি?
শাশুড়ি হঠাৎ কথা থামিয়ে বললে–তুমি বোস আমি আসছি—
বলে বাইরে চলে গেল।
