প্রীতি বললে–আর কতদিন এমনি করে কষ্ট করবে?
চৌধুরী মশাই বললেন তুমি তো কেবল আমার শরীরের কষ্টের কথাই ভাবছো, আর কত টাকা যে নষ্ট হয়ে গেল তা তো কেউ ভাবছো না একবারও! টাকা নষ্ট হওয়াও যা, রক্ত নষ্ট হওয়াও তাই। রক্ত নষ্ট হলে তবু একদিন রক্ত হয়, ঘি-দুধ খেলে রক্ত বাড়ে, কিন্তু টাকা গেলে কি আর তা ফিরে আসে? জলের মত আমার টাকাগুলো খরচ হয়ে যাচ্ছে অথচ আমি কিছু করতে পারছি না–
প্রীতি বললে–তা বলে মানুষকে তো মেরে ফেলা যায় না–
চৌধুরী মশাই রেগে গেলেন। বললেন–কেন? কেন মেরে ফেলা যাবে না? যে-মানুষ ভুগে ভুগে কষ্ট পাচ্ছে তাকে যদি গলা টিপে মারি অন্যায়টা কীসের শুনি?
প্রীতি বললে–তুমি বলছো কি? জলজ্যান্ত মানুষকে তুমি গলা টিপে মারবে?
–কেন মারবো না? তাতে রুগীও বাঁচবে, আমার টাকাও বাঁচবে।
–কিন্তু হাজার হোক নিজের বাবা তো তোমার! তাকে মারতে তোমার মনে লাগবে না?
চৌধুরী মশাই বললেন–কেন লাগবে? আগে হলে তবু লাগতো, কিন্তু এখন কেন লাগবে? এখন আমি পাথর হয়ে গিয়েছি। এখন মায়া-দয়া বলতে আর কিছু নেই আমার। কর্তাবাবুই তো একদিন আমাকে দয়া-মায়া করতে বারণ করেছিলেন। মায়া-দয়া করলে কি আর আমার এ জমি-জমা রাখতে পারবো মনে করেছ?
বলতে বলতে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আবার ফিরে দাঁড়ালেন। বললেন–বউমা কোথায়?
প্রীতি বললে–কোথায় আবার থাকবে? নিজের ঘরে–
–তা প্রকাশ কোথায়? প্রকাশ এখনও ফেরেনি?
–ফিরলে তো তুমি দেখতেই পেতে।
চৌধুরী মশাই কথাটা শুনে যেন নিজের মনেই বলতে লাগলেন–আমি যে কোন্ দিকটা দেখি তা বুঝতে পারছি না। একটা মানুষ কত দিক সামলাবো বলে দিকিনি। একটা ছেলে ছিল তাও অমানুষ হয়ে গেল। তার দ্বারা কোনও কাজ হবার জো নেই। সে কোথায় গিয়ে রইল তারও কোনও ঠিক-ঠিকানা পেলুম না। হয় আমি পাগল হয়ে যাবো নয়তো আত্মহত্যা করবো।
কথাগুলো বলে চৌধুরী মশাই বাইরে চলে গেলেন। কিন্তু প্রীতির অনেকক্ষণ ধরে কোনও ঘুম এলো না। আস্তে আস্তে অন্য রাতের মত সেরাতেও চারদিকে সব শান্ত হয়ে এলো। অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে দোতলার ঘরের দিকে কান পেতে রইলো প্রীতি। যদি কিছু শব্দ আসে, যদি কোনও কান্না কানে আসে! কারো চাপা-গলার আর্তনাদ! কথাটা ভাবতেই প্রীতির মনে হলো তার গলাও যেন কেউ টিপে ধরেছে। গলা টিপে ধরলে কী রকম যন্ত্রণা হয় সেটাও কল্পনা করতে চাইলে প্রীতি। কিন্তু যদি কেউ টের পায়! আর মারতেই যদি হয় তো ডাক্তারি ওষুধ খাইয়েই তো মারা ভালো। ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিলেই হয়। তা হলে সে-ঘুম আর কোনও দিন ভাঙবে না। নিঃশব্দে আরামে মারা যাবে। খুন করার দায় থেকেই মানুষ অব্যাহতি পাবে।
হঠাৎ যেন বাইরে খট করে একটা শব্দ হলো।
প্রীতি কানটাকে খাড়া করে রইল। মানুষকে গলা টিপে মারলে কি ওই রকম খট করে শব্দ হয়? কিন্তু কেন? কেন মানুষকে খুন করবার দরকার হবে বুঝতে পারলে না সে! এই জন্যেই তো খোকা এমন হয়েছে।
কিন্তু প্রীতি জানতে পারলে না যে এ বাড়ির আর একটা ঘরে তখন আর একজনও জেগে রয়েছে।
নয়নতারা প্রতি দিনের মত সেদিনও চোখ বুজে শুয়ে ছিল। কিন্তু আর থাকতে পারলে না। চারিদিকে যখন সব নিঝুম হয়ে এল তখন বোঝা গেল কোথাও আর কেউ জেগে নেই। এই-ই তার সুযোগ। এইবার সে দরজা খুলে ওপরে যাবে। এবার সোজা গিয়ে তার ঘরের দরজায় গিয়ে ধাক্কা দেবে।
হয়ত দরজা খুলবে না মানুষটা। কিম্বা হয়ত দরজা খোলাই আছে। অসুস্থ মানুষের ঘরের দরজা তো খোলাই থাকে সাধারণত।
নয়নতারা শুধু গিয়ে তাকে একবার জিজ্ঞেস করবে–এ তুমি কী করলে? তুমি নিজের ওপরে কেন এমন শাস্তি নিলে বলো? কার জন্যে?
মানুষটা হয়ত মাঝরাত্রে হঠাৎ তাকে দেখে অবাক হয়ে যাবে। হয়ত কোনও কথার উত্তর দিতে পারবে না।
–তুমি কি আমাকে শাস্তি দেবার জন্যে নিজের ওপর এই শাস্তি তুলে নিলে?
মানুষটা হয়ত তার কথার কোনও জবাব দেবে না। কিন্তু এবার আর ছাড়বে না নয়নতারা। এবার তার কাছ থেকে জবাব সে আদায় করবেই–
ভেতর বাড়ি পেরিয়ে বার বাড়ি। এতদিন বিয়ে হয়েছে নয়নতারার কিন্তু কখনও এমন করে বার বাড়িতে আসেনি। বার বাড়ি যাবার মুখেই দোতলায় ওঠবার সিঁড়ি। দোতলার ঘরে যেতে গেলে এই সিঁড়ি দিয়েই উঠতে হয়।
নয়নতারা টিপি টিপি পায়ে দেয়াল ধরে ধরে ওপরে উঠতে লাগলো।
কোথায় কোন্ ঘরে মানুষটা শুয়ে আছে তাও জানা নেই। শাশুড়ি শুধু এইটুকু বলেছে যে সে দোতলার ঘরে আছে। কিন্তু দোতলায় কটা ঘর? কর্তাবাবুর ঘর তো দোতলায়। হয়ত পাশাপাশি দুটো ঘর। একজন ঠাকুর্দা আর একজন নাতি। দুজনেই অসুস্থ। তাই দু’জনেই ওপরে থাকে।
বড় ভয় করতে লাগলো নয়নতারার। একে শীতে সমস্ত শরীরটা কাঁপছে, তার ওপর ভয়, যদি কেউ দেখে ফেলে! যদি কেউ সন্দেহ করে। যদি কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে তো সে তাকে কী জবাব দেবে।
বাগানের দিক থেকে একটা প্যাঁচা হঠাৎ ডেকে উঠেছে। ডাকটা শুনেই নয়নতারা সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে থমকে দাঁড়ালো। সিঁড়ির দু’পাশে দেয়াল। দু’পাশের দেয়ালে হাত দিয়ে দিয়ে সাবধানে ওপরে উঠছিল নয়নতারা।
একবার মনে হলো দরকার নেই। মনে হলো যেমন চুপি চুপি সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে আবার তেমনি করে সে ফিরে যাবে। এই কাঙালপনা তার আর ভালো লাগলো না। যে তার মুখ দেখতে চায় না, জোর করে তাকে তার নিজের মুখ দেখানোএর চেয়ে লজ্জার আর কী থাকতে পারে! বিয়ে করেছে বলে কি এতই ছোট হয়ে গেছে সে? এতই তাচ্ছিল্য করবার মত মানুষ নয়নতারা!
