–কিন্তু সব অপরাধেরই তো ক্ষমা আছে মা!
শাশুড়ি বললে–ক্ষমাই যদি থাকবে তাহলে অমন করে কেউ আত্মঘাতী হতে চেষ্টা করে? তুমি নিজেই তো দেখলে। ওই দোয়াতদানিটার বদলে যদি ওখানে ছোরা-ছুরি কিছু থাকতো তাহলে কী সব্বোনাশ হতো বলে দিকিনি? আমার ভাবতেও বুক কেঁপে উঠছে–
নয়নতারা বললে–তবু আমাকে একবার যেতে দিন না মা। আমাকে উনি যত ইচ্ছে অপমান করুন তাতে আমার কিছু এসে যাবে না। কিন্তু আমি হেরে গেলাম এ আমার সহ্য হচ্ছে না। আমি কেন হেরে যাবো? আমি আমার নিজের স্বামীকে বশ করতে পারবো না। এ যে আমারই লজ্জা! আমি লোককে মুখ দেখাবো কী করে? আমার নিজেরই তো নিজের মুখ দেখতে লজ্জা হচ্ছে।
শাশুড়ি বললে–তুমি অত উত্তেজিত হয়ো না বউমা। তোমার দুর্বল শরীরে অত উত্তেজনা ভালো নয়। তুমি একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো, আমি এখন যাই, আমি পরে আবার আসবো। তোমাদের ব্যাপারে আমারও শরীর ভালো যাচ্ছে না। আর শরীরেরই বা দোষ কী বলো! আমি একলা মানুষ কোন্ দিকে দেখবো
নয়নতারাকে শুইয়ে দিয়ে প্রীতি বাইরে এল। তারপর নিজের ঘরে আসতেই দেখলে চৌধুরী মশাই ঘরের মধ্যেই ব্যস্ত হয়ে পায়চারি করে বেড়াচ্ছেন। গৃহিণীকে দেখেই সামনে এগিয়ে এলেন।
বললেন–কী হলো? বউমা কী বলছে?
গৃহিণী বললে–আমায় জিজ্ঞেস করছিল খোকার কথা। জিজ্ঞেস করছিল খোকা কেমন আছে।
–বউমা জানে না বুঝি যে খোকা বাড়িতে নেই?
গৃহিণী বললেন–আমি বলেছি খোকা বাড়িতেই আছে, ওপরের ঘরে শুয়ে আছে। খোকার সঙ্গে একবার দেখা করবার জন্যে পীড়াপীড়ি করছিল বড্ড।
–সে কী? এত কাণ্ডের পরেও?
প্রীতি বললে–হ্যাঁ, অনেক কথা বলছিল বউমা। বড় সম্মানে ঘা লেগেছে। বলছিল এত বড় অপমান সে সহ্য করবে না। বড্ড লজ্জা হয়েছে বউমার। বলছিল আর একবার চেষ্টা করে দেখবে।
চৌধুরী মশাই বললেন–কিন্তু যখন জানতে পারবে যে খোকা বাড়িতে নেই, তখন? তখন যদি ওপরের ঘরে যায় কোনও দিন?
প্রীতি বললে–সে যখন জানতে পারবে তখন জানবে। আমি আর সে নিয়ে বেশি ভাবতে পারছি না। আমার আর এখন মাথার ঠিক নেই।
–কিন্তু খোকা যদি আর ফিরে না আসে?
–যদি ফিরে না আসে তখন অন্য বুদ্ধি বার করবো। যদি বলতুম খোকা নেই তখন যদি আবার কান্নাকাটি করতো! তখন আমি সামলাতুম কী করে? তুমি তো বলেই খালাস। সামলাবার বেলায় তো সেই আমিই। এখন যদি কিছু গণ্ডগোল হতো তো তোমরা তো আমারই দোষ দিতে। আমি যা করেছি সব দিক ভেবে-চিন্তেই করেছি।
চৌধুরী মশাই বললেন–তাহলে সকলকে বলে দিও যেন কেউ আবার বউমাকে উল্টো কথা না বলে দেয়। প্রকাশকেই যা ভয়। সে সব সময় যা বকবক করে, হয়ত তখন বউমার কাছে সব ফাঁস করে দেবে। তা প্রকাশ কোথায়?
প্রীতি বললে–কোথায় আবার যাবে? তাকে পাঠিয়েছি খোকার খোঁজে–সে তো সেই সকাল বেলাই বেরিয়েছে, মুখে জল পর্যন্ত দেয়নি। তার জন্যেই তো বসে আছি–
চৌধুরী মশাই সব শুনে যেন একটু নিশ্চিন্ত হলেন। মাঝরাত থেকেই তিনি একবার ঘর একবার-বার করছেন। ভেতরে বাইরে তাঁর অশান্তি। ছেলের বিয়ে দেবার আগে পর্যন্ত তেমন কোনও ঝঞ্ঝাট ছিল না। মন দিয়ে সব কাজকর্ম দেখতে পারতেন। আদায়-পত্র নিয়েই তাঁর সময় কাটতো। কিন্তু এ কী বিপদ ঘাড়ে চাপলো তাঁর। এমনি করে আর কিছুদিন চললেই তো হয়েছে। জমিদারি করা একেবারে লাটে উঠে যাবে তাঁর। এত কষ্টের পয়সা সব সাত ভূতে লুটে-পুটে খাবে।
তিনি আর দাঁড়ালেন না সেখানে। বললেন–আমি আসি, আমার এখানে বসে থাকলে চলবে না,–ওদিকে আমার অনেক কাজ পড়ে আছে–
বলে তিনি বার বাড়ির দিকে চলে গেলেন।
.
বহুদিন আগে কালীগঞ্জের জমিদারের কাছে নায়েবী করবার সময় কর্তাবাবু প্রথম শিখেছিলেন কাকে বলে পরচা, কাকে বলে খতিয়ান, কাকে বলে জমাবন্দী, কাকে বলে ওঠবন্দী, কাকে বলে খাতক, মহাজন, তমসুক, আর কাকে বলে নজরানা।
সাধ ছিল একদিন তিনিও নতুন এক জমিদারির মালিক হবেন। আর যেমন করে চক্রবর্তী মশাই পরের উপার্জিত ধনের ভোগ-দখল করছেন, তেমনি তিনিও করবেন। তিনিও প্রজার দখল দেবেন, প্রজা উচ্ছেদ করবেন, মহাজন হয়ে প্রজাদের টাকা দাদন দেবেন, খাজনা আদায়ের সময় নজরানা নেবেন।
তা সে সবই তাঁর হয়েছিল। বলতে গেলে হর্ষনাথ চক্রবর্তীর চেয়েও বেশি হয়েছিল। যখন কর্তাবাবুর ছেলে হয়েছিল তখন তাকেও নিজের শেখা বিদ্যের তালিম দিয়েছিলেন। ছেলেও সব কিছু মন দিয়ে শিখে নিয়েছিল। কিন্তু মানুষের ত আশার শেষ থাকে না। মনে হয় ছেলে না-হয় শিখলো। কিন্তু নাতি? তা নাতিও না-হয় শিখলো, সব সম্পত্তির আয়ও বাড়লো। কিন্তু নাতির নাতি? নাতির নাতির নাতি? আর শুধু তাও নয়, যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ এ থাকবে তো!
কর্তাবাবুর পরে চৌধুরী মশাইয়েরও ছিল ওই একই চিন্তা। কীসের জন্যে এত পরিশ্রম, কীসের জন্যে এত অর্থ-উপার্জন? ছেলে যদি সংসারী না হয়, ছেলের যদি বংশরক্ষা না হয়–তাহলে কী হবে?
তা সেদিনও আবার রাত হলো।
কোটি-কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে কত কোটি-কোটি বার রাত হয়েছে। কিন্তু সেদিন রাত না হলে কার কী এমন লোকসান হতো!
চৌধুরী মশাই সেদিনও ওপরের ঘরে শুতে যাচ্ছিলেন। যাবার আগে বললেন–আমি যাই, আজকে একটু সকাল সকাল ওপরের ঘরে শুতে যাবো
কদিন ধরেই চৌধুরী মশাই ওপরে শুচ্ছেন। তবু সেদিন যেন তাঁর একটু বেশি তাড়া ছিল। কদিন ধরেই চৌধুরী মশাইএর মনে হচ্ছিল বড় দেরি হয়ে যাচ্ছে, আর নয়।
