তা সংসারে এক ফোঁটা চোখের জলের দামই কি কম!
সেদিনের সেই মাঝরাত থেকেই নয়নতারার এই কথাটা মনে হলো। মনে হলো চোখের জল সে আর ফেলবে না। সংসারে চোখের জলের যত দামই থাক, যে তার মর্যাদা দেয় না তার জন্যে সেও নিজের চোখের জল অপব্যয় করবে না।
কতক্ষণ যে সে অজ্ঞান হয়ে ছিল তা তার খেয়াল ছিল না। বোধহয় সমস্ত রাতটাই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। সমস্ত রাতের মধ্যে একবারও কিছু মনে হয়নি তার। যখন জ্ঞান ফিরলো দেখলে সকাল হয়েছে। পাশের খোলা জানালা দিয়ে এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে ঘরে। আগের রাতটার সেই ঘটনাও আস্তে আস্তে তার মনে পড়তে লাগলো। মনে পড়তে লাগলো কেমন করে তার চোখের সামনেই মানুষটা দোয়াতদানি দিয়ে নিজের কপালে ঠাঁই ঠাঁই করে মেরেছিল। কেমন করে সমস্ত শরীরটা তার রক্তে একেবারে ভেসে গিয়েছিল। তারপরে আর কিছুই তার মনে ছিল না।
এতক্ষণে মনে পড়লো বাবার কথা। বাবা যদি এই সময় একবার আসত তো আর এখানে থাকতো না সে। বাবার সঙ্গেই চলে যেত কেষ্টনগরে!
কিন্তু কেষ্টনগরে গিয়েই বা কী হবে? সেখানে গেলেই কি সে সুখে থাকবে?
আবার মনে হলো তাহলে কি সে হেরে যাবে? তার শাশুড়ীকে যে সে কথা দিয়েছিল সে বেহুলার মত তার স্বামীকে ফিরিয়ে আনবে? তা তো কই সে পারলে না?
হঠাৎ শাশুড়ি ঘরে ঢুকলো। বললে–ভালো আছো বউমা?
নয়নতারার মনে হলো যেন তার নিজের মা আবার সশরীরে তার কাছে ফিরে এসেছে।
শাশুড়ি বললে–এই ওষুধটা খেয়ে নাও বউমা। আমি যে কী ভাবনায় পড়েছিলাম তোমার জন্যে।
তারপর একটু থেমে বললে–তোমার গায়ে কোনও ব্যথা হয়নি তো?
ওষুধটা খেয়ে নিয়ে নয়নতারা বললে–আমি যে আপনার কথা রাখতে পারলুম না মা, উনি যে আমার কথা কিছুতেই শুনলেন না। আপনি আমাকে যা বলেছিলেন আমি তা সব কিছুই তো তেমনি করেই করলুম, সব কিছুই তেমনি করেই বললুম! এখন আমি কি করবো?
শাশুড়ি বললে–এখন ওসব কথা ভেবো না বউমা, তোমার এখন শরীর খারাপ, তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো।
নয়নতারা জিজ্ঞেস করলে–উনি এখন কেমন আছেন?
–কার কথা বলছো? খোকা? খোকা ভালো আছে।
–রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে? জ্বরটর হয়নি তো?
শাশুড়ি বললে—না–
নয়নতারা বললে–আমি ভাবতেই পারিনি মা যে উনি অমন করে নিজের মাথায় সমস্ত শাস্তিটা তুলে নেবেন। আমি ওটা কল্পনাই করতে পারিনি। পারলে টেবিল থেকে দোয়াতদানিটা আগেই সরিয়ে রাখতুম।
শাশুড়ি বললে–না বউমা, তোমার তো দোষ নেই, তুমি মেয়েমানুষ হয়ে যা করবার তা করেছ। তুমি আমার কথা রেখেছ পুরোপুরি। দোষ যদি কিছু হয়ে থাকে তো সে আমার। আজ যা কিছু হয়েছে সবটার জন্যে আমিই দায়ী।
নয়নতারা বললে–আপনার কেন দোষ হতে যাবে মা, দোষ আমার কপালের। আপনি যা কিছু করেছেন সব তো আমার ভালোর জন্যেই। আমার কপালে সুখ নেই তা আপনি কী করবেন?
তারপর একটু থেমে বললে–উনি এখন কোথায়?
শাশুড়ি কী যেন একটু ভেবে নিল। বললে–এই তো ওপরের ঘরেই রয়েছে।
–ভালো আছেন তো?
–হ্যাঁ, এখন ভালো আছে একটু। ডাক্তারবাবু এসে মাথায় ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিয়ে গেছে, এই তো এখন খোকার ঘর থেকেই আসছি। এখন আর মাথায় কোনও যন্ত্রণা নেই। একটু আগেই এক গেলাস দুধ খাইয়ে এসেছি।
নয়নতারা জিজ্ঞেস করলে–আমার কথা কিছু জিজ্ঞেস করেছেন?
শাশুড়ি বললে–হ্যাঁ, এই এখখুনিই তো জিজ্ঞেস করছিল তোমার কথা।
–কী জিজ্ঞেস করছিলেন?
–জিজ্ঞেস করছিল তোমার শরীর কেমন আছে।
–আপনি কী বললেন?
শাশুড়ি বললে–আমি বললাম তুমি এখন একটু ভালো আছ।
নয়নতারা বললে–আমি আপনার কথা রাখতে পারলুম না মা, আপনার সাধ মেটাতে পারলুম না, আমি হেরে গেলুম। আপনি কেন আমাকে এবাড়ির বউ করে নিয়ে এসেছিলেন? অন্য কোনও মেয়ে হলে হয়ত আপনার সব সাধ মেটাতে পারতো। আমি আপনার কিছুই উপকার করতে পারলুম না মা–
বলে নয়নতারা ঝর-ঝর করে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললে। শাশুড়ি নিজের আঁচল দিয়ে নয়নতারার চোখ দুটো মুছে দিতে দিতে বললে–কেঁদো বউমা, তুমি কী করবে বলো, তোমার কোনও দোষ নেই–তুমি চুপ করো। তোমার মত বউ পেয়েও যে সুখী হলো না তার কপালে অনেক কষ্ট লেখা আছে–
নয়নতারা বললে–আমি এখন একবার ওঁর কাছে যাবো মা?
–কার কাছে। খোকার কাছে? কেন?
নয়নতারা বললে–আমি একবার গিয়ে ওঁকে জিজ্ঞেস করবো কেন উনি এমন করলেন, নিজের ঘাড়ে সমস্ত শাস্তি তুলে নিয়ে উনি কাকে শাস্তি দিতে চাইলেন? যে আসল অন্যায় করেছে তাকে শাস্তি দেবার ক্ষমতা যদি ওঁর না থাকে তো এমন ভীরুর মত কাজ কেন করলেন? আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করবো এর নাম কি পৌরুষ? এর নাম কি বীরত্ব?
বলতে বলতে নয়নতারা উঠে বসলো। বললে–আমি এখুনি একবার ওঁর কাছে যাবো মা, আপনি আমাকে বাধা দেবেন না।
–না বউমা, এখন তোমার খোকার কাছে গিয়ে দরকার নেই। তারও শরীর খারাপ, তোমারও শরীরে জোর নেই, এখন হয়ত রাগের মাথায় তোমাকে কী বলে বসবে তখন তুমিও হয়ত আর সহ্য করতে পারবে না, তখন উল্টো বিপত্তি হবে—
নয়নতারা বললে–-না মা, আমি যাবোই। আমি মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছি বলে কি আমাকে এত অগ্রাহ্য করবেন? আমিও তো একজন মানুষ। উনি যা বলবেন তাই-ই আমাকে মুখ বুঁজে সহ্য করতে হবে?
–কিন্তু বউমা, তুমি তো ওর কথা সব শুনেছ। ওর রাগ তো তোমার ওপরে নয়, ওর যত রাগ আমাদের ওপর, ওর বাবার ওপর, ওর কর্তাবাবুর ওপর–তুমি গিয়ে বললেও কোনও ফল হবে না–
