প্রীতি আবার ডাকলে—বউমা–বউমা, বউমা কী হলো? চেঁচিয়ে উঠলে কেন? দরজা খোল– দরজা খোল–খোকা, দরজা খুলে দে–বলে প্রীতি দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো–
আর সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা খুলে গেল ভেতর থেকে। দরজা খুলতেই হারিকেনের আলোয় প্রীতি দেখতে পেলে খোকা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। তার কপাল দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত গড়িয়ে মুখে গায়ে কাপড়ে মাখামাখি হয়ে গেছে।
খোকার চেহারাটা দেখেই ভয়ে আতঙ্কে আঁতকে উঠেছে প্রীতি।
বললে–ওমা, কী সব্বোনাশ, এত রক্ত এলো কোত্থেকে খোকা? তুই কী করেছিস? কে মেরেছে তোকে? এ কাণ্ড কী করে হলো বাবা? বউমা কোথায়?
সদানন্দ কোন উত্তর দেবার আগেই প্রীতি দেখলে ঘরের ভেতরে টেবিলের তলায় মেঝের ওপর বউমার শরীরটা লুঠোচ্ছে।
প্রীতি আলোটা নিয়ে ভেতরে গিয়ে বউমার কপালে হাত দিয়ে দেখলে শরীরে কোনও সাড় নেই। মুখের কাছে মুখ নিয়ে প্রীতি ডাকতে লাগলো–বউমা, বউমা, ও বউমা, কী হলো তোমার? কী হলো?
মেঝের আশেপাশেও নজর দিয়ে দেখলে। জায়গাটা রক্তে একেবারে ভেসে গেছে। এত রক্ত কোত্থেকে এল! কে কাকে মারলে! তবে কি বউমা মেরেছে খোকাকে?
–খোকা!
প্রীতি পেছন ফিরে দেখলে। কিন্তু খোকা কোথায় গেল? খোকা, ও খোকা, খোকা……………
প্রীতি চিৎকার করে ডাকতে লাগলো–খোকা, কোথায় গেলি! ও খোকা—
কেউ সাড়া দিলে না। তাড়াতাড়ি ঘরের বাইরে এসে আবার ডাকলে–খোকা–খোকা—
কিন্তু তবু কেউ সাড়া দিলে না। প্রীতি বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। সেখানেও খোকা নেই। তারপর বারান্দা থেকে বেরিয়ে বারবাড়িতে ঢুকে ডাকলে–খোকা–খোকা–
একবার বার বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালে সোজা সদরের রাস্তা। সেখানেও দৌড়তে দৌড়তে গেল। ডাকতে লাগলো–খোকা, খোকা—খোকা–
কোনও সাড়া-শব্দ নেই খোকার। খোকা কোথাও নেই–
প্রীতি হারিকেনটা নিয়ে সেই উঠোনের মধ্যেই খানিক দাঁড়ালো। বারবাড়ির কুকুরটা বাড়ির গিন্নীকে দেখে কাছে এসে আদর করে ল্যাজ নাড়াতে লাগলো।
হঠাৎ পেছনে গৌরী এসে দাঁড়িয়েছে। প্রীতির চিৎকারে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। গৌরীকে দেখে প্রীতি হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো–ওরে গৌরী, সর্বনাশ হয়েছে রে–
–কী সব্বোনাশ বউদি? কী হয়েছে?
–ওরে, খোকা আমার রক্তারক্তি কাণ্ড বাধিয়েছে!
গৌরী কিছুই বুঝতে পারলে না। বললে–খোকা কোথায় বউদি? খোকা তো ঘরে গিয়ে শুয়েছিল। তারপর কী হলো?
প্রীতি কাঁদতে কাঁদলে বললে–ওরে গৌরী, আমার খোকা পালিয়ে গেল—
গৌরী বললে–তা বউমা তো ঘরে ছিল, বউমা কোথায়?
প্রীতি বললে–ওরে গৌরী, আমিই বউমার সর্বনাশ করলুম রে, বউমা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে মেঝের ওপর। আমার হাত-পা কাঁপছে। তুই যা, একবার তোর ছোট মশাইকে ওপর থেকে ডেকে নিয়ে আয় গিয়ে, ছোট মশাই কর্তাবাবুর ঘরে শুয়েছে আজ—যা যা, শিগগির যা তুই–আমি বউমার কাছে গিয়ে বসি গে–
নয়নতারা তখনও অজ্ঞান অচৈতন্য!
প্রীতি আবার খোকার ঘরে এল। বউমার কাছে নিচু হয়ে বসে কানের কাছে মুখ নিয়ে ডাকতে লাগলো–বউমা, বউমা, কী হয়েছে তোমার? বলো, কথা বলো? খোকা তোমার কী করেছে?
নয়নতারা তখনও কোনও উত্তর দিচ্ছে না।
গৌরী দৌড়তে দৌড়তে আবার ফিরে এল।
বললে–-ছোট মশাইকে ডেকেছি বউদি, তিনি আসছেন–
প্রীতি বললে–তুই এক কাজ কর গৌরী, ঘটি করে একটু ঠাণ্ডা জল নিয়ে আয় তো, বউমার মুখে-চোখে ছিটোই, বউমার জ্ঞান ফিরছে না, আমার কথারও জবাব দিচ্ছে না–
চৌধুরী মশাই ততক্ষণে এসে গেছে।
বললেন কী হলো? তুমি যে বললে–বউমা বাবার সঙ্গে বাপের বাড়ি চলে গেছে? আবার কোত্থেকে এল? তা খোকা কোথায়? এত রক্ত কোত্থেকে এল? দোয়াতদানিটা এখানে কে ফেললে?
প্রীতি বললে–খোকা রক্তারক্তি কাণ্ড বাধিয়েছে–
–সে কী? খোকা বউমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে নাকি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এই কাল তুমি বললে–বউমা বাপের বাড়ি গেছে, আর এখন বলছো খোকা বউমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে!
ততক্ষণে গৌরী এক ঘটি জল এনে হাজির করেছে।
প্রীতি ঠাণ্ডা জল আঁজলা করে নিয়ে নয়নতারার মাথায় ছিটোতে লাগলো। আর মুখ নিচু করে ডাকতে লাগলো–বউমা, ও বউমা, কথা বলো, কী হয়েছে বলে বউমা–বলো–
–প্রথম খণ্ড সমাপ্ত–
৩.১ পর-চিতেন (দ্বিতীয় খণ্ড)
মনে আছে এর পর থেকেই সদানন্দর জীবনে সব কিছুই যেন ওলট-পালট হয়ে গেল। এর পর থেকেই শুরু হলো তার সংঘর্ষ। নিজের সঙ্গে নিজের সংঘর্ষ আবার নিজের সঙ্গে পরের। আসলে এর পর থেকে সমস্ত পৃথিবীর সঙ্গেই সদানন্দর সংঘর্ষ বেধে গেল।
যারা সাধারণ মানুষ তারা পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। কিন্তু যারা পারিপার্শ্বিককে অস্বীকার করে চলতে চায় তাদেরই হয় যত বিপদ। তারা নিজেকেও ক্ষমা করে না পারিপার্শ্বিককেও না। পারিপার্শ্বিক যখন তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে আসে তখন সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করতে গিয়ে কখনও ধ্বংস হয়ে যায় আবার কখনও কখনও ইতিহাসের পাতায় একটা স্থায়ী দাগ রেখে যায়। কিন্তু তা-ই বা পারে কজন? বেশির ভাগই তো পারিপার্শ্বিকের চাপে নিঃশেষ হয়ে হয়ে কোথায় মিলিয়ে যায় কেউ জানতে পারে না। ইতিহাসের পাতায় এত জায়গা থাকে না যে ঐতিহাসিক তাদের নিয়ে দু’চার লাইন লিখবে। তাদের জায়গা থাকে একমাত্র উপন্যাসের পাতায়। একমাত্র ঔপন্যাসিকই বুঝি তাদের জন্যে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলে।
